২০২১ সালের বাজেট পেশের সময় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, ট্রেড মিলে হাঁটতে হাঁটতে তিনি বাজেট তৈরি করেছেন। পাঁচ বছর পরে তাঁর দল যখন টালমাটাল, দীর্ঘদিনের সঙ্গী তথা প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যও তাঁর হাত ছেড়ে জানিয়ে দিলেন, তাঁর সঙ্গে আলোচনা করে কখনও বাজেট তৈরিই করা হয়নি! অর্থাৎ, খোদ অর্থমন্ত্রীই জানতেন না, বাজেটে কী আছে! অথচ, বাজেট পেশ করতেন অর্থমন্ত্রীই। বাজেট বক্তৃতার প্রথম পৃষ্ঠাতেই বড় বড় করে চন্দ্রিমার নাম লেখা থাকত!
শনিবার সকালে দলের রাজ্য সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দেন চন্দ্রিমা। পদত্যাগের চিঠি পাঠিয়ে দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। জানিয়েছেন, দলে তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা, আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাই তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর পরেই বাজেট প্রসঙ্গে মুখ খোলেন প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। জানান, বাজেট পেশের কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি জানতে পারতেন, বাজেটে কী আছে, কী কী প্রস্তাব তিনি পাশ করতে চলেছেন। শনিবারই তৃণমূলের সব পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন চন্দ্রিমা। তার পর এই চমকপ্রদ তথ্য জানিয়েছেন। সংবাদমাধ্যমের সামনে তিনি বলেন, ‘‘আমার সঙ্গে আলোচনা করে কখনওই বাজেট তৈরি হয়নি। জনতা যখন জেনেছে, আমি তার কয়েক ঘণ্টা আগে জেনেছি। আমি আনুগত্য দেখিয়েছিলাম। সেটাই এখন প্রশ্নের মুখে, তাই আমি পদত্যাগ করেছি।’’
আরও পড়ুন:
মমতার বিরুদ্ধে বাজেট সংক্রান্ত আরও ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন চন্দ্রিমা। দাবি, তাঁকে দিয়ে বাজেট বলিয়ে নেওয়া হত মাত্র। কে সেই বাজেট তৈরি করতেন, তা তিনি জানেন না। চন্দ্রিমার কথায়, ‘‘মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী তখন নিজেই বলতেন, যে ‘চন্দ্রিমা বলো, এরকম বাজেট হবে’। হয়তো তিনি শুনেছেন আধিকারিকদের থেকে।’’ এর পর চন্দ্রিমাকে প্রশ্ন করা হয়, ‘‘স্বভাবসিদ্ধ ভাবে অনেককেই তো উনি (মমতা) এমন কথা বলেন?’’ চন্দ্রিমার উত্তর, ‘‘সেটা আমি জানি না। নিশ্চয়ই এমন কথা উনি বলবেন না, যেটা উনি শোনেননি বা জানেন না।’’ এর পর অবশ্য বাজেট সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে চন্দ্রিমা আর জলঘোলা করতে চাননি। সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নবাণের মুখে তিনি বলেন, ‘‘সব কথা তো বলতে পারব না। গোপনীয়তা বজায় রাখার একটা শপথ নিয়েছিলাম। সেটা তো খানিকটা বজায় রাখতে হবে।’’
বাজেট নিয়ে যখন এত অভিযোগ, অর্থমন্ত্রীর পদ আগে কেন ছেড়ে দেননি? এ প্রশ্নের উত্তরে চন্দ্রিমার জবাব, ‘‘আমার মুখ্যমন্ত্রী যিনি ছিলেন, তিনি যে ভাবে নির্দেশ দেবেন, সেটাই তো আমাকে করতে হবে। সেটাই করেছি।’’
উল্লেখ্য, ট্রেড মিলে বাজেট তৈরি করা সংক্রান্ত মমতার সেই বক্তব্য নিয়ে বিস্তর জলঘোলা হয়েছিল। বাজেট তিনিই তৈরি করলে অর্থমন্ত্রীর ভূমিকা কী? প্রশ্ন তুলেছিলেন অনেকে। এক বার চন্দ্রিমার বাজেট বক্তৃতার মাঝেই চিরকূট পাঠিয়ে রাজ্য সরকারি কর্মীদের ডিএ বৃদ্ধির কথা ঘোষণা করান মমতা। তা-ও কারও নজর এড়ায়নি। সেই চাপানউতর নিয়ে এ বার সরাসরি মুখ খুললেন চন্দ্রিমা নিজেই।
বিধানসভা নির্বাচনে দলের ভরাডুবির পর ভাঙন ধরেছে তৃণমূলের অন্দরে। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে এক দল বিধায়ক বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। তাঁদের সঙ্গে কালীঘাটপন্থীদের দল দখলের লড়াই চলছে। এই পরিস্থিতিতেও মমতার সঙ্গেই ছিলেন চন্দ্রিমা। তাই তাঁর পদত্যাগকে কালীঘাট শিবিরে বড়সড় ধাক্কা বলে মনে করা হচ্ছে। পদ ছাড়ার পর বিধানসভায় গিয়েছেন চন্দ্রিমা। ঋতব্রতদের শিবিরে তিনি যোগ দেবেন কি না, তা নিয়ে জল্পনাও তৈরি হয়েছে। ওই শিবিরের অন্যতম সদস্য তথা বিধায়ক সন্দীপন সাহা চন্দ্রিমার পদত্যাগের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন।