‘ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ করে গাত্রে হল ব্যথা।’
সুকুমার রায়ের এই চরণের সঙ্গে উত্তরপাড়ার ভোট আবহের মিল পাচ্ছেন অনেকে! উন্নয়ন-অনুন্নয়ন, পরিষেবা নয়, শাসক দলের উপরে পড়ছে দলের বিদায়ী বিধায়ক কাঞ্চন মল্লিকের এলাকায় অনুপস্থিতির দীর্ঘ ছায়া!
গত পাঁচ বছরে কাঞ্চন এলাকায় কার্যত না আসা নিয়ে সাধারণ মানুষ তো বটেই, তৃণমূলের অন্দরেও কম প্রশ্ন ওঠেনি। ভোট-মরসুমে শহরে দলের দুই অন্যতম নেতা পুরপ্রধান দিলীপ যাদব বা শহর তৃণমূল সভাপতি তথা পুর-পারিষদ ইন্দ্রজিৎ ঘোষ অবশ্য এ নিয়ে রা কাড়েননি।
এ বারের বিধানসভা ভোটে উত্তরপাড়ার বহু তৃণমূল সমর্থক চেয়েছিলেন, এ শহরেরই কেউ দলের প্রার্থী হোন। কেননা, ২০০৩ সালে ইন্দ্রজিতের পরে এই শহরের কেউ এই ভোটে তৃণমূলের প্রার্থী হননি। এ বার এই দলের প্রার্থী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুত্র শীর্ষণ্য আদতে কলকাতার বাসিন্দা। সিপিএম বা বিজেপির প্রার্থীও এই শহরের বাসিন্দা নন। একমাত্র কংগ্রেস প্রার্থী এখানকার ভূমিপুত্র।
বিষয়টি নিয়ে শাসক দলে ক্ষোভের আঁচ বাইরে না এলেও গুঞ্জন থেমে থাকেনি। তাঁদের মনেও নগরবাসীর মতোই প্রশ্ন ঘুরপাক খেয়েছে, হাতের কাছে সত্যিই কোনও ‘মুখ’ ছিল না?
সিপিএমের মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় টানা তিন মাসেরও বেশি উত্তরপাড়ার মাটি কামড়ে পড়ে থেকেছেন স্থানীয় নানা বিষয় নিয়ে। তা শহরের গলাপোলের নীচে জল জমা হোক বা কোনও মহিলার উপরে অত্যাচারের অভিযোগে প্রতিকার চেয়ে প্রশাসনের দরজায় কড়া নাড়া। ‘বহিরাগত’ তত্ত্ব নিয়ে প্রশ্নের উত্তর সরাসরি এড়িয়ে মীনাক্ষী বলেছেন, ‘‘আমি পশ্চিমবঙ্গ জুড়েই রাজনীতি করি। শিলিগুড়ির উত্তরকন্যা অভিযান থেকে আর জি কর হাসপাতাল যেখানেই বলবেন, দেখা মিলবে আমার। মোদ্দা কথা, এ বারের নির্বাচনে শাসকদল উত্তরপাড়ায় ভয় পাচ্ছে সাধারণ মানুষকে।’’
কোন্নগরের বাসিন্দা বিজেপি নেতা প্রণয় রায় অবশ্য সোজাসাপ্টা ব্যাট অন্য দিকে ঘুরিয়েছেন। বলেছেন, ‘‘আমরা প্রথম থেকেই বলে আসছি, বিজেপিই এখানে একমাত্র বিকল্প। ভারতমাতৃকা রক্ষায় যিনি (বিজেপি প্রার্থী দীপাঞ্জন চক্রবর্তী) তাঁর তারুণ্যের দিনগুলি অতিবাহিত করেছেন, তিনিই উত্তরপাড়াবাসীকে পরিষেবা দিতে আগ্রহী। এটাই বড় কথা। আর গত পাঁচ বছরে শাসক দলের বিধায়কের টিকিটি পর্যন্ত দেখতে পাননি শহরবাসী।’’
কাঞ্চন ফোন ধরেননি। ওয়টস্যাপেও নিরুত্তর থেকেছেন। শীর্ষণ্যের নির্বাচনী এজেন্ট ইন্দ্রজিৎ বলেন, ‘‘আমাদের প্রার্থী কিন্তু প্যারাস্যুটে নামেননি। ২০১২ সাল থেকে শহরের এ ডি পাল লেনে (পুরাতন জিটি রোড) তাঁর মায়ের আবাসনের স্থায়ী ঠিকানা রয়েছে। এত বছর ধরেই উত্তরপাড়ায় যাতায়াত বা থাকা শুধু নয়, বিশেষত ভোটের সময় প্রচারে যোগ দিয়েছেন।’’
এই সব তাল-ঠোকাঠুকির মাঝে কংগ্রেস প্রার্থী সুব্রত মুখোপাধ্যয় জোর গলায় বলেছেন, ‘‘আমি শহরের ছেলে। তোমাদেরই লোক।’’
এখন দেখার, শেষ বিচারে উত্তরপাড়ার মানুষ কাদের পক্ষেরায় দেন!
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)