Advertisement
E-Paper

কাঁটাতারের ওধারে জমি, ‘কর’ দিতে হয় বাবু

বেলা ১২টা। গ্রামের মেঠো পথে ধুলো উড়িয়ে ছুটছে সিপিএম প্রার্থীর গাড়ি। একটু দূরেই মালিদা বিএসএফ ক্যাম্প। ক্যাম্পের সামনে পৌঁছে থামল গাড়ি। নেমে এলেন বনগাঁ কেন্দ্রের সিপিএম প্রার্থী দেবেশ দাস। বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের ওধারে নিজের জমিতে চাষ করে এ পারে নিজের ঘরে ফিরছিলেন বৃদ্ধ সাত্তার মণ্ডল। বৃদ্ধকে দেখে এগিয়ে গেলে প্রার্থী। হাতজোড় করে নমস্কার জানিয়ে নিজের পরিচয় দিলেন।

সীমান্ত মৈত্র

শেষ আপডেট: ১৬ এপ্রিল ২০১৪ ০২:৪৯
সিপিএম প্রার্থীকে সমস্যার কথা শোনাচ্ছেন এক চাষি। ছবি: নির্মাল্য প্রামাণিক।

সিপিএম প্রার্থীকে সমস্যার কথা শোনাচ্ছেন এক চাষি। ছবি: নির্মাল্য প্রামাণিক।

বেলা ১২টা। গ্রামের মেঠো পথে ধুলো উড়িয়ে ছুটছে সিপিএম প্রার্থীর গাড়ি। একটু দূরেই মালিদা বিএসএফ ক্যাম্প। ক্যাম্পের সামনে পৌঁছে থামল গাড়ি। নেমে এলেন বনগাঁ কেন্দ্রের সিপিএম প্রার্থী দেবেশ দাস। বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের ওধারে নিজের জমিতে চাষ করে এ পারে নিজের ঘরে ফিরছিলেন বৃদ্ধ সাত্তার মণ্ডল। বৃদ্ধকে দেখে এগিয়ে গেলে প্রার্থী। হাতজোড় করে নমস্কার জানিয়ে নিজের পরিচয় দিলেন। বললেন, “আমি দেবেশ দাস। কাস্তে-হাতুড়ি-তারা’র প্রার্থী।

এ পারে ঘর, ও পারে জমিজিরেত। এ ভাবে থাকতে অসুবিধা হয় না? প্রশ্ন শুনে প্রার্থীর মুখের দিকে তাকান সাত্তার। বলে ওঠেন, “রাতের আঁধারে কাঁটাতারের বাইরে বাংলাদেশিরা এসি সব্জি, ফসল চুরি করে নে যায়। কী করব? এটাকে ওদের (বাংলাদেসিদের) ‘কর’ দেওয়া হিসাবেই দেখি।” একটু থেমে ফের বলেন, ‘‘আমাদের জমির পাশেই বাংলাদেশি চাষির জমির আল। ফসল চুরি করলেও আমরা তেমন কিছু বলি না। বেশি কিছু বললি, শ্যালো মেশিন, কল সব চুরি হওয়ার ভয় রয়েছে। তাই আর প্রতিবাদ হয় না। এ ভাবেই পড়ে মার খাচ্ছি বাবু।” সীমান্তের গ্রামের এক চাষির অভিজ্ঞতা শুনে বিস্মিত প্রার্থী। বিস্ময় কাটালেন দলের এক কর্মী। ক্যাম্পের এক জওয়ানের সঙ্গে প্রার্থীর পরিচয় করিয়ে দেন তিনি। জওয়ানের কাছে দেবেশবাবু বর্ডার রোড ধরে হাঁটার অনুমতি চাইলে জওয়ানের উত্তর “নিষেধ আছে।” ছবি তুলতে গেলেও তীব্র আপত্তি জানালেন ওই জওয়ান।

জওয়ানদের এই ‘নিষেধের বেড়াজাল’ নিয়ে প্রার্থীর কাছে ক্ষোভ জানালেন এক চাষি। তাঁর বক্তব্য, এমনি সময় কাঁটাতারের ওধারে চাষ করতে যেতে কোনও অসুবিধা হয় না। তবে জওয়ানেরা বদলি হলেই সমস্যা। আবার কিছুদিন ধরে চলে খানাতল্লাশি। ফের সব ঠিকঠাক। তবে বিকেল সাড়ে পাঁচটার বেশি হয়ে গেলেই ঝামেলার অন্ত থাকে না।”

একটু পরেই কাঁটাতারের বেড়া লাগোয়া মালিদা গ্রামে কর্মীদের নিয়ে বৈঠকে বসে গেলেন প্রার্থী। গাছের নীচে পাতা কয়েকটা চেয়ার। সামনে চটের উপরে বসে কয়েকজন মহিলা-পুরুষ। প্রার্থী চেয়ারে বসতেই গ্রামবাসীরা জানান, গ্রামে প্রায় ৬০০ পরিবার রয়েছে। পুরুষদের বেশিরভাগই খেতমজুর বা ছোট চাষি। আর তাঁদের বেশিরভাগেরই জমি রয়েছে কাঁটাতারের ওধারে। গ্রামে কাজের সুযোগ সে ভাবে নেই। তাই অনেকেই মুম্বই, গুজরাতে। হঠাত্‌ই একজন চিত্‌কার করে ওঠেন, “সন্ধে সাড়ে ৫টার পর জমি আর আমাদের থাকে না বাবু। ওদের (বাংলাদেশিদের) দখলে চলে যায়। কষ্ট করে যা চাষ করি সব চুরি করে নিয়ে যায় ওরা। জওয়ানদের বলেও কোনও লাভ হয় না। কারণ ওরা থাকে এ ধারে।’’ বক্তাকে শান্ত করেন প্রার্থী।

কাঁটাতার থেকে দেড়শো গজের বাইরে জিরো পয়েন্ট। চাষিদের জমি ওই এলাকায়। চাষিদের অভিযোগ, “কাঁটাতারের সবকটা দরজা খোলা থাকে না। সময় মেনে যাওয়া-আসা করতে হয়। অথচ এখন ধান কাটার কাজ চলছে। এখন অন্তত সবকটা দরজা সকাল ৬টা থেকে সন্ধে ৬টা পর্যন্ত খুলে রাখলে তাঁদের উপকার হত।”

গ্রামের মধ্যে দিয়ে কাঁটাতার পর্যন্ত তিন কিলোমিটার রাস্তার বেশিরভাগটাই মাটির। ইটে ঢাকা পড়েছে সামান্য অংশই। প্রার্থীর কাছে গ্রামবাসীদের দাবি, “পুরো রাস্তাটা যাতে ইটের হয় সেটা একটু দেখবেন। বর্ষায় এত কাদা হয় যে চলাফেরা করাই দায় হয়ে ওঠে।” আবু হোসেন সর্দারের মা লাইনি সর্দার ৮৬ বছরের বিধবা। আবু হোসেনের অভিযোগ, “মা কোনও বিধবা ভাতা পান না। কেউ ব্যবস্থা করে দেয়নি। আপনি পারবেন?” ফের অভিযোগ করেন, “চিকিত্‌সার জন্য বাগদা ব্লক গ্রামীণ হাসপাতাল থাকলেও সেখানে চিকিত্‌সা মেলে না।” জেলা পরিষদের সদস্য সুশান্ত চক্রবর্তী অভিযোগ মেনে নিয়ে প্রার্থীকে জানান, হাসপাতালে পরিকাঠামো বলতে কিছু নেই। হাসপাতাল চত্বরে তাই অ্যাম্বুল্যান্স দাঁড়িয়ে থাকে রোগীদের বনগাঁ মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য। সব শুনে ঘাড় নেড়ে এগিয়ে যান দেবেশ।

এ দিন মালিদা, মুস্তাফাপুর, রামনগর এলাকায় প্রচারে যান দেবেশবাবু। সীমান্তঘেঁষা এই সব এলাকার মানুষ প্রার্থীর কাছে তাঁদের বেঁচে থাকার নানা সমস্যা তুলে ধরেন। তাঁদের সমস্যা মেটাতে চেষ্টা করবেন বলে জানিয়েও দেন প্রার্থী। চেষ্টার আশ্বাস পেলেও প্রার্থীর গাড়ি ধলো উড়িয়ে অদৃশ্য হতেই ভেসে এল এক গ্রামবাসীর কণ্ঠস্বর, “আগের বার এক নেতা এসেও এমন কথা বলে গিয়েছিলেন।” কথা শেষ হতেই শোনা যায় হতাশার দীর্ঘশ্বাস।

cpm candidate bongaon simanta moitra bagda
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy