এই বাজারে ইসিজি ৫০ টাকায়!
রক্তের সব পরীক্ষা ৮০ টাকায়!
ডিজিটাল এক্স-রে ১৮০ টাকায়!
রাজ্যে এক শ্রেণির বেসরকারি হাসপাতাল এবং নার্সিংহোমের বিরুদ্ধে যখন চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়ার নামে লাগামছাড়া ভাবে টাকা রোজগারের অভিযোগ উঠছে, তখন এমন ‘সুলভ’ পরিষেবা মিলছে কোথায়? উত্তর— উলুবেড়িয়ার চেঙ্গাইলের বেলতলায়। মৈত্রী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। নামে স্বাস্থ্যকেন্দ্র হলেও বেসরকারি। তবে, শুধু পরীক্ষা-নিরীক্ষাই নয়, এখানে রোগীর যা কিছু চিকিৎসা— সবই হয় নামমাত্র খরচে।
উলুবেড়িয়ায় একাধিক এমন নার্সিংহোম আছে, যেখানে একবার ডাক্তার দেখাতে রোগীকে গুনতে হয় ২০০ টাকা। প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষাও অনেকটাই বাধ্যতামূলক। ডিজিটাল এক্স-রে’র খরচ ৩০০ টাকা। ইসিজি ২০০ টাকা। রক্ত পরীক্ষা ২০০ টাকা। সেখানে ‘মৈত্রী’র খরচ নামমাত্র। ফলে, দিন দিন রোগীর ভিড় বাড়ছে। রোগীর চাপ সামাল দিতে তৈরি হয়েছে তিন তলা ভবন। এখানে দু’ধরনের চিকিৎসক বসেন। ‘জেনারেল ফিজিশিয়ান’ এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। জেনারেল ফিজিশিয়ানের ‘ফি’ দশ টাকা। তিনি মনে করলে তবেই রোগীকে বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানো হয়। এ জন্য রোগীকে দিতে হয় আরও দশ টাকা। অর্থাৎ, সব মিলিয়ে চিকিৎসক দেখাতে সেই রোগীর লাগে কুড়ি টাকা।
কী ভাবে সম্ভব হচ্ছে এত কম খচে চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়া?
নয়ের দশকের গোড়ায় ফুলেশ্বরের কানোরিয়া জুটমিলের আন্দোলনে শ্রমিকদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ। তাঁদের মধ্যে অনেক চিকিৎসকও ছিলেন। তাঁদেরই একাংশ শ্রমিকদের স্বল্পমূল্যে চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়ার জন্য বেলতলায় চিকিৎসাকেন্দ্র গড়ে তোলেন। সেটাই নাম পাল্টে ১৯৯৫ সালে গড়ে ওঠে মৈত্রী স্বাস্থ্যকেন্দ্র। এখনও পর্যন্ত এখান থেকে লক্ষাধিক মানুষ পরিষেবা পেয়েছেন। জেনারেল ফিজিশিয়ান ছাড়াও এখানে বসেন সার্জারি, গাইনি, স্কিন, ইএনটি, সাইকিয়াট্রিস্ট, মেডিসিন প্রভৃতি বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কর্ণধার পুণ্যব্রত গুণ জানান, প্যাথলজিক্যাল এবং অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ কম করে এবং ওষুধের জেনেরিক নাম ব্যবহার করে সামগ্রিক চিকিৎসার খরচ কমানো হয়। ফলে, চিকিৎসকদের খুব বেশি আত্মত্যাগ করতে হল না। আবার রোগীও কম খরচে পরিষেবা পান। পুণ্যব্রতবাবুর দাবি, ‘‘এখন সরকার ওষুধের জেনেরিক নাম ব্যবহারের কথা বলছে, কম খরচে বিভিন্ন হাসপাতালে পিপিপি মডেলে এক্স রে-সহ নানা পরীক্ষা চালু হয়েছে। এই সব আমরা এখানে শুরু করেছিলাম ২২ বছর আগেই।’’
কলেবরে বাড়লেও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে শুধুই বহির্বিভাগ চলে। তবে, ব্যবস্থা অনেকটাই আধুনিক হাসপাতালের মতো! বিশেষজ্ঞ-সহ প্রতিদিন চার জন করে চিকিৎসক বসেন। চিকিৎসকদের সঙ্গে আছেন একদল প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী। রোগী হয় গড়ে দিনে ২০০ জন। স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রথমে মাইক্রোফোনে রোগীকে ডেকে নেন। রোগীর রোগের বিবরণ জেনে তাঁরা রিপোর্ট তৈরি করেন। সেই রিপোর্ট নিয়ে রোগী যান চিকিৎসকের কাছে। সব মিলিয়ে এক এক জন রোগীর জন্য অন্তত ১৫ মিনিট বরাদ্দ। এর পরে প্রয়োজন হলে তবেই প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা। রয়েছে ন্যায্যমূল্যের ওষুধের দোকানও।
একই ছাদের তলায় প্রায় সব ব্যবস্থা থাকায় রোগীকে ফিরে যেতে হয় না। তাই এই স্বাস্থ্যকেন্দ্র নিয়ে তেমন কোনও বক্রোক্তিও শোনা যায় না। দীর্ঘদিন ধরে ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সুগার এবং উচ্চ রক্তচাপজনিত সমস্যার চিকিৎসা করাচ্ছেন মালদহের আশিস কারিকর। তিনি বলেন, ‘‘আমি এখানে প্রতি মাসে আসি। এখান থেকেই ওষুধ নিয়ে যাই। সুস্থ আছি। তার থেকেও বড় কথা, কম খরচে ভাল চিকিৎসা পাচ্ছি।’’
স্থানীয় বাসিন্দা লতিকা মণ্ডলের কথায়, ‘‘ওখানে আমি আর্থ্রারাইটিসের চিকিৎসা করাই। এমন সুযোগ-সুবিধা আর কোথায়?’’