এক সময় গ্রামীণ হাওড়ার পরিবহণ ব্যবস্থা মূলত নির্ভরশীল ছিল বাসের ওপর। কিন্তু ধীরে ধীরে অটো, ট্রেকার সেই জায়গা দখল করতে থাকে। বর্তমানে অটো, ট্রেকার, ম্যাজিকের মতো ছোট গাড়ির দাপটে হাওড়ার গ্রামীণ এলাকার বহু বাসরুট বন্ধ হয়ে গিয়েছে। যেগুলি চালু রয়েছে সেগুলিতেও বাসের সংখ্যা কমতে কমতে প্রায় অর্ধেকে দাঁড়িয়েছে। এর কারণ হিসাবে বাসমালিক ও চালক সংগঠনগুলির অভিযোগ, অটো, ট্রেকারের সিংহভাগই অবৈধ। কিন্তু সে সব নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের তেমন গা নেই। ফলে তাঁদের বাস চালিয়ে লোকসান হচ্ছে।
ছোট গাড়িগুলির দাপটে বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন যাত্রীরা। ঝুঁকি নিয়ে ভিড়বাসে যাতায়াত করতে হচ্ছে তাদের। এর জন্য দুর্ঘটনাও বাড়ছে। কিন্তু ছোট গাড়িগুলি সরকারি নিয়ম মেনে না চলায় অনেকেই দুর্ঘটনাজনিত কোনও সুবিধা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ যাত্রীদের। মাঝে-মধ্যে অটো, ট্রেকারের সহ্গে সংঘর্ষেও জড়িয়ে পড়ছেন বাসকর্মীরা। বাসমালিক ও চালকদের দাবি, বেআইনি অটো, ট্রেকার বন্ধ করার ব্যাপারে পুলিশ প্রশাসন ও জেলা পরিবহণ দফতরে বহুবার জানানো সত্ত্বেও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
আঞ্চলিক পরিবহণ দফতরের কর্তা প্রদীপ অগ্রবাল বলেন, ‘‘আমাদের কাছে অভিযোগ এলেই ব্যবস্থা নিই। তবে পুলিশেরও বিষয়টি দেখা দরকার।’’ পুলিশের একাংশের অভিযোগ, বেআইনি গাড়ি ধরলেও অনেক সময়েই রাজনৈতিক চাপে তাদের ছেড়ে দিতে হয়। জেলার পুলিশ সুপার (গ্রামীণ) সুকেশ জৈন বলেন, ‘‘বেআইনি গাড়ির বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলে। ধরপাকড়ও করা হয়।’’ উলুবেড়িয়ার মহকুমা শাসক নিখিল নির্মল বলেন, ‘‘সম্প্রতি জেলাস্তরে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন দফতরের আধিকারিক ও জনপ্রতিনিধিরা ছিলেন। আলোচনায় বেআইনি অটো বা ছোট গাড়ির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে।’’
আঞ্চলিক পরিবহণ দফতর ও বাসমালিক সংগঠন সূত্রে জানা গিয়েছে, জেলার অন্তত ১০টি গুরুত্বপূর্ণ রুটে বাস বন্ধ হয়ে গিয়েছে। কয়েকটি রুটে বাসের সংখ্যা কমে গিয়েছে। বাকসি-মেচেদা মিনিবাস, বাকসি-হাওড়া (ভায়া বাগনান), থানাপুর-বাগনান, বাইনান-বাগনান, পাঁশকুড়া-উলুবেড়িয়া, বাগনান-গড়চুমুক, বাগনান-শিবগঞ্জ, হাওড়া-মাথাপাড়া, গাদিয়াড়া-উলুবেড়িয়া, বোয়ালিয়া-উলুবেড়িয়া রুটগুলিতে এক সময় ১৫ থেকে ৩০টা করে বাস চলত। এখন সব বাস উঠে গিয়েছে। এ ছাড়াও বেশ কয়েকটি রুটে, যেমন বাকসি-হলদিয়া, গাদিয়াড়া-হলদিয়া দূরপাল্লার গাড়ি চলত। বন্ধ হয়ে গিয়েছে সেগুলিও। বাগনান-আমতা, বাগনান-জয়পুর, বাগনান-কমলাপুর, আমতা-সাঁকরাইল, আমতা-উলুবেড়িয়া, হাওড়া-ঝিকিরা, মুচিঘাটা-সল্টলেক, ডিহিভুরসুট-হাওড়া (ভায়া উদয়নারায়ণপুর), গাদিয়াড়া-ধর্মতলা রুটগুলিতে বাসের সংখ্যা অর্ধেক হয়ে গিয়েছে। একব্বরপুর-হাওড়া রুটে বাস একব্বরপুর না গিয়ে চাঁপাতলা পর্যন্ত চলছে। আর বাস বন্ধ থাকার সুযোগ নিয়ে ওই সব এলাকায় বেড়ে গিয়েছে অটো, ট্রেকারের সংখ্যা। ঝিখিরা-হাওড়া বাসরুটের সম্পাদক দেবাশিস পালুই, আমতা-উলুবেড়িয়া রুটের বাস ইউনিয়নের সদস্য তমাল রায় বলেন, ‘‘স্থানীয় এলাকায় অটো-ম্যাজিক, ভ্যানোর দাপটে বাসগুলি যাত্রী পাচ্ছে না। আমাদের লোকসান হচ্ছে। দিনের পর দিন তো এ ভাবে চলা যায় না।’’ বাগনান, শ্যামপুর, ও পাঁচলার বিভিন্ন রুটের যাত্রী ও নাগরিক কমিটির তরফে উত্তম রায়চৌধুরী, বিশ্বনাথ মণ্ডল, সুব্রত চক্রবর্তী, শেখ বাগবুল ইসলামরা বন্ধ রুটগুলিতে ফের বাস চলাচলের দাবিতে দীর্ঘ দিন ধরে আন্দোলন করছেন। তাঁদের বক্তব্য, বেআইনি অটো-ট্রেকারের দাপটে বাসের লোকসান হচ্ছে এটা সত্যি। কিন্তু সেটা প্রশাসনের দেখার বিষয়। এর জন্য তাঁরা কেন ভোগান্তির শিকার হবেন।