E-Paper

প্রচারে ‘সময়’ আড়ালে গেলেও সরবরাহ কর্মীদের ঝুঁকির বদল হল কি

‘কুইক কমার্স’ সংস্থার সঙ্গে যুক্ত এক কর্মীর দাবি, ‘‘আগে ‘১০ মিনিটে ১০ হাজারের বেশি পণ্য ডেলিভারি’র ক্যাচলাইন ছিল। এখন তা বদলে করা হয়েছে, ‘৩০ হাজারের বেশি পণ্য পৌঁছে দেওয়া হয়েছে আপনার দোরগোড়ায়’।

নীলোৎপল বিশ্বাস

শেষ আপডেট: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:৩১

—প্রতীকী চিত্র।

শব্দ বদল হল, কিন্তু তার বেশি কিছু বদলাল কি? ১০ মিনিটে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার প্রচার বদলে ফেলা হলেও এখন এমনই প্রশ্ন তুলছেন বিভিন্ন ‘কুইক কমার্স’ (দ্রুত পণ্য পৌঁছনো) সংস্থায় সরবরাহের কাজে যুক্ত কর্মীরাই। তাঁদের দাবি, আদতে কিছুই বদলায়নি। আগের মতোই এখনও অ্যাপ-নির্ভর ‘অ্যালগরিদম’ই নিয়ন্ত্রণ করবে সমস্তটা। দেখা হবে, কোন ডেলিভারি কর্মী কম সময়ে, কত সংখ্যক অর্ডার পৌঁছেছেন। দেখা হবে, তার ভিত্তিতে তিনি কত ‘রেটিং’ পেয়েছেন। ফলে, দ্রুত পণ্য পৌঁছনোর প্রতিযোগিতা বন্ধ হবে, এমন আশা করছেন না তাঁরা। এর সঙ্গেই থাকছে আগের মতো উৎসাহ-ভাতার হাতছানি। ‘ডেলিভারি টার্গেট’ পূরণ করে সেই অতিরিক্ত আয়ের জন্য বেপরোয়া বাইক ছোটানো আদৌ বন্ধ হবে না বলেই আশঙ্কা অনেকের।

‘কুইক কমার্স’ সংস্থার সঙ্গে যুক্ত এক কর্মীর দাবি, ‘‘আগে ‘১০ মিনিটে ১০ হাজারের বেশি পণ্য ডেলিভারি’র ক্যাচলাইন ছিল। এখন তা বদলে করা হয়েছে, ‘৩০ হাজারের বেশি পণ্য পৌঁছে দেওয়া হয়েছে আপনার দোরগোড়ায়’। কত সময়ের মধ্যে ডেলিভারি করা হবে, সেটা তুলে দেওয়া হলেও কত সংখ্যক পণ্য পৌঁছনো হয়েছে, সেই সংখ্যাটা রেখে দিয়েছে। কারণ, কুইক কমার্স সংস্থায় একটি গোটা দিনে কত পণ্য পৌঁছনো গেল, সেই হিসাব সব সময়েই গুরুত্বপূর্ণ। ফলে, মুখে না বললেও কম সময়ে বেশি সংখ্যক পণ্য ডেলিভারি করাতে সেই ছোটানোই হবে ডেলিভারি কর্মীদের।’’ অ্যাপ-নির্ভর সংস্থার আর এক কর্মীর মন্তব্য, ‘‘দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় ধরে অ্যাপে লগ-ইন করে থাকতে হয় আমাদের। প্রতিদিন আলাদা আলাদা ইনসেনটিভ দেওয়া হয়। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কতগুলি ডেলিভারি করতে পারলে ইনসেনটিভ পাওয়া যাবে, তা-ও অ্যাপেই জানিয়ে দেওয়া হয়। গ্রাহককে কত ক্ষণে ডেলিভারি দেওয়া হবে, সেটা না বলা হলেও ডেলিভারি কর্মীকে টার্গেট পূরণের লক্ষ্যে পরের বরাত পেতে সেই ছুটতেই হবে।’’ আর এক ডেলিভারি কর্মীর দাবি, ‘‘দ্রুত পণ্য পৌঁছে দিতে পারলে গ্রাহকের থেকে ভাল রেটিং পাওয়ার আশা থাকে। রেটিং যত ভাল হয়, ততই বেশি ডেলিভারির বরাত পাওয়া যায়।’’

‘ওয়েস্ট বেঙ্গল অ্যাপ-বেসড গিগ ওয়ার্কার্স অ্যান্ড ডেলিভারি বয় ইউনিয়ন’-এর সভাপতি শান্তি ঘোষ বললেন, ‘‘একাধিক দাবিদাওয়া সামনে রেখে আন্দোলন করা হয়েছিল। তার মধ্যে সামাজিক সুরক্ষা এবং ন্যূনতম আয়ের নিশ্চয়তার ব্যাপারে কিছু না করে শুধু ১০ মিনিটে ডেলিভারির এই প্রচার বন্ধ করা হয়েছে। ১০ মিনিটে ডেলিভারি দেওয়া হল কিনা, সে তো কুইক কমার্স সংস্থা আর গ্রাহকের বোঝাপড়ার ব্যাপার। এতে ডেলিভারি কর্মীদের জীবনে পরিবর্তন আসবে না।’’ কলকাতার সরবরাহ কর্মীদের সংগঠন ‘ডেলিভারি ভয়েজ়’-এর পক্ষ থেকে সৌম্য চট্টোপাধ্যায়ের আবার বক্তব্য, ‘‘একটি পণ্য ডেলিভারি করে পরের ডেলিভারির বরাত পেতে কর্মীকে লাইনে দাঁড়াতে হয় কেন? কারণ, তাঁদের জীবনের নিশ্চয়তা নেই। আসলে বিজ্ঞাপনের শব্দে বদল হল, ডেলিভারি কর্মীদের ঝুঁকি বদলায়নি।’’

দিনকয়েক আগেই হাওড়ায় দ্রুত সরবরাহ করতে গিয়ে লরির চাকায় জখম হয়েছিলেন এক সরবরাহ কর্মী স্নেহাশিস ঘোষ। শিরদাঁড়ায় অস্ত্রোপচার হয়েছে তাঁর। শয্যাশায়ী ওই যুবক ফোনে বললেন, ‘‘সংসারে একমাত্র রোজগেরে আমি। কোনও অর্থসাহায্য তো দূর, চিকিৎসার জন্য বিমার টাকাও পাইনি এখনও। সময় বেঁধে দেওয়া হল কিনা, সেটা কোনও ব্যাপারই নয়। আমাদের ছুটতেই হয়।’’ রাজাবাজারের বাসিন্দা আর এক সরবরাহ কর্মীরমন্তব্য, ‘‘রাত দেড়টাতেও সময়ে ডেলিভারি না পেলে রেটিং খারাপ দেন অনেক গ্রাহক। পর পর খারাপ রেটিং মানে আইডি ব্লক হওয়ার ভয়। তা হলে সংসার চলবে কী করে? তাই ছোটাই একমাত্র ভবিতব্য।’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Gig Workers Delivery

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy