ইদের নমাজ সবে শেষ হয়েছে। ইদগাহে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরা বৃদ্ধ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘‘বাড়ি-মালিকদের বলছি, আমার অবস্থা দেখতে পাচ্ছ তো? আমার মতো ভুল করো না। ভাড়া দেওয়ার সময়ে ভাড়াটেদের কাছ থেকে সমস্ত নথি নেবে। তা পুলিশকে দিয়ে পরীক্ষা করানোর পরে ভাড়া দেবে।”
মহম্মদ হাসান চৌধুরী নামে ওই বৃদ্ধ বর্ধমানের খাগড়াগড়ের বাসিন্দা। ঠিক দু’বছর আগে যে বাড়িতে বিস্ফোরণ ঘটেছিল, সেটির মালিক তিনি। পরিচয়পত্র ছাড়াই ওই সব লোকজনকে কেন যে বাড়িটা ভাড়া দিয়েছিলেন, এত দিন পরেও তা নিয়ে আক্ষেপ করেন বৃদ্ধ। সুযোগ পেলেই বাড়ির মালিকদের বোঝান, সেই ভুল যাতে কেউ না করেন। ওই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে এলাকার কিছু যুবকও জনতার মধ্যে এ ব্যাপারে সচেতনতা বাড়াতে উদ্যোগী হয়েছেন।
২০১৪ সালের ২ অক্টোবর, অষ্টমীর দুপুরে খাগড়াগড়ে ওই বিস্ফোরণে নিহত হন দু’জন। ঘটনার সূত্র ধরে এ রাজ্যের নানা প্রান্ত ও আশপাশের রাজ্যে ছড়িয়ে থাকা জঙ্গি নেটওয়ার্কের হদিস পান গোয়েন্দারা। সেই দোতলা বাড়িটি এখনও ‘সিল’ করা আছে। উল্টো দিকে নিজের আর একটি একতলা বাড়িতে থাকেন হাসান চৌধুরী। শনিবার সেখানে বসেই তিনি বলেন, ‘‘পরিচিত এক জনের মারফত বাড়ি ভাড়া নিতে এসেছিল শাকিল (বিস্ফোরণে নিহত শাকিল গাজি)। তাকে বলেছিলাম, কাগজপত্র দেখিয়ে চুক্তি না করলে পুজোর পরে উঠে যেতে হবে। কিন্তু তার আগেই তো কাণ্ড ঘটে গেল!’’
দু’বছর পরেও দুশ্চিন্তায় ভোগেন বৃদ্ধ। তাঁর কথায়, ‘‘কওসর (বিস্ফোরণ-কাণ্ডে অন্যতম অভিযুক্ত) এখনও ধরা পড়েনি। আমি বাড়ি থেকে বিশেষ বেরোই না। কোথাও গেলে একা যাওয়ার সাহস হয় না।’’ ঘটনার পরে পুলিশ-সিআইডি তাঁকে সপ্তাহখানেক আটক করেছিল। এনআইএ (জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা) জি়জ্ঞাসাবাদ করার পরে তাঁকে ছেড়ে দেয়। বছর আটষট্টির হাসান চৌধুরীর হতাশা, ‘‘দু’বছর ধরে বাড়িটা বন্ধ। ওটা ভাড়া দিয়ে আমার ভাল আয় হতো। এখন সে সব লাটে উঠেছে। এনআইএ-কর্তাদের কাছে এ বার বাড়িটা খুলে দেওয়ার আবেদন জানিয়েছি।’’ তাঁর সংযোজন: ‘‘ভাড়াটেদের নথি রাখা কেন দরকার, সুযোগ পেলেই আমার এই অবস্থার উদাহরণ দিয়ে পরিচিতদের বোঝানোর চেষ্টা করি।’’
এই বাড়িতেই ঘটেছিল বিস্ফোরণ।
বিস্ফোরণের পরে বর্ধমান সদরের নানা এলাকা থেকে কিছু ভাড়াটে উধাও হয়ে যায়। তার পরে খানিক নড়েচড়ে বসলেও ভাড়াটেদের তথ্য রাখার ব্যাপারে পুলিশ-প্রশাসন এখন ফের গা-ঢিলে দিয়েছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর। কয়েক মাস আগে খাগড়াগড়ের কিছু যুবক উদ্যোগী হয়ে বাড়ির মালিকদের ডেকে জানান, ভাড়াটের পরিচয়পত্র সিভিক ভলান্টিয়ারদের মাধ্যমে থানায় জমা দিতে হবে। শেখ আনোয়ার, বিশ্বজিৎ দাসেরা বলেন, “বলা হয়েছে, যে সব বাড়ির মালিকেরা ভাড়াটের পরিচয়পত্র রাখবেন না, তাঁদের বাড়িতে ভাড়াটেকে নিয়ে কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলেই থানায় খবর চলে যাবে। পুলিশ এসে যদি জানতে পারে ভাড়াটের পরিচয়পত্র বাড়িওয়ালা রাখেননি, তখন সেই বাড়িওয়ালা ঠেলা সামলাবেন।’’ ওই যুবকদের দাবি, এই ‘হুঁশিয়ারি’তে কাজ হয়েছে। এলাকায় অনেক বাড়িওয়ালাই সচেতন হয়েছেন।’’
বর্ধমান জেলা পুলিশের এক কর্তা মেনে নেন, ‘‘ঘটনার পরে একটা ঝাঁকুনি দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। তার বেশি কিছু এগোয়নি।’’ তবে তাঁর বক্তব্য, “ভাড়াটেদের তথ্য সংগ্রহে পুলিশের পাশাপাশি পুরসভাকেও এগিয়ে আসতে হবে।’’ বর্ধমান পুর কর্তৃপক্ষের তরফে অবশ্য এ ব্যাপারে কোনও পদক্ষেপের আশ্বাস মেলেনি।
ছবি: উদিত সিংহ।