ভয়ের অনুভূতিটা বরাবরই কম কাজ করে আমার। দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত রোগীকে দেখেও ঘাবড়ে যাইনি কোনও দিন। নিজের পেশাকে ভালবাসি, গর্ব করি। তাই ৫৮ বছর বয়সে নিজেই প্রস্তাব দিয়ে করোনার চিকিৎসায় যুক্ত হতে আইডি হাসপাতালে নার্সিংয়ের ডিউটি নিয়েছি। গত বছর লকডাউনের শুরুতে তখন বি সি রায় হাসপাতালের নার্সিং স্টাফ। এক দিন নার্সিং সুপারিন্টেন্ডেন্টকে বললাম, কোভিড রোগীদের নার্সিং করতে চাই। সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্য ভবনের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমার বদলি হয়ে গেল।
মে মাস। শুরু হতে চলেছিল আইডি হাসপাতালের সিসিইউ। ৩৩ শয্যার সেই ইউনিটের সিস্টার ইন-চার্জ হিসেবে দায়িত্ব পেলাম। ওই দায়িত্বে নিযুক্ত চার জনের এক জন আমি। ওয়ার্ডের কোথায়, কোন যন্ত্র বসবে, কী ভাবে গোটা ব্যবস্থা থাকবে, সেই পরিকল্পনায় গোড়া থেকেই যুক্ত আছি। ২০ মে, আমপানের দিন থেকেই রোগী ভর্তি শুরু হয়েছিল। অজানা-অচেনা রোগ নিয়ে সকলেই তখন সন্ত্রস্ত। রোগী হেঁটে ওয়ার্ডে ঢুকছেন। তাঁর পিছন পিছন চলছে জীবাণুনাশের কাজ। হেঁটে আসা রোগীও ঘণ্টাখানেক বা দিন কয়েকের মধ্যে মারা যাচ্ছিলেন। এত বছরের কর্মজীবনে সেই প্রথম বার ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।
এখন অবশ্য অনেকটাই সহজ হয়েছে পরিস্থিতি। রোগীরা আসেন। সুস্থ হয়ে ফিরে যান অনেকে। কিন্তু না ফেরার সংখ্যাটাও রয়েছে। হারিয়ে যাওয়া, অচেনা সেই মানুষগুলোর জন্য খুব কষ্ট হয়। ওঁদের মধ্যে কেউ কেউ স্মৃতিতে থেকে যান। বছর বিয়াল্লিশের এক যুবকের কথা খুব মনে পড়ে। অনেক শারীরিক কষ্ট ছিল তাঁর। কিন্তু বাঁচার ইচ্ছে ছিল প্রবল। এতটাই যে, অন্য কষ্ট সহ্য করেও ডাক্তার, নার্সদের নির্দেশ শুনতেন অক্ষরে অক্ষরে। বাইপ্যাপ মাস্ক ছাড়া একটুও থাকতে পারতেন না। অথচ, ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেটা পড়ে চোয়ালে ব্যথা হয়ে যেত, দাগ হয়ে যেত। তবু এক বারও বলতেন না, ‘আর পারছি না’। যখন যে ভঙ্গিতে শুতে বলা হত, সে ভাবেই থাকতেন। দেড় মাস লড়াই চালিয়ে যে দিন থেমে গেলেন, আমরা কেউ চোখের জল আটকে রাখতে পারিনি। টানা ভেন্টিলেশনে থেকে সুস্থ হয়ে ঘরে ফেরার কাহিনিও রয়েছে অসংখ্য।
দীর্ঘ দিন ধরে আমাদের এই লড়াই বা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পিছনে রয়েছে ‘টিম ওয়ার্ক’। সিসিইউ-র ২৫ জন নার্সিং স্টাফের অক্লান্ত পরিশ্রম ছাড়া কোনও ভাবেই সেটা সম্ভব হত না। কারও ক্লান্তি নামলে অন্য জন দায়িত্ব নেন। আমিত্ব নয়, দলগত প্রচেষ্টার জোরেই কঠিন সময় সহজে কেটে যাচ্ছে। পর পর সংক্রমিত হয়েও আমাদের মেয়েরা পিছিয়ে যাননি। সুস্থ হয়েই ফের কাজে এসেছেন। অথচ, কারও ঘরে রয়েছেন অসুস্থ বাবা-মা, কারও ছোট সন্তান। সব দুশ্চিন্তা ঘরে রেখে হেসে কাজ করেন ওঁরা।
আমি বরং তুলনায় অনেকটা ঝাড়া হাত-পা। গড়িয়ার গোষ্ঠতলার বাড়িতে স্বামী-স্ত্রী থাকি। ছেলে কর্মসূত্রে পরিবার নিয়ে মুম্বইয়ে থাকে। মেয়ে গুরুগ্রামে গবেষণারত। এই দায়িত্ব নেওয়ার আগে তাই এক বারও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব আসেনি। ভোর চারটেয় উঠে রেডিয়োয় কলকাতা ক চালিয়ে রান্না সেরে তবেই হাসপাতালে যাই।
গাছপালা আর বই-ই হয়তো আমার শক্তির উৎস। ছাদ ও বাড়ি সংলগ্ন জায়গায় বিভিন্ন রকম ফুল, আনাজ আর বাহারি গাছের দেখভাল আমিই করি। অবসরের আর এক সঙ্গী বই। শরৎচন্দ্র ছাড়াও নারায়ণ সান্যাল আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রিয় লেখক। ‘প্রথম আলো’ পড়ছি এখন।
একটা কথা অন্তর থেকে বিশ্বাস করি। সততা, নিষ্ঠা, সাহস আর ভালবাসা দিয়ে সব জয় করা যায়। তাই এগুলো সঙ্গে নিয়ে যাঁরা সংগ্রাম করছেন, তাঁদের লড়াই কখনও ব্যর্থ হতে পারে না। এক দিন আলো ফিরে আসবেই।