বানারহাট চা বাগানের লছমি ওঁরাওয়ের (নাম পরিবর্তিত) কাছে সুযোগটা এসেছিল একেবারে অযাচিত ভাবেই। কলকাতায় থাকা-খাওয়ার কাজ। বাচ্চার একটু দেখভাল করতে হবে। আর সঙ্গে, খাটতে হবে গৃহকর্ত্রীর ফাই-ফরমাশ। ভাল রোজগারের ‘অফার’!
বন্ধ চা বাগানের শ্রমিক লছমির বাবা আর পাঁচ সন্তানের জননী লছমির মায়ের পক্ষে সেই ‘অফার’ ফেরানো সম্ভব হয়নি। তাই আধা-পরিচিত এক ‘মাসি’র সঙ্গে বছর তিনেক আগে কলকাতার ট্রেনে চেপে বসেছিল লছমি। একেবারে হালে, মাসতিনেক আগে নয়ডার এক হা-হতশ্রী বস্তি থেকে পুলিশ লছমিকে উদ্ধার করেছে।
কাহিনীটা প্রায় একই রকম, শমিমা খাতুনেরও (নাম পরিবর্তিত)। পাথর প্রতিমার আয়লা-বিধ্বস্ত গ্রামের ১২ বছরের মেয়েটি নাচতে ভালবাসত খুব। এক দিন হঠাৎ পড়শি গ্রামের এক ‘দিদি’ আসে তার বাবা-মায়ের কাছে। বলে, শমিমাকে সে একটা ভাল একটা ‘ডান্স স্কুল’-এ ভর্তি করিয়ে দেবে। পয়সাকড়ি লাগবে না। তার নাকি সেখানে খুব ‘দোস্তি’ রয়েছে! শুধু তাই নয়, ওই ‘দিদি’ শমিমার বাবা-মাকে এও বলেছিল, ওই ‘ডান্স স্কুলে’ খেতে-পরতেও দেওয়া হবে। তার জন্য কোনও টাকা-পয়সা তো লাগবেই না, উল্টে শমিমাকে মাসে মাসে কিছু টাকাও দেওয়া হবে হাতে। শমিমা সেটা জমাতে পারবে।
প্রায় দেড় বছর পরে আরও প্রায় ৯/১০টি মেয়ের সঙ্গে শমিমাকে উদ্ধার করা হয় আগরার এক যৌনপল্লি থেকে।
সত্য সেলুকাস, কী বিচিত্র এই দেশ! দেখুন ভিডিও।
লছমি বা শমিমা বাড়ি ফিরে আসতে পারলেও, সরকারি তথ্য বলছে, গত ৫ বছরে (২০১০-’১৪) সারা দেশে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া শিশু/কিশোরের সংখ্যা ৩ লক্ষ ৮৫ হাজার। তার মধ্যে মাত্র ৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে নিখোঁজ শিশুদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের দেওয়া তথ্য-সূত্র বলছে, নিখোঁজ ওই পৌনে চার লক্ষ শিশুর মধ্যে ২০ শতাংশেরও বেশি পশ্চিমবঙ্গের। আরও ঠিকঠাক ভাবে বলতে হলে, নিখোঁজ শিশুদের ৬০ শতাংশ যে ৪টি রাজ্য থেকে, তার শীর্ষে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ।
২০১৪ সালে, শুধু পশ্চিমবঙ্গ থেকেই ১৪ হাজার ৬৭১টি শিশু-নিখোঁজের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। যা, ওই বছর সারা দেশে নিখোঁজ শিশুদের ২১.৬ শতাংশ। তার মানে, সারা দেশে নিখোঁজ শিশুদের প্রতি পাঁচ জনের এক জনই এই পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা।
ভারতে শিশু-পাচারের প্রবণতা: পরিসংখ্যান।
উদ্বেগের এখানেই শেষ নয়। ‘ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস্ ব্যুরো’ (এনসিআরবি)-র পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, ২০১০ থেকে ২০১৪- এই পাঁচ বছরে পশ্চিমবঙ্গ ছিল শিশু অপহরণের ক্ষেত্রে প্রথম পাঁচটি রাজ্যের মধ্যে একেবারে শীর্ষে।
২০১০ সালে যেখানে পশ্চিমবঙ্গ থেকে শিশু অপহরণের ৩৩২টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল, সেখানে ২০১৪ সালে তা ৬০৮ শতাংশ বেড়ে হয়- ২৩৫১!
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তথ্যটি ষদি একটু অন্য দিক থেকে খতিয়ে দেখা যায়, তা হলে দেখা যাবে, গত পাঁচ বছরে মোট নিখোঁজ শিশুদের মধ্যে ৬১ শতাংশই কিশোরী। শুধু তাই নয়, যদি প্রতিটি বছরের হিসেব আলাদা ভাবে করা যায়, তা হলে দেখা যাবে, কোনও বছরেই নিখোঁজ কিশোরীর সংখ্যা ৬০ শতাংশের কম নয়।
শিশু-পাচারে মূল শিকার মেয়েরাই। কতটা?
পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এই হিসেবটা আরও ভয়াবহ। আরও মারাত্মক। ২০১৪-র হিসেব বলছে, এ রাজ্যের নিখোঁজ শিশুদের মধ্যে ৭০ শতাংশই কন্যাশিশু। এখানেই শেষ নয়। এনসিআরবি-র তথ্য আরও জানাচ্ছে, যৌন পেশায় নিয়োগের জন্য কিশোরী-পাচারের ঘটনায় সারা দেশে এগিয়ে থাকা রাজ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ, অসম, বিহার ও ওড়িশা।
মোট যত শিশু পাচারের ঘটনা ঘটেছে গত পাঁচ বছরে, তার ৭৫ শতাংশই ঘটেছে ওই ৪ রাজ্য থেকে। আর তার ৪০ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে শুধু পশ্চিমবঙ্গেই।
নিখোঁজ শিশুর ৪০ শতাংশের খোঁজ মেলেনি এখনও।
সর্বভারতীয় শিশু অধিকার সংস্থা ‘চাইল্ড রাইট্স অ্যান্ড ইউ-ক্রাই’-এর পূর্বাঞ্চলীয় অধিকর্তা অতীন্দ্রনাথ দাস জানাচ্ছেন, ‘‘একেবারে সাম্প্রতিক বছরে পশ্চিমবঙ্গ থেকে নিখোঁজ শিশুর সংখ্যা সামান্য কমলেও, বিষয়টি এখনও যথেষ্টই উদ্বেগজনক। বিশেষ করে, নিখোঁজ শিশুদের মধ্যে কিশোরীর সংখ্যা এতটাই বেশি যে, স্পষ্ট বোঝা যায়, শিশু-পাচার একটি সংগঠিত অপরাধের চেহারা নিয়েছে। আর এটা শুধুই পশ্চিমবঙ্গ নয়, গোটা দেশের সমস্যা। বলা বাহুল্য, নিখোঁজ কিশোরীদের একটি বড় অংশই আসলে পাচার হয়ে যাওয়া শিশু। এই প্রবণতাটাই সবচেয়ে উদ্বেগের। তবে যেটা খুব দুঃখজনক, তা হল- ২০০২ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জের সনদ ‘ইন্টারনাল প্রোটোকল অন ট্র্যাফিকিং’-এ ভারত সই করলেও, এখনও পর্যন্ত এই সমস্যার সমাধান সম্ভব হয়নি।’’
তা হলে, সমাধান কোন পথে?
শিশু অধিকার বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, শিশু-পাচার সমস্যার মোকাবিলায় সরকারি স্তরে আইনের কোনও অভাব নেই। নতুন ‘পক্সো’ (‘প্রোটেকশন অফ চিলড্রেন্স ফ্রম সেক্স্যুয়াল অফেন্সেস’) আইনটি কার্যকর হওয়া সত্ত্বেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। অত্যাধুনিক সাইবার প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে কেন্দ্রীয় স্তরে ‘চাইল্ড ট্র্যাক’ আর ‘খোয়া-পায়া’ পোর্টালও চালু হয়েছে।
শিশু-পাচার ও উদ্ধার: কী বলছে এনসিআরবি-র রিপোর্ট।
‘‘তবে যত দিন পর্যন্ত সমাজের একেবারে সাধারণ স্তরের মানুষ এ ব্যাপারে সচেতন না হচ্ছেন, তখন এর সার্বিক রূপায়ণ সম্ভব নয়। প্রত্যন্ত গ্রামে শিশু-পাচার চক্রের আড়কাঠিরা কখন কী ভাবে কিশোরীদের চাকরি বা বিয়ের টোপ দিয়ে পাচারের চেষ্টা করছে, তা সবার আগে নজরে আসা সম্ভব রাজ্যবাসীদের। তাঁরা সচেতন হলেই ওই সমস্যাটি নির্মূল করা সম্ভব। অনেক সময়েই হতদরিদ্র পরিবারের বাবা-মায়েদের এমন প্রস্তাবে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। গোড়া থেকে সমস্যাটির মোকাবিলা করতে হলে, সবার আগে তাঁদেরই সচেতন করতে হবে’’, জানিয়েছেন অতীন্দ্রনাথবাবু।
তথ্য বিশ্লেষণ: ‘চাইল্ড রাইট্স অ্যান্ড ইউ-ক্রাই’।