Advertisement
E-Paper

শ্মশান থেকে সমাধিস্থলে নিয়ে যেতে সহায় পুরকর্মীরা

কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মৃতদেহ সৎকারের ব্যাপারে আলাদা করে রূপরেখা তৈরি করেছিল রাজ্য সরকার।

চন্দ্রপ্রভ ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ২৭ মে ২০২১ ০৭:০৭
সসম্মানে: সব রীতি মেনে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী এক মহিলার শেষকৃত্য করছেন হাওড়া পুরসভার কর্মীরা।

সসম্মানে: সব রীতি মেনে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী এক মহিলার শেষকৃত্য করছেন হাওড়া পুরসভার কর্মীরা। নিজস্ব চিত্র

কোভিড কেড়েছে প্রিয়জনকে। তাই ধর্মীয় আচার ও রীতি মেনে শেষকৃত্যের আশা কার্যত ছিল না। খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও রীতিমতো সম্মতিপত্র লিখে প্রিয়জনের দেহ শ্মশানে ছেড়ে আসতে বাধ্য হয়েছিল নিরুপায় পরিবারটি। কিন্তু প্রশাসনিক আধিকারিকদের হস্তক্ষেপে তাদের শেষ পর্যন্ত নিরাশ হতে হল না।

কোথাও নদীর চরে গণ-সমাধি, কোথাও অপ্রতুল জ্বালানির সাহায্যে একসঙ্গে একাধিক মৃতদেহ সৎকারের চেষ্টা, কখনও আবার নদীতে ভেসে আসা সারি সারি দেহ— রীতি, ধর্মীয় আচার বা মৃতদেহের পূর্ণ মর্যাদা তো দূরস্থান, এই সব ঘটনায় কোভিডে প্রাণ হারানো প্রিয়জনের সৎকারই পরিবারগুলির কাছে বিভীষিকার মতো হয়ে গিয়েছে। তবু কোভিড অতিমারির প্রবল চাপ সামলানোর মধ্যে এ রাজ্যের প্রশাসনিক কর্তা-কর্মীদের মানবিক পদক্ষেপে এ ছবি ব্যতিক্রমী। তাই প্রিয়জনকে হারানোর দুঃখের মধ্যেও পূর্ণ মর্যাদায় শেষকৃত্যের সান্ত্বনাটুকু থেকে গেল পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক পরিবারটির কাছে।

দিন কয়েক আগে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী ওই পরিবারের এক মহিলা সদস্যের প্রাণ কেড়েছিল কোভিড। রীতিমাফিক শেষ যাত্রার আয়োজন করে পরিবার। কিন্তু গোটা দিন ঘুরেও সমাধিস্থ করার ব্যবস্থা করে উঠতে পারেননি তাঁরা। প্রায় সারা দিন এই পরিস্থিতি চলার পরে গভীর রাতে কার্যত নিরুপায় হয়ে তাঁরা যান হাওড়ার একটি শ্মশানে। যেখানে কোভিড দেহ সৎকারের ব্যবস্থা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে অবশ্য খ্রিস্টান পরিবারের রীতি অনুযায়ী দেহ সমাধিস্থ করার কথা। কিন্তু, গোটা দিনের অভিজ্ঞতা সেই রীতি থেকে সরে আসতে বাধ্য করেছিল পরিবারের সদস্যদের।

মৃতের নাম দেখে সন্দেহ হতেই শ্মশানে উপস্থিত হাওড়া পুরসভার দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসারেরা ওই পরিবারের সদস্যদের কাছে জানতে চান, তাঁরা কি দেহটি দাহই করবেন বলে ঠিক করেছেন? তখন প্রিয়জনকে দাহ করার লিখিত সম্মতি দিয়ে শ্মশানে আর অপেক্ষা না করে ফিরে আসেন মৃতের আত্মীয়েরা। এই অবস্থায় সংশ্লিষ্ট আধিকারিকেরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানালে তাঁরা উপযুক্ত রীতি মেনে এবং পূর্ণ মর্যাদায় মৃতের শেষকৃত্যের নির্দেশ দেন। সেই রাতেই ফের সমাধিস্থল খোঁজার কাজ শুরু করেন পুর অফিসারেরা। বিভিন্ন খ্রিস্টান সংগঠনের সঙ্গে কথা বলে শেষ পর্যন্ত একটি জায়গায় ব্যবস্থা করা হয়। খবর দিয়ে ফিরিয়ে আনা হয় মৃতের পরিবারের সদস্যদের। এরই মধ্যে এক পুরকর্মী কিনে আনেন মোমবাতি। আর এক জন কাঠ ভেঙে তৈরি করেন ক্রুশ। শেষে পুরসভার কর্মী-অফিসারেরা পূর্ণ রীতি মেনে এবং সসম্মানে পরিবারের উপস্থিতিতে মৃতকে সমাধিস্থ করেন।

কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মৃতদেহ সৎকারের ব্যাপারে আলাদা করে রূপরেখা তৈরি করেছিল রাজ্য সরকার। পূর্ণ মর্যাদায় দেহের সৎকার নিশ্চিত করতে নির্দেশও দেওয়া হয় সর্বত্র। কিন্তু শ্মশান, কবরস্থান বা সমাধিস্থলগুলিতে মৃতদেহের প্রবল চাপে কার্যত নাজেহাল হতে হচ্ছে পুরসভা-পঞ্চায়েতের মতো স্থানীয় প্রশাসনগুলিকে। বৈদ্যুতিক চুল্লি থাকা শ্মশানগুলিতে সৎকারের প্রবল চাপ থাকলেও অন্যান্য কয়েকটি রাজ্যের মতো ‘অমানবিক’ ঘটনার উদাহরণ এখনও অবশ্য এ রাজ্যে দেখা যায়নি। তবু কোভিড-বিধি সামাজিক এবং ধর্মীয় রীতি মেনে অন্তিম যাত্রাতেও অনেকাংশে লাগাম পরিয়েছে। প্রিয়জনকে হারানোর বেদনার মধ্যেই রীতি মেনে তাঁর অন্তিম যাত্রা করতে না-পারা বহু মানুষকে আরও ভারাক্রান্ত করছে।

এক পুরকর্তার কথায়, “পরিস্থিতি খুবই প্রতিকূল। প্রিয়জনকে হারানোর দুঃখ ভোলার নয়। কিন্তু অন্তিম যাত্রাও মর্যাদাপূর্ণ না-হলে সেই আক্ষেপ চিরকাল বিদ্ধ করবে পরিজনদের। সেই কারণেই পরিবারগুলির পাশে যতটা সম্ভব দাঁড়ানো গেলে তাদের সেই দুঃখ কিছুটা হলেও লাঘব করা সম্ভব।”

coronavirus
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy