Advertisement
E-Paper

অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে কালনা শহরের পুরাকীর্তি

শহরে রয়েছে অসংখ্য পুরাকীর্তি। সেগুলিকে নিয়ে কালনায় ঘটা করে হয় পর্যটন উৎসব। পর্যটক টানতে স্থানীয় বিধায়কের নেতৃত্বে গ্যাংটক অবধি মোটরবাইক মিছিল করে প্রচারও করা হয়। কিন্তু এত আয়োজনের মধ্যেও নিঃশব্দে হারিয়ে যেতে বসেছে এই শহরেরই তিনটি পুরাকীর্তি।

শেষ আপডেট: ০৯ ডিসেম্বর ২০১৫ ০১:০২
দাঁতনকাঠিতলার পুরনো মসজিদ-নিজস্ব চিত্র

দাঁতনকাঠিতলার পুরনো মসজিদ-নিজস্ব চিত্র

শহরে রয়েছে অসংখ্য পুরাকীর্তি। সেগুলিকে নিয়ে কালনায় ঘটা করে হয় পর্যটন উৎসব। পর্যটক টানতে স্থানীয় বিধায়কের নেতৃত্বে গ্যাংটক অবধি মোটরবাইক মিছিল করে প্রচারও করা হয়। কিন্তু এত আয়োজনের মধ্যেও নিঃশব্দে হারিয়ে যেতে বসেছে এই শহরেরই তিনটি পুরাকীর্তি।

শহরের দাঁতনকাঠিতলায় রয়েছে মসজিদ-ই-মজলিস। এলাকার ইতিহাস নিয়ে চর্চা করা মানুষজন জানান, ১৫৩৩ খ্রিস্টাব্দে গড়ে উঠেছিল এই মসজিদ। তৈরি করেছিলেন সুলতান ফিরোজ শাহের সেনাপতি আলাউদ্দিন আবুল মুজাফফরের অমাত্য উলুখ মলজদ খাঁ মালিক। প্রাচীন এই মসজিদ ঘিরে রয়েছে ৭৩ শতক জমি। ইতিহাসবিদেরা জানান, সুলতানি আমলে কালনায় অনেক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের বাস ছিল। মীরের বাগান-সহ শহরের বেশ কয়েকটি জায়গায় ছিল তাদের মহল্লা। এই সমস্ত পরিবারের লোকজনেরা পালকি চড়ে এই মসজিদে নমাজ পড়তে আসতেন। ৫০০ বছরেরও বেশি পুরনো এই মসজিদ দেখতে এখনও ভিড় করেন পর্যটকরা। এখনও ইদে স্থানীয় মানুষ এই মসজিদে আসেন নমাজ পড়তে। তবে অযত্ন এবং অবহেলায় ইতিমধ্যে হারিয়ে গিয়েছে মসজিদের গায়ের বেশির ভাগ কারুকাজ। মসজিদে দশটি গম্বুজ ছিল। তার প্রতিটিতে ছিল সুক্ষ্ম নকসা। এখন সে সবের কোনও চিহ্ন আর পড়ে নেই। রয়েছে শুধু কালো থামের উপর দু’টি খিলান। আর মসজিদের ভিতরে কয়েকটি কারুকাজ করা থাম।

বর্তমানে মসজিদটির দেখভালের দায়িত্বে রয়েছে কালনা আঞ্জুমান কমিটি। কমিটির দাবি, ১৯৩৯ সাল অবধিও মসজিদের ৮টি গম্বুজ টিকে ছিল। তাঁরা জানান, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে শেষ গম্বুজটি নষ্ট হয়ে যায় ১৯৯০ সালে। আগে এলাকার বনেদি পরিবারের সদস্যেরা প্রতি শুক্রবার এখানে নমাজ পড়তেন আসতেন। মসজিদের পিছনের পুকুর ঘাটে যাওয়ার একটি সুড়ঙ্গপথ ছিল। সেটিও নষ্ট হয়ে গিয়েছে বহু বছর আগে।

কমিটি সূত্রে জানা যায়, প্রাচীন এই পুরাকীর্তি সংস্কারের জন্য এক বার সরকারি সাহায্য মিলেছিল ১৯৬০ সালে। মসজিদের মেঝে এবং তখনও পর্যন্ত টিকে থাকা শেষ গম্বুজটির গার্ডওয়াল তৈরি করার দায়িত্ব পেয়েছিল পূর্ত দফতর। কিন্তু তার পর থেকে মসজিদটি সংরক্ষণে কেন্দ্রীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগ বা রাজ্য সরাকারের পর্যটন দফতরের কোনও হেলদোল দেখা যায়নি। গত ৫ বছর ধরে মসজিদের পিছনের অংশ ভেঙে পড়ছে। পাশের পুকুরে দিন দিন তলিয়ে যাচ্ছে মসজিদের জমি। মসজিদের পিছনে একটি চওড়া রাস্তা ছিল। তার অনেকটাই এখন পুকুরে মিশে গিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, যে কোনও সময় ভেঙে পড়তে পারে সুলতানি আমলের এই স্মৃতিচিহ্নটি। কালনা আঞ্জুমান কমিটির সভাপতি শাহনাওয়াজউদ্দিন মণ্ডল জানান, ‘‘জেলা পরিষদ, মহকুমাশাসকের কার্যালয়, পর্যটন মন্ত্রক-সহ বিভিন্ন সরকারি দফতরে কড়া নেড়েও কোনও লাভ হয়নি। এলাকার মানুষের সহায়তায় কোনও মতে মসজিদটি এখনও টিকে রয়েছে।’’ তবে এ ভাবে আর কত দিন চালানো যাবে তা নিয়ে তাঁরা সকলেই চিন্তিত।

শুধু দাঁতনকাঠিতলার মসজিদটিই নয়, অবহেলায় নষ্ট হতে বসেছে শহরের জগন্নাথতলার জোড়া শিবমন্দিরও। স্থানীয় ঐতিহাসিকরা জানান, বর্ধমান রাজ পরিবার ১৭৫৩ সালে ভাগীরথীর পাড়ে পাশাপাশি এই মন্দির দু’টি নির্মাণ করেন। মন্দির দু’টির গায়ে রয়েছে টেরাকোটার কারুকার্য। বর্তমানে দু’টি মন্দির থেকেই চাঙর খসে পড়ছে। বহু টেরাকোটার কা়জও নষ্ট হয়ে গিয়েছে। মন্দিরের চূড়ায় গজিয়ে উঠেছে গাছ।

রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধ্বংসের জন্য দিন গুনছে শহরের সমাজবাড়ির প্রাচীন দু’টি মন্দিরও। অবহেলায় সেখান থেকেও মুছে গিয়েছে অজস্র কারুকার্য। দেওয়াল থেকে খসে পড়েছে চুন সুড়কি। সমাজবাড়ি বাঁচাতে বছর দুয়েক আগে রাস্তায় নেমেছিলেন শহরের বহু মানুষ। তারপর মন্দিরটি সংস্কারের জন্য প্রশাসনিক বৈঠক হয়েছে। বছর খানেক আগে জোড়া শিবমন্দির এবং সমাজবাড়ি পরিদর্শন করতে রাজ্য হেরিটেজ কমিশনের একটি দলও এসেছিল। কিন্তু দিনের শেষে কাজের কাজ কিছুই হয়নি বলে অভিযোগ শহরবাসীর। মহকুমাশাসকের কার্যালয় সূত্রে জানা গিয়েছে, পরিদর্শনের পর কোনও সরকারি রিপোর্টও মেলেনি।

কালনা পর্যটন উৎসবের উদ্যোক্তা কালনার বিধায়ক বিশ্বজিৎ কুণ্ডু এই শহরেরই বাসিন্দা। তিনি জানান, সম্প্রতি কেন্দ্রীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগের পূর্বাঞ্চলীয় অধিকর্তা ফণিকান্ত মিশ্র কালনায় এসেছিলেন। তাঁকে মন্দির তিনটির বিষয়ে জানানো হয়েছে। তাঁর কাছ থেকে মন্দিরগুলির সংস্কার ও সংরক্ষণের আশ্বাস মিলেছে বলে বিশ্বজিৎবাবু দাবি করেন।

দিন গুনতে গুনতে ইতিহাসের চিহ্নগুলি স্মৃতিমাত্র না হয়ে যায়, আশঙ্কা এলাকার মানুষের।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy