রাজ্যে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (এসআইআর)-পর্বের শুনানির নোটিস, দাবি ও আপত্তি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের নির্ধারিত সময়সীমা ও নির্দেশাবলি কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে ইআরও এবং এইআরও-দের। ওই নির্দেশের লঙ্ঘন হলে তা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখা হবে। এবং সংশ্লিষ্ট ইআরও এবং এইআরও-দের বিরুদ্ধে পদক্ষেপও করা হতে পারে। মঙ্গলবার জেলা নির্বাচনী আধিকারিকদের এই নির্দেশ দিল কমিশন।
ঘটনাচক্রে, মঙ্গলবার রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজকুমার আগরওয়াল দিল্লি গিয়ে নির্বাচন সদনে বৈঠক করার পরেই সিইও-র দফতরের তরফে জেলা নির্বাচনী আধিকারিকদের এই নির্দেশিকা পাঠানো হয়েছে। এখনও পর্যন্ত রাজ্যে আনম্যাপড এবং লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সির তালিকা মিলিয়ে প্রায় ১ কোটি ৫১ লক্ষ ৯৩ হাজার নোটিস প্রস্তুত করা (জেনারেট) হয়েছে। তার মধ্যে নোটিস দেওয়া সম্ভব হয়নি ৩ লক্ষ ৫৫ হাজার ৬৭৯ ভোটারকে। নোটিস দেওয়া হয়েছে ১ কোটি ৪৮ লক্ষ ভোটারকে। মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত শুনানি হয়েছে ১ কোটি ৪১ লক্ষ ভোটারের। এই পরিস্থিতিতে কমিশনের তরফে মঙ্গলবারই জানানো হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হবে।
গত ৪ ফেব্রুয়ারির সুপ্রিম কোর্টে এসআইআর মামলার শুনানিতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে আদালতে উপস্থিত ছিলেন। সে দিন নির্বাচন কমিশনের আইনজীবীরা জানিয়েছিলেন, রাজ্যকে বার বার অনুরোধ করা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত যোগ্য কর্মী দেয়নি। ফলে এসআইআর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা কঠিন হচ্ছে। এই বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রী আদালতে স্পষ্ট ভাবে জানান, রাজ্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক যোগ্য অফিসার দিতে প্রস্তুত।
তার পরেই গত ৭ ফেব্রুয়ারি রাজ্য ৮৫০৫ জন গ্রুপ-বি অফিসার এসআইআর প্রক্রিয়ার জন্য দেওয়ার কথা জানায়। তবে সোমবারের শুনানিতে রাজ্যের পক্ষ থেকে স্বীকার করা হয়, এই ৮৫০৫ জন অফিসারের সম্পূর্ণ তালিকা আগে কমিশনকে পাঠানো হয়নি। কারণ, কমিশনের সম্মতির অপেক্ষা করা হচ্ছিল। তাই শুনানির মধ্যেই সেই তালিকা নির্বাচন কমিশনের আইনজীবীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। এর পরে সুপ্রিম কোর্ট তার নির্দেশে জানায়—
১) ৮৫০৫ জন গ্রুপ-বি অফিসারকে মঙ্গলবার বিকেল ৫টার মধ্যে জেলা নির্বাচনী আধিকারিক (ডিইও) বা ইআরও-দের কাছে রিপোর্ট করতে হবে।
২) কমিশন চাইলে বর্তমান ইআরও বা এইআরও-দের বদলাতে পারবে এবং নতুন অফিসারদের ব্যবহার করতে পারবে। যাঁরা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন, তাঁদের সরিয়ে দেওয়ার স্বাধীনতাও কমিশনের থাকবে।
৩) এই ৮৫০৫ জন অফিসারের অভিজ্ঞতা দেখে কমিশন প্রয়োজন মতো অফিসার বাছাই করতে পারবে। তাঁদের এক দিনের সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে মাইক্রো-অবজার্ভারদের সঙ্গে ইআরও বা এইআরও-দের সাহায্যের কাজে লাগানো যাবে।
৪) সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে মাইক্রো-অবজার্ভার বা সাহায্যকারী অফিসাররা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন না। তাঁরা শুধুমাত্র সাহায্যের কাজ করবেন।
৫) চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা শুধু ইআরও-দেরই থাকবে।
৬) আদালত মনে করছে, শুনানিতে নোটিস পাওয়া ব্যক্তিদের জমা দেওয়া নথি যাচাই করতে সময় বেশি লাগতে পারে। তাই ১৪ ফেব্রুয়ারি পরে অন্তত আরও এক সপ্তাহ সময় দেওয়া হল। এই সময়ে নথি যাচাই এবং আপত্তি নিয়ে সিদ্ধান্ত—সব শেষ করতে হবে।
৭) কমিশনের অভিযোগ, আপত্তি সংক্রান্ত নথি পোড়ানো ও বেআইনি কাজের ঘটনায় এফআইআর নথিভুক্ত হয়নি। এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে রাজ্য পুলিশের ডিজিকে শো-কজ করা হল। কেন পদক্ষেপ করা হয়নি সেই বিষয়ে তাঁকে ব্যক্তিগত হলফনামা দিয়ে ব্যাখ্যা করতে হবে।
৮) নোটিস পেয়েছেন এমন ব্যক্তিদের এসআইআর বিজ্ঞপ্তিতে কমিশনের জানানো সব নথির নির্ভর করতে পারবেন। আদালতের আগের নির্দেশে বলা নথিও ব্যবহার করা যাবে। ইআরও-দের সেই সব নথি বিবেচনা করতে হবে।
৯) কেউ ব্যক্তিগত ভাবে শুনানিতে না গেলেও, তাঁর লিখিত আপত্তি বিবেচনা করতেই হবে। এমনকি জমা দেওয়া নথির সত্যতা আইন অনুযায়ী যাচাই করা যাবে।
আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি এই মামলার পরবর্তী শুনানি হবে শীর্ষ আদালতে।