সামনেই বিধানসভা ভোট। তার মাঝে দলের এক সাংসদ এবং এক বিধায়কের প্রকাশ্য দ্বন্দ্বে অস্বস্তিতে হুগলি জেলা তৃণমূল। হুগলির সাংসদ রচনা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং চুঁচুড়ার বিধায়ক অসিত মজুমদারের সেই দীর্ঘ ঠোকাঠুকি মেটাতে এ বার মাঠে নামলেন তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। চুঁচুড়ায় কর্মিসভায় দু’জনের মধ্যে বরফ গলানোর চেষ্টা করতে গিয়ে কল্যাণ-বার্তা, নির্বাচন মিটলে দু’জনকেই তিনি লাঠি ধরিয়ে দেবেন। তখন তাঁরা চাইলে লাঠালাঠি করবেন। কিন্তু আর সেই পরিস্থিতি থাকবে না বলেই আশাবাদী তিনি।
তার পর বিধায়ক অসিত আর সাংসদ রচনার হাত মিলিয়ে দিলেন শ্রীরামপুরের সাংসদ।
গত এক বছর ধরে বিভিন্ন ইস্যুতে রচনা এবং অসিতের দূরত্ব বেড়েছে। কেউ কারও কর্মসূচিতে যান না। বছরের শুরুতে রচনা তো বলেই দিয়েছিলেন, ‘‘আমাকে আমার মতো থাকতে দাও।’’ তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাবে এ-ও জানিয়ে দেন অসিতের আয়োজিত কোনও সভায় থাকবেন না। এমতাবস্থায় শুক্রবার চুঁচুড়ায় তৃণমূলের বিধানসভার কর্মিবৈঠকে শাসকদলের অন্যান্য প্রতিনিধির সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন রচনা। তাঁর খানিক দূরত্বেই বসেছিলেন অসিত। দু’জন এমন ভাবে বসেছিলেন, যাতে চোখাচোখিও না-হয়।
বৈঠক শুরু হয়। এসআইআর পর্বে কর্মীদের কী করণীয়, তার ব্যাখ্যা দেওয়া ছিল মূল উদ্দেশ্য। তবে সে সব ছাপিয়ে রচনা এবং অসিতের দ্বন্দ্ব মেটানোই হয়ে ওঠে আলোচনার মূল উপপাদ্য। এমনিতে শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণকে হুগলির বেশ কয়েকটি বিধানসভা পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব দিয়েছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। বিধানসভা ভোটকে সামনে রেখে সকল তৃণমূল নেতা-কর্মীকে এক হয়ে লড়ার বার্তা দেওয়ার দায়িত্ব পালন করছিলেন কল্যাণ। ঠিক তখনই তাঁর চোখ যায় অসিতের দিকে। প্রথমে দাদাসুলভ ধমকে অসিতকে সাবধান করেন তিনি। বস্তুত, রচনার সঙ্গে অসিতের ঝগড়া মেটানোর জন্যই মিনিট দুই ব্যয় করেন শ্রীরামপুরের সাংসদ। নরমে-গরমে দু’জনকে বলেন, এক হয়ে ময়দানে নামতে হবে।
কল্যাণের কথায়, ‘‘তপন (অসিতের ডাকনাম) মাঝেমধ্যে বিগড়ে যায়। ওর কতগুলো চামচা আছে, ওকে বিগড়ে দেয়।’’ তার পর বিধায়কের উদ্দেশে কল্যাণ-বাণী, ‘‘তুই ভীষণ ভাল। তোর মতো বিধায়ক পাওয়া দুষ্কর। আবার তোর মতো লাগামহীন মুখ পাওয়াও যায় না।’’
অসিতকে কল্যাণ বলেন, ‘‘রচনাকে পুরো সম্মান দিয়ে কাজ করবে।’’ রচনাকে বলেন, ‘‘রচনা তুমি ওকে ছোট ভাইয়ের মতো ভালবেসে কাজ করবে।’’
এত ক্ষণে প্রথম মুখ খোলেন ‘দিদি নম্বর ওয়ান।’ তাঁর কথায়, ‘ভাই নয়, দাদা।’ সঙ্গে কল্যাণ বলেন, ‘‘ওই তো দাদা-বোন। (অসিতের দিকে তাকিয়ে) তোরা তো আগে একসঙ্গে ঘুগনি খেতিস। সেই পরিস্থিতি আবার তৈরি কর। ফর গড’স সেক। আর কেউ তপনের নামে রচনার কাছে, রচনার নামে তপনের কাছে ফুস-ফুস করবে না।’’ পর ক্ষণেই হাসতে হাসতে কল্যাণের সংযোজন, ‘‘ছ’মাস কাজ করো। তার পর দুটো লাঠি দিয়ে দেব দু’জনকে। অবশ্য আর দরকার হবে না।’’
রচনার ভূয়সী প্রশংসা করে কল্যাণ জানান, তাঁর সঙ্গে হুগলির সাংসদের মিল অনেক। তাঁরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। রাজনীতিতে আলাদা করে কিছু পেতে আসেননি। দিতে এসেছেন। কল্যাণের কথায়, ‘‘আমরা একটু ভালবাসা আর সম্মান আশা করি। মানুষের মুখে হাসি দেখতে চাই। তার চেয়ে ভাল কিছু হয় না।’’
আরও পড়ুন:
সাংসদ এবং বিধায়কের মনোমালিন্য যে মিটল, তা দেখানোর জন্য দু’জনের হাত মিলিয়ে দেন হুগলির সাংসদ। বৈঠক থেকে বেরিয়ে রচনা বলেন, ‘‘কল্যাণদা আমাদের অভিভাবক। উনি যেমনটা বলেছেন, সেটাই হবে। কিন্তু দলের যাঁরা কর্মী, তাঁদের সম্মান দিতে হবে। দলের কর্মসূচি হলে সেই কর্মসূচিতে তাঁদের ডাকতে হবে। অসিতদার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত ঝামেলা নেই। উনি আমার থেকে রাজনীতিতে অনেক বেশি অভিজ্ঞ। আমরা একসঙ্গে কাজ করব।’’
আর অসিত জানান, সব কিছু মিটমাট হয়ে গিয়েছে। রচনাকে আবার ‘বোনের মতো’ বলে চুঁচুড়ার বিধায়কের সংযোজন, ‘‘ওর ছবি নিয়ে আমার নাতনি বাড়িতে খেলা করে। এতটাই প্রিয়। আগামিকাল থেকে চুঁচুড়ায় অন্য ছবি দেখবেন।’’