দমদম সেভেন ট্যাঙ্কসের দীপেন ঘোষ সরণি। নাগেরবাজারের প্রাইভেট রোড। দু’জায়গায় দু’টি এটিএমের মধ্যে দূরত্ব দু’কিলোমিটার। নিরাপত্তারক্ষী ছিল না কোনওটিতেই। তারই সুযোগে এটিএমের শাটার নামিয়ে গ্যাস কাটার দিয়ে এটিএম মেশিন কেটে দু’জায়গা থেকে প্রায় ৩৭ লক্ষ টাকা লুঠ করে পালাল দুষ্কৃতীরা। মঙ্গলবার, ঝড়বৃষ্টির রাতে এই ঘটনা প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে পুলিশি নজরদারিকেই।
গ্যাস কাটার দিয়ে এটিএম মেশিন কেটে টাকা লুঠের ঘটনা এর আগে কলকাতায় ঘটেনি বলে মনে করছে পুলিশেরই একাংশ। সেই সঙ্গেই প্রশ্ন উঠছে, গ্যাস কাটারের মতো ভারী যন্ত্র বয়ে বেড়িয়ে দু’কিলোমিটার দূরত্বে দু’টি এটিএমেই বেশ কিছুক্ষণ ধরে যন্ত্র কাটা হল। অথচ কেউ তা টের পেলেন না কেন? ঝড়বৃষ্টিতে আশপাশের মানুষ যদি বা টের না পেয়ে থাকেন, টহলদার পুলিশেরও তা চোখে পড়ল না কেন?
সেভেন ট্যাঙ্কসের এটিএমটি একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের। নাগেরবাজারে বেসরকারি ব্যাঙ্কের এটিএম। পুলিশ জানায়, তার মধ্যে সেভেন ট্যাঙ্কসের এটিএম থেকে প্রায় ৩৩ লক্ষ ও নাগেরবাজারের এটিএম থেকে প্রায় ৩ লক্ষ ৭৬ হাজার টাকা লুঠ হয়েছে।
লুঠের কথা জানাজানি হল কী ভাবে?
দমদমের সেভেন ট্যাঙ্কসের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কটির এটিএমের কাছেই রয়েছে আর একটি বেসরকারি ব্যাঙ্কের এটিএম। সেই বেসরকারি ব্যাঙ্কের এটিএম-এ বুধবার সকালে টাকা ভরতে গাড়ি আসে। তখন ওই এটিএমের নিরাপত্তারক্ষী টাকা ভরার কর্মীদের জানান, পাশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের এটিএমের দরজার শাটারটি সকাল থেকেই নামানো রয়েছে। শাটার বন্ধ দেখে টাকা ভরার কর্মীরাও অবাক হয়ে যান। পুলিশ জানায়, ওই টাকা ভরার কর্মীরাই মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের এটিএমটিতে টাকা ভরিয়ে গিয়েছিলেন। সে ক্ষেত্রে বুধবার সকালেই ওই এটিএমের শাটার বন্ধ থাকার কথা নয়। সন্দেহ হওয়ায় টাকা ভরার কর্মীরা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের এটিএমের শাটারটি খুলে দেখেন, পুরো এটিএম মেশিন তছনছ অবস্থায় রয়েছে। সিসিটিভি-র সংযোগও কাটা। এটিএমের ভিতরে পড়ে রয়েছে পাঁচশো টাকার একটি নোট।
এর পরেই টাকা ভরার সংস্থার তরফে সিঁথি থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়। সিঁথি থানার পুলিশ ও লালবাজার থেকে গোয়েন্দারা এসে তদন্ত শুরু করেন। এক তদন্তকারী জানান, দুষ্কৃতীরা এটিএমে ঢুকেই সিসিটিভি-র সংযোগ কেটে দিয়েছে। দুষ্কৃতীদের চিহ্নিত করতে বেশ কিছু নমুনা ফরেন্সিকে পাঠানো হচ্ছে। গোয়েন্দা প্রধান দেবাশিস বড়াল বলেন, ‘‘রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের এটিএম থেকে সর্বশেষ মঙ্গলবার রাত ১০-২৬ মিনিট নাগাদ টাকা তোলা হয়েছে। রাত সাড়ে দশটা থেকে ভোর চারটের মধ্যে ঘটনাটি ঘটেছে।’’ গোয়েন্দা প্রধান জানান, সোমবার হাওড়ার ডোমজুড়ে একই কায়দায় এটিএম থেকে টাকা লুঠ হয়েছে। সম্প্রতি বর্ধমানেও এটিএম ভেঙে টাকা লুঠ হয়েছে। খুব সম্ভবত একই দল মঙ্গলবার রাতে দমদমে এটিএম থেকে টাকা লুঠ করেছে। পুরো ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে।
এটিএম ভেঙে ডাকাতির ঘটনায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। স্থানীয় বাসিন্দা অরিজিৎ ঘোষ বলেন, ‘‘ এখানে এই ধরনের ঘটনা এই প্রথম। আজ এটিএমে ডাকাতি হল, দু’দিন পর আমাদের বাড়িতে ডাকাতরা আসবে না, এটা কে বলতে পারে?’’ আর এক বাসিন্দা সুমন বসুর কথায়, ‘‘এটিএমটি বছর আটেক আগে বসানো হয়েছে। তিরিশ বছর এখানে আছি। ডাকাতির ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি। খুব আতঙ্কে রয়েছি।’’
দমদম সেভেন ট্যাঙ্কসের মতো নাগেরবাজারের বেসরকারি ব্যাঙ্কের এটিএমেও কোনও নিরাপত্তা নেই। আট মাস আগেই নতুন ব্যাঙ্ক ও লাগোয়া এটিএমটি চালু হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা মহুয়া রায়চৌধুরীর কথায়, ‘‘দশ বছর এখানে শান্তিতেই রয়েছি। চুরি-ডাকাতি কী জিনিস জানি না। বাড়ির পাশেই ব্যাঙ্কে যে ভাবে ডাকাতি হল তাতে আতঙ্ক হচ্ছে। কাল কী হবে, জানি না।’’ একই সঙ্গে এটিএমে নিরাপত্তারক্ষী না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দুই এলাকার বাসিন্দারাই। দমদম সেভেন ট্যাঙ্কস এলাকার শোভন জোয়ারদারের কথায়, ‘‘পাশেই একটি বেসরকারি এটিএমে চব্বিশ ঘণ্টা নিরাপত্তারক্ষী রয়েছেন। অথচ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের এটিএমে কখনই নিরাপত্তারক্ষী থাকে না। নিরাপত্তারক্ষী থাকলে এমন ঘটনা এড়ানো যেত।’’ একই ক্ষোভ প্রাইভেট রোড এলাকার বাসিন্দাদের। এর পিছনে অবশ্য নিরাপত্তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষগুলির ঢিলেঢালা মনোভাবকেই দায়ী করছেন লালবাজারের কর্তারা। তাঁদের যুক্তি, এটিএমের বিমা থাকার ফলে চুরি যাওয়া টাকা পুরোটাই ফেরত পান সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ। সেহেতু নিরাপত্তার দিকে ঢিলেমি দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে তাদের।