বন্যায় ত্রাণ পাওয়া নিয়ে যত না ক্ষোভ তার চেয়ে বেশি বানভাসিরা বেশি উদ্বিগ্ন তাঁদের পালিত গরু, ছাগল নিয়ে। এলাকা প্লাবিত হয়ে সবুজ ঘাস উধাও, খড়ও পচে নষ্ঠ হয়ে গিয়েছে। প্রয়োজনীয় খাবার মিলছে না গরুর। গোখাদ্যের অভাবের পাশাপাশি বিক্ষিপ্তভাবে দেখা দিয়েছে রোগ, কমে গিয়েছে দুধ উৎপাদন। বস্তুত এমন পরিস্থিতি খানাকুল-১ নম্বর ব্লকের পোল ২ পঞ্চায়েতের হলেও প্লাবিত এলাকায় এই সমস্যা ক্রমশই প্রকট হচ্ছে।
পোল-২ পঞ্চায়েতের কাঁটাপুকুর গ্রামে পৌঁছনোর সব রাস্তাতেই এক মানুষ জল। নৌকাই একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম। গ্রামের আড়াইশো পরিবারের ১০০ শতাংশই সংখ্যালঘু। গ্রামে ঢোকার মুখে কিছু নতুন বানানো বাঁশের মাচা। সব মাচাতেই মানুষের ভিড়। আব্দুর রউফ নামে এক বাসিন্দার অভিযোগ, ‘‘বন্যায় আমরা অভ্যস্ত। মোটা চালের ভাত, পুঁটি মাছের টক আর আলু সেদ্ধ দিব্যি খাচ্ছি। কিন্তু গরু-ছাগল সহ অন্য প্রাণিগুলোর হাল খারাপ। তাদের পেট খারাপ থেকে নানা অসুখ হচ্ছে। প্রাণিস্বাস্থ্য দফতরের চিকিত্সকরা আসছেন না। কী ভাবে ওদের বাঁচাব জানি না।’’
নিজেদের ত্রাণের আকুতি ছাপিয়ে পোষ্য প্রাণিগুলোকে রক্ষার আর্জি শুধু কাঁটাপুকুর গ্রামেই নয়, গোটা আরামবাগ মহকুমা জুড়ে বিশেষ করে পুড়শুড়া এবং খানাকুলের দুটি ব্লকের প্রায় সবর্ত্রই। কাঁটাপুকুর গ্রামের আর এক গো-পালক শেখ মঞ্জুর বলেন, ‘‘প্রায় সাত দিন ধরে গ্রাম জলবন্দি। পানীয় জলের কলগুলি ডুবে গিয়েছে। যে কটি ভাল আছে সেখানে জল নেওয়ার বিরাট লাইন। আমার খান চারেক গরু বন্যার জলই খাচ্ছে।’’
দু’টি গাভীর মালিক মহম্মদ হুদো বলেন, ‘‘দিনমজুরির পাশাপাশি গরু পালন করে দুধ বিক্রির মাধ্যমে সংসারের অনেকটাই ঠেকনা দিই। কিন্তু চারপাশ জলের তলায়। ফলে সবুজ ঘাসের অভাব আর দীর্ঘ সময় ধরে জলে দাঁড়িয়ে পায়ে ঘা হয়ে ওরা কাহিল। এখন দুধ দেয় না বললেই চলে। প্রাণি চিকিত্সক না আসায় ওদের রোগের চিকিৎসাও হচ্ছে না।’’
সমস্যার কথা জেনেও বন্যার আট দিনের মাথাতেও কেন প্রাণি সম্পদ দফতরের চিকিত্সকরা গ্রামে না পৌঁছনোর অভিযোগ নিয়ে খানকুল ১ ব্লক প্রাণি স্বাস্থ্য আধিকারিক সঞ্জয় মণ্ডল বলেন, ‘‘প্রয়োজনীয় নৌকা এবং কর্মীর অভাবে সর্বত্র পৌঁছনো যাচ্ছে না। পঞ্চায়েতগুলির প্রধানরা নৌকার ব্যবস্থা করে যেখানে সুপারিশ করছেন সেখানেই যাচ্ছি।’’ পোল ২-এর পঞ্চায়েত প্রধান তৃণমূলের রুমা ভুক্ত বলেন, ‘‘প্রাণিসম্পদ দফতর থেকে কিছু ওষুধপত্র পঞ্চায়েতে রেখে গিয়েছে। দু-একদিনের মধ্যেই বিভিন্ন গ্রামে প্রাণি চিকিত্সা শিবির হবে।’’ দফতরের জেলা উপ অধিকর্তা প্রবীর পাঠক অবশ্য বলেন, ‘‘আমরা চব্বিশ ঘণ্টা সজাগ আছি। স্পিড বোট বা নৌকার সমস্যা থাকা সত্ত্বেও খানাকুলের সর্বত্র শিবির করে প্রাণি চিকিত্সা শুরু হয়েছে। শুধু খানাকুল ২ ব্লকে জল বেশি থাকায় সর্বত্র পৌঁছনো সম্ভব হচ্ছে না।’’ তিনি আরও জানান, বিক্ষিপ্তভাবে কিছু অসুখ হলেও কোথাও সংক্রমণের ঘটনা ঘটেনি। জল নামলেই প্রাণিগুলিকে বিভিন্ন অসুখের টিকা দেওয়া শুরু হবে। প্রতি ব্লকের মৌজা ধরে টিকাকরণের জন্য ৬টি করে দল করা হয়েছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ দফতর সূত্রে খবর, বুধবার জেলার সমস্ত ব্লকে গোখাদ্য পাঠানো হয়েছে। খানাকুলের দু’টি ব্লকে সাড়ে ৭ মেট্রিক টন করে গোখাদ্য পাঠানো হয়েছে। একই পরিমাণ পাঠানো হয়েছে তারকেশ্বর এবং হরিপালে। পুড়শুড়া ও সিঙ্গুর ব্লকে ৮ মেট্রিক টন করে এবং বাকি ব্লকগুলিতে ৩ থেকে ৫ মেট্রিক টন পর্যন্ত গোখাদ্য পাঠানো হয়েছে। পাঠানো হয়েছে জল শোধনের জন্য ফিটকিরি, ভিটামিন, পায়ে ঘায়ের ওষুধ, ক্রিমি নাশক ওষুধ ইত্যাদি।
প্রাণিসম্পদ দফতর এমন হিসাব দিলেও, গোখাদ্যের পরিমাণ নিয়ে যথেষ্ট ক্ষোভ রয়েছে গোপালকদের। তাঁদের অভিযোগ, একটি গরুর সারাদিনে খাবার লাগে কম করে ১০ থেকে ১২ কিলো। সরকারি ত্রাণ হিসাবে যা পাচ্ছি তা খড় বা অন্য খাবারের সঙ্গে গরু পিছু ৪০০ গ্রাম করে দিতে বলছে প্রাণিসম্পদ দফতর। এ দিকে জলে ডুবে কোথাও সবুজ ঘাসও নেই, নষ্ট হয়েছে খড়। গাছপালার পাতা খাইয়ে কোনওরকমে সামাল দেওয়া হচ্ছে। সরকারি ভাবে খড় কিনে দেওয়ার দাবিও তুলেছেন তাঁরা।