কোনও পাশে ডাঁই করা রয়েছে অনুষ্ঠান-বাড়ির খাবারের প্লেট। কোনও পাশে কারখানার বর্জ্য।
কোথাও ছাইপাঁশ, কোথাও পচা ভাত-তরকারি। দুর্গন্ধে টেকা দায়।
সোনালি চতুর্ভুজ প্রকল্পে মুম্বই রোড এখন পরিণত হয়েছে ছয় লেনে। হাওড়ায় ঝাঁ চকচকে এই সড়ককে সাজানো হচ্ছে আলোতে। কিন্তু রাস্তার সব সৌন্দর্য কেড়ে নিচ্ছে দু’পাশের বর্জ্যের স্তূপ। বাগনান, জঙ্গলপুর, আলমপুর, ধুলাগড়ি, পাঁচলা মোড়, উলুবেড়িয়া, কুলগাছিয়া, বীরশিবপুর, ঘোড়াঘাটা, দেউলটি— সর্বত্রই ছবিটা প্রায় একই রকম। অথচ, প্রায় সব জায়গাতেই রাস্তার দু’ধারে টাঙানো রয়েছে পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দফতরের বিশাল হোর্ডিং— ‘যত্রতত্র জঞ্জাল ফেলবেন না’। কিন্তু কে শোনে কার কথা!
ওই রাস্তা যাঁরা নিয়মিত ব্যবহার করেন তাঁদের অভিযোগ, সড়কের দু’ধারের বিভিন্ন গ্রাম থেকে ওই সব আবর্জনা আসে। কারখানাগুলিও বর্জ্য ফেলার জায়গা হিসেবে বেছে নেয় ওই সড়কের দু’ধার। এ ভাবে বর্জ্য জমা করা জন্য যেমন দূষণ ছড়াচ্ছে, তেমনই দুর্ঘটনার আশঙ্কাও থাকছে। কেননা, কাগজকলের বর্জ্য মাঝে মাঝে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। তখন ধোঁয়াতে ঢেকে যায় পুরো এলাকা। তখন যেমন দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, তেমনই দ্রুত গতির এই রাস্তায় মাঝেমধ্যেই হাওয়ায় উড়ে আসে ব্যবহার নোংরা কাপ-প্লাস্টিকের প্লেট। তা থেকেও দুর্ঘটনার সম্ভাবনা থাকে।
সে কথা মেনেও নিয়েছেন জাতীয় সড়ক সংস্থার কলকাতা ইউনিটের প্রকল্প অধিকর্তা রামশঙ্কর কুশওয়া। তিনি বলেন, ‘‘রাস্তা সম্প্রসারণের কাজে যে সব কর্মীরা আছেন তাঁরা বর্জ্য ফেলতে বারণ করেন। কিন্তু কেউ শোনে না। আমরা পুলিশকেও বলেছি, বিষয়টি দেখতে।’’
হাওড়া গ্রামীণ জেলা পুলিশের এক কর্তা জানান, বিষয়টি দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের অধীনে। তারা এ ব্যাপারে সহায়তা চাইলে তবেই এগোন সম্ভব। দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের হাওড়া বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এ ব্যাপারে কেউ কোনও অভিযোগ জানাননি।
গ্রাম পঞ্চায়েতগুলির কি কিছু করার নেই?
আইএসজিপি প্রকল্পে বিভিন্ন পঞ্চায়েতকে নিয়মিত উন্নত প্রশাসন (গুড গভর্ন্যান্স) চালানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এই প্রকল্পের টাকায় গ্রামে গ্রামে তৈরি হচ্ছে ঢালাই রাস্তা, সাইকেল স্ট্যান্ড, বাজার চত্বর। গ্রামের ভোল পাল্টে যাচ্ছে উন্নয়নমূলক কাজকর্মের জন্য। কিন্তু গ্রামকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য কোনও পরিকল্পনা আছে কি? সেই প্রশ্ন উঠেছে খোদ গ্রামবাসীদের থেকেই। তাঁদের বক্তব্য, বর্জ্য ফেলার জায়গা বা ভ্যাট তৈরি করা হলে তাঁরা মুম্বই রোডকে ভাগাড় হিসেবে ব্যবহার করতেন না।
উলুবেড়িয়া-২ ব্লকের রঘুদেবপুর এবং উলুবেড়িয়া-১ ব্লকের চণ্ডীপুর— এই দুই পঞ্চায়েতের উপর দিয়ে গিয়েছে মুম্বই রোড। এই দু’টি গ্রাম পঞ্চায়েতই আইএসজিপি প্রকল্পে টাকা পেয়েছে। রঘুদেবপুরে চালু হয়েছে ‘মোবাইল মেসেজ’ ব্যবস্থা। গ্রামবাসীরা নির্দিষ্ট মোবাইল নম্বরে মেসেজ করলেই কোন প্রকল্পের কী অবস্থা তা পাল্টা মেসেজের মাধ্যমে জানতে পারবেন। অন্য দিকে চণ্ডীপুরে চালু হয়েছে কম্পিউটারের মাধ্যমে জন্ম-মৃত্যুর শংসাপত্র দেওয়ার ব্যবস্থা। পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দফতরের কর্তাদের কাছে প্রশংসিত হয়েছে এই দু’টি গ্রাম পঞ্চায়েত। কিন্তু পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে কী বলছেন পঞ্চায়েত দু’টির প্রধানেরা?
রঘুদেবপুরের প্রধান অনিন্দিতা নাথ বলেন, ‘‘গ্রামকে পরিষ্কার রাখার জন্য আমরা সভা করে মানুষকে সচেতন করি। কিন্তু জায়গার অভাবে বর্জ্য ফেলার ব্যবস্থা করতে পারিনি।’’ চণ্ডীপুরের প্রধান সুমিত্রা রং বলেন, ‘‘ভাবছি জঞ্জাল ফেলার জন্য ভ্যাট করব।’’
রাজ্য পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দফতরের এক কর্তা মেনে নিয়েছেন, শুধু হোর্ডিং দিয়ে মানুষকে সচেতন করলেই হবে না। গ্রামবাসীরা কোথায় বর্জ্য ফেলবেন তার জন্য জায়গা দরকার। সে বিষয়ে পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
ওই দফতর সূত্রের খবর, স্বচ্ছ ভারত মিশন প্রকল্পে এক-একটি পঞ্চায়েতের জন্য ২০ লক্ষ টাকা করে বরাদ্দ হয়েছে। তা দিয়ে বর্জ্য ফেলার জায়গা তৈরি থেকে গাড়িতে করে বর্জ্য নিয়ে সেখানে ফেলার ব্যবস্থা করা হবে। পরে সেই বর্জ্য পুনর্ব্যবহার করে বিভিন্ন দ্রব্য উৎপাদন করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে শুধু মুম্বই রোড নয়, গ্রামের মধ্যেও যত্রতত্র বর্জ্য ফেলা বন্ধ হবে। তবে, এর জন্য এক লপ্তে প্রায় ১২ কাঠা সরকারি জমির প্রয়োজন। বিভিন্ন পঞ্চায়েত এ জন্য জমি তল্লাশি করছে।
কিছু কারখানা কর্তৃপক্ষ অবশ্য দাবি করেছেন, তাঁরা নিজেদের কেনা জমিতেই বর্জ্য ফেলেন। রাস্তার ধারে সরকারি জমিতে ফেলেন না। পাশাপাশি, বাগনানে উৎসবের জন্য যে সব বাড়ি ভাড়া দেওয়া হয় তার কয়েকটির মালিকদের দাবি, তাঁদের নিজেদের বর্জ্য ফেলার জায়গা আছে।
তা সত্ত্বেও, আবর্জনার স্তূপ জমছে মুম্বই রোডের দু’ধারে।