এক সময় বিশ্বকর্মা পুজোকে ঘিরে উৎসবে মেতে উঠত হুগলি শিল্পাঞ্চল। গঙ্গার পাড় ঘেঁষে একের পর এক চটকল, কটন মিল, গাড়ি কারখানা, টায়ার কারখানা-সহ ছোট-বড়-মাঝারি কারখানা আলোর মালায় ভাসত। শ্রমিক পরিবারের ছেলেমেয়েরা নতুন জামাকাপড় পড়ত। সেই সুদিন আর নেই। একের পর এক বন্ধ এবং ধুঁকতে থাকা শিল্পের শ্রমিকদের হাহুতাশে জৌলুস হারিয়েছেন বিশ্বকর্মা।
রাজ্যের একমাত্র গাড়ি কারখানা হিন্দুস্তান মোটরস। উত্তরপাড়ায় কয়েক একর জুড়ে গড়ে ওঠা এই শিল্প এখন বন্ধ কারখানার তালিকায় নিজের নাম লিখিয়েছে। প্রায় দেড় বছর হতে চলল, কারখানা খোলার লক্ষণ দূর অস্ত, উল্টে পাকাপাকি ভাবে তালা পড়ার আশঙ্কা জাঁকিয়ে বসছে শ্রমিকদের মনে। দিন কয়েক আগেই স্বেচ্ছাবসরের বিজ্ঞপ্তি পড়েছে আবারও (এই নিয়ে তৃতীয় বার)। গত বছর থেকেই এখানে বিশ্বকর্মার পুজো হচ্ছে না। এ বারও তাই। অথচ এক সময় এই পুজোকে কেন্দ্র করে ঝলমল করত গোটা চত্বর। আশপাশের এলাকা থেকে দলে দলে মানুষ কারখানায় আসতেন পুজো দেখতে। এ বার সেই কারখানা চত্বরেই নিকষ কালো অন্ধকার। গত বার কারখানার গেটের সামনে আইএনটিটিইউসি-র উদ্যোগে পুজো হয়েছিল। এ বার তাও হয়নি। আইএনটিটিইউসি নেতা উত্তম চক্রবর্তী বলেন, ‘‘যা পরিস্থিতি, কারখানা খোলা নিয়ে কোনও আশার আলো কর্তৃপক্ষ দেখাতে পারছেন না। শ্রমিকরা মুষড়ে পড়েছেন। এই পরিস্থিতিতে পুজোর আনন্দ শ্রমিকদের কাছে অর্থহীন।’’
শুধু হিন্দমোটরই নয়, কোন্নগর থেকে শ্রীরামপুর, ভদ্রেশ্বর থেকে চন্দননগর, সাহাগঞ্জ বা ত্রিবেণী— সর্বত্রই বিভিন্ন কারখানায় মানুষের ঢল নামত। উঁচু পাঁচিল ঘেরা চৌহদ্দিতে বিশাল বিশাল যন্ত্র দেখা আর সুস্বাদু লাড্ডুতে কামড় বসানোর বাসনাই তাঁদের টেনে নিয়ে যেত। এই একটা দিনই কল-কারখানায় ঢোকার অনুমতি মিলত সাধারণ মানুষের। কোনও কোনও কারখানায় ঢালাও খাওয়া দাওয়ারও আয়োজন করা হত। বড় কারখানায় কর্মীদের পরিবারের শিশুদের জন্য বিশেষ অনুষ্ঠান এবং উপহারের ব্যবস্থা থাকত। শ্রীরামপুরের বঙ্গলক্ষ্মী কটন মিলে বহু মানুষ পুজো দেখতে যেতেন। সেই মিল চত্ত্বর এখন খাঁ খাঁ করছে। বেশ কয়েক বছর হল মিলটি বন্ধ। সেই জমিতে এখন আবাসন ওঠার অপেক্ষা।
সাহাগঞ্জের ডানলপ কারখানার যখন সুদিন ছিল, তখন এখানেও বিশ্বকর্মা পুজোয় জৌলুস ছিল। খাতায়-কলমে বন্ধ না হলেও বর্তমানে পবন রুইয়ার মালিকানাধীন এই কারখানাতেও উৎপাদন বন্ধ। শ্রমিকদের লক্ষ লক্ষ টাকা পাওনা বকেয়া। এই পরিস্থিতিতে বিশ্বকর্মা পুজো আর পাঁচটা দিনের মতোই বিস্বাদে কাটিয়েছে ডানলপের শ্রমিক মহল্লা। ওই কারখানার শ্রমিক রামেশ্বর সিংহ বলেন, ‘‘পাঁচ বছর ধরে এখানে কোনও পুজো নেই। আলো জ্বলে না।’’
অতীতে বিশেষ দিনটিকে ঘিরে জাঁকজমকের কথা তুলতেই রামেশ্বরবাবু থামিয়ে দেন। বলেন, ‘‘ওই সব কথা ভাবলে খুব কষ্ট হয়। কারখানায় উৎসবের কথা কল্পনাও করতে পারি না। আজ সারা দিন বাড়িতে বসে কাটিয়েছি।’’ হুগলি শিল্পাঞ্চলের প্রায় সব কটি চটকলই শ্রমিক-মালিক বিরোধে জর্জরিত। পুজোয় আগের সেই প্রাণ নেই।
ডানকুনির বামুনারিতে দিল্লি রোডের ধারের একটি পিচ প্রস্তুতকারী কারখানার এ বারেও পুজো হয়েছে। তবে জাঁকজমক অন্য বারের চেয়ে কম ছিল বলে শ্রমিকরা জানাচ্ছেন। দু’দশক ধরে ওই কারখানার কর্মী অজয় খান। বললেন, ‘‘মন্দার কারণ দেখিয়ে কর্তৃপক্ষ পুজো করতেই চাইছিলেন না। আমরাই জোর করি।’’ কারখানার শ্রমিকরা জানালেন, আগের বার পুজো উপলক্ষে দুপুরে খাসির মাংস-ভাত খাওয়ানো হয়েছিল। আর্থিক কারণে এ বার খাসির বদলে মুরগি।