Advertisement
E-Paper

মহিলার চুল কেটে বেঁধে রাখার নালিশ

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বছর তিরিশের ওই মহিলার স্বামী কাজের সূত্রে কলকাতায় থাকেন। প্রতি সপ্তাহের শনিবার তিনি বাড়ি আসেন। আর সোমবার কাজে বেরিয়ে যান। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সেই সুযোগে এলাকার অনেক যুবকের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক রয়েছে ওই মহিলার। এ নিয়ে তাঁকে বারবার সাবধান করা হলেও তিনি বিষয়টি কানেই তোলেননি।

পীযূষ নন্দী

শেষ আপডেট: ১৪ জুলাই ২০১৮ ০৮:৩০
অত্যাচারিত মহিলা

অত্যাচারিত মহিলা

বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের অপবাদ দিয়ে বছর তিরিশের এক মহিলার চুল কেটে সারা রাত বেঁধে রাখার অভিযোগ উঠল পড়়শি তথা স্থানীয় সাত তৃণমূল নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে। বুধবার রাতে খানাকুলের ধরমপুর গ্রামের ঘটনা। বৃহস্পতিবার রাতে আবদুল্লা মল্লিক, মন্টু মল্লিক, হিরা মল্লিক, মিঠু মল্লিক, লালবাবু মল্লিক, বাবর মহম্মদ এবং শেখ বেলালের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের করেন ওই মহিলা। হুগলি (গ্রামীণ) পুলিশ সুপার সুকেশ জৈন বলেন, ‘‘ঘটনার মূল অভিযুক্ত বেলালকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকিরা পলাতক। তাদের সন্ধান
শুরু হয়েছে।’’

অভিযুক্তদের মধ্যে আবদুল্লা, মিঠু, হিরা গ্রাম স্তরের নেতা, বাকিরা দলের সক্রিয় কর্মী বলে মেনে নিয়েছেন তৃণমূল অঞ্চল সভাপতি আলি হাসান। তাঁর কথায়, ‘‘অভিযুক্ত দলের ঠিকই। তবে পাড়ার এই অন্যায়ের সঙ্গে দলের কোনও যোগ নেই। অভিযুক্তদের শাস্তির দাবি জানানো হয়েছে।’’

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বছর তিরিশের ওই মহিলার স্বামী কাজের সূত্রে কলকাতায় থাকেন। প্রতি সপ্তাহের শনিবার তিনি বাড়ি আসেন। আর সোমবার কাজে বেরিয়ে যান। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সেই সুযোগে এলাকার অনেক যুবকের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক রয়েছে ওই মহিলার। এ নিয়ে তাঁকে বারবার সাবধান করা হলেও তিনি বিষয়টি কানেই তোলেননি।

কিন্তু হঠাৎ ওই মহিলাকে মারধর করা হল কেন?

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত বুধবার সকাল ১১ টা নাগাদ ওই মহিলা বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। রাস্তায় তাঁর সঙ্গে দেখা হয় শেখ বেলাল মহম্মদ নামে গ্রামেরই এক যুবকের। মহিলা ওই যুবকের বাইকে চেপে খানাকুলের থানা মোড় পর্যন্ত যান। এরপর মহিলা বাইক থেকে নেমে অন্য এক যুবকের বাইকে চেপে অন্য কোথাও যান। সেই সময় ওই মহিলার ছবি ফোনে ক্যামেরাবন্দি করেন বেলাল। গ্রামে এসে সকলকে সেই ছবি দেখার পর গ্রামের মোড়লরা ঠিক করেন ওই মহিলাকে ‘উচিৎ শিক্ষা’ দিতে হবে।

অত্যাচারিত ওই মহিলার কথায়, ‘‘বুধবার রাত আটটা নাগাদ ছেলেকে নিয়ে শুয়েছিলাম। পড়শিরা এসে বলল, সালিশিতে যেতে হবে। তারপর শুরু হল মার। টেনে নিয়ে গিয়ে আমার মাথার সামনের অংশের চুল কেটে দিল। কপাল থেকে মাথার অনেকটা ক্ষুর দিয়ে কামিয়েও দেয়। তারপর সেখানেই একটি ঘরে সারা রাত বেঁধে রেখেছিল।’’ বৃহস্পতিবার সকালে এলাকার মহিলারা তাঁর ফাঁস খুলে দিয়ে ফের মারতে মারতে ওই ঘর থেকে বের করে দিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ।

মহিলার স্বামীর কথায়, ‘‘আমার স্ত্রীকে নিয়ে পড়শিরা অনেকবার অভিযোগ করেছে। কিন্তু আমি কথা কানে তুলিনি। ওরা আমার স্ত্রীর উপর এমন অত্যাচার করবে, ভাবতেও পারিনি।’’ তিনি আরও জানান, স্ত্রীকে নিয়ে ওই গ্রামে না থাকারও নিদান দিয়েছেন গ্রামের মুরুব্বিরা।

বৃহস্পতিবার গ্রামে গিয়ে দেখা গেল, দিনভর বিষয়টি নিয়ে চর্চা চলছে। গ্রামের এক বৃদ্ধের কথায়, ‘‘বৌটার চরিত্র ভাল নয়। যা হয়েছে ঠিক হয়েছে।’’ গ্রামের মহিলাদের অভিযোগ, ‘‘আমরাই ওর চুল কেটে দিয়েছি। ১০ বছরের ছেলেকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে পর-পুরুষের সঙ্গে চলে যাচ্ছিল ও।’’ কিন্তু আইন–আদালতের দ্বারস্থ না হয়ে নিজেদের হাতে আইন তুলে নেওয়া হল কেন? সালিশি সভাই বা ডাকা হল কেন? উত্তর মেলেনি।

রাজ্যের মু্খ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মেয়েদের জন্য রূপশ্রী, কন্যাশ্রী প্রকল্প চালু করেছেন। সেই রাজ্যেই শাসদকদলের কর্মীরা সালিশি সভায় কোনও মেয়েকে এ ভাবে অপমান করল কী করে? জেলা তৃণমূল সভাপতি তপন দাশগুপ্তর কথায়, ‘‘এটা ঘোর অন্যায়। অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেফতার করুক পুলিশ। বিষয়টি মুখ্যমন্ত্রীকেও জানাব আমরা।’’

খানাকুল-১ ব্লকের এই গ্রামটি মুসলমান অধ্যুষিত। গ্রামের ৯০ শতাংশ মানুষই চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে দর্জির কাজ করতে ভিন রাজ্যে পাড়ি দিয়েছেন। মহিলার শ্বশুরবাড়ির কাছেই রয়েছে হাই মাদ্রাসা। সেখানকার প্রধান শিক্ষকের কথায়, ‘‘খানাকুল রাজা রামমোহন রায়ের জন্মস্থান। সেখানে মহিলার সঙ্গে এমন মধ্যযুগীয় বর্বরতা! আমাদের মাথাই হেঁট হয়ে গেল।”

Oppressed woman Trinamool congress
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy