পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বার বার অভিযোগ করেন রাজ্যের প্রাপ্য দু’লক্ষ কোটি টাকা আটকে রেখেছে কেন্দ্রীয় সরকার। সম্প্রতি তৃণমূলের নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও সে বিষয়ে মুখ খুলেছেন। কেন্দ্র এবং বিজেপির তরফ থেকে বার বার পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলা হয়েছে, কেন্দ্রের পাঠানো টাকার হিসাব দেয় না রাজ্য সরকার। তবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব এ বার সে পথে হাঁটলেন না। বুধবার কলকাতায় কেন্দ্রীয় বাজেট ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ সংক্রান্ত প্রশ্নের সম্মুখীন হলেন তিনি। কিন্তু সে অভিযোগ সরাসরি খণ্ডন করার বদলে ভূপেন্দ্র পাল্টা অভিযোগ তুললেন মমতার বিরুদ্ধে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর কটাক্ষ, যিনি টাকা বকেয়া রাখার অভিযোগ তুলছেন, তিনিই বছরের পর বছর নিজের সরকারের কর্মীদের ন্যায্য প্রাপ্য বকেয়া রেখে দিয়েছেন!
ভূপেন্দ্র শুধু দেশের পরিবেশ ও বনমন্ত্রীই নন। বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের তরফে তিনি পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন দেখভালের দায়িত্বপ্রাপ্ত পর্যবেক্ষকও। ভোট প্রস্তুতি তদারকি করতে গত পাঁচ মাস ধরে তিনি বার বার পশ্চিমবঙ্গে যাতায়াত করছেন। এ বারের কেন্দ্রীয় বাজেটের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার এক একটি রাজ্যে এক এক জন মন্ত্রীকে পাঠাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে সে দায়িত্ব ভূপেন্দ্রই নিয়েছেন। সেই সংক্রান্ত কর্মসূচিতেই বুধবার ভূপেন্দ্র পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে তথা মুখ্যমন্ত্রীকে আক্রমণ করেন।
ভূপেন্দ্রকে আনন্দবাজার ডট কম প্রশ্ন করেছিল, রাজ্যের দু’লক্ষ কোটি টাকা কেন্দ্র আটকে রেখেছে বলে যে অভিযোগ পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বার বার করেন, সে অভিযোগ কি ভূপেন্দ্র খণ্ডন করবেন? মোদী মন্ত্রিসভার সদস্য সে অভিযোগ সরাসরি খণ্ডন করার পথে হাঁটেননি। মুখ্যমন্ত্রী যে বকেয়া অর্থের যে হিসাব দিচ্ছেন, সে প্রসঙ্গেও কোনও মন্তব্য করতে চাননি। বরং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধেই তিনি পাল্টা অভিযোগ করেছেন রাজ্য সরকারি কর্মীদের প্রাপ্য আটকে রাখার। ডিএ মামলার উদাহরণ দিয়ে ভূপেন্দ্র বলেন, ‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একমাত্র মুখ্যমন্ত্রী, যিনি নিজের রাজ্য সরকারের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মামলা লড়ছেন! এমন মুখ্যমন্ত্রী এখনও পর্যন্ত কোথাও দেখেছেন? ভারতের সর্বত্র সপ্তম বেতন কমিশন চালু হয়ে গিয়েছে। আর এখানে ২০ লক্ষ কর্মচারী ষষ্ঠ বেতন কমিশনের জন্য লড়াই করছেন।’’
সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট পশ্চিমবঙ্গের সরকারি কর্মীদের মহার্ঘ্য ভাতা (ডিএ) সংক্রান্ত মামলায় যে রায় দিয়েছে, ভূপেন্দ্র তার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘‘কর্মচারীদের বেতন স্থির। তাঁদের ডিএ দেওয়া হয়, যাতে তাঁরা মূল্যবৃদ্ধির মোকাবিলা করতে পারেন। ডিএ তাঁদের ন্যায্য পাওনা। এ কথা সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি তাঁর রায়ে লিখেছেন।’’ এসআইআর সংক্রান্ত মামলায় সুপ্রিম কোর্টে মমতার সওয়ালের প্রসঙ্গ টেনে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বলেন, ‘‘এসআইআরের জন্য যখন সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছিলেন, এঁদের জন্যও যেতে পারতেন। আপনি তো এঁদের (সরকারি কর্মীদের) বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছেন।’’ মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশে তাঁর বক্তব্য, ‘‘নিজের সরকারের কর্মীদের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করে হেরেছেন। এখন আপনার উচিত কর্মচারীদের কাছে ক্ষমা চাওয়া।’’
এসআইআর-এর চাপে রাজ্য সরকারি কর্মীদের মৃত্যু হচ্ছে বলে মমতা যে অভিযোগ করেছেন, সে বিষয়েও ডিএ টেনে এনেছেন ভূপেন্দ্র। তাঁর কথায়, ‘‘আমি বলছি ওঁদের মৃত্যু এসআইআর-এর কারণে হয়নি। ডিএ না-পাওয়া জনিত হতাশার কারণে হয়েছে।’’ পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর প্রক্রিয়াকে মমতাই ‘অস্বচ্ছ’ করে তুলতে চাইছেন বলে ভূপেন্দ্র দাবি করেছেন।
‘প্রশাসনিক ব্যর্থতা, জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে আপস, এবং অস্বচ্ছতা’— এই তিন ‘বাণে’ মমতার সরকারকে বিঁধেছেন ভূপেন্দ্র। নিজের সরকারের কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা করা এবং সে মামলায় হারা সবচেয়ে বড় ‘প্রশাসনিক ব্যর্থতা’র নমুনা বলে ভূপেন্দ্রের মত। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার জন্য জমি সংক্রান্ত টানাপোড়েন প্রসঙ্গ টেনে ভূপেন্দ্রের মন্তব্য, ‘‘আপনি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে আপস করছেন। পশ্চিমবঙ্গের অবসরপ্রাপ্ত সেনা আধিকারিককে মামলা করতে হচ্ছে। আদালত আপনাকে জমি দেওয়ার নির্দেশ দিচ্ছে। সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে। তাও আপনি জমি দিচ্ছেন না।’’