বিজেপির বহুদিনের নীতি ‘পূবে তাকাও’। পূর্ব এবং উত্তর-পূর্ব ভারতে দলের বিস্তার ঘটাতে এই নীতি গ্রহণ করেছিল পদ্মশিবির। বাকি ছিল পশ্চিমবঙ্গ। রাজ্যে প্রথম বার বিপুল জয়ের পরে আক্ষরিক অর্থেই পুবে তাকাচ্ছে বিজেপি। রাজ্যের সচিবালয় গঙ্গার পশ্চিমপারের নীলবাড়ি নবান্ন থেকে পুবপারের বড় লালবাড়ি মহাকরণে স্থানান্তরিত করতে চলেছে তারা। রাজ্যের দখল বিজেপি নেওয়ার পরেই রাজনৈতিক মহলে জল্পনা, অতঃপর রাজধানীর কী হবে? কী হবে ছোট লালবাড়ি কলকাতা পুরসভার?
সঠিক সময়ে সব হলে আগামী ডিসেম্বর নাগাদ কলকাতা পুরসভার নির্বাচন হওয়ার কথা। নিজেদের ‘দুর্গে’ পরিণত করা কলকাতাতেই বিধানসভা নির্বাচনে নাস্তানাবুদ হয়েছে তৃণমূল। কলকাতা পুরসভার বিস্তৃতি তিনটি লোকসভা কেন্দ্রের ১৬টি বিধানসভা আসনে। তার মধ্যে ১১টিতে জিতেছে বিজেপি। ওয়ার্ডওয়াড়ি হিসাব বলছে, কলকাতা পুরসভার ১৪৪টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১০১টিতে এগিয়ে রয়েছে পদ্মশিবির। তৃণমূল মাত্র ৪৩টিতে। ভোটের ফল ঘোষণার ৭২ ঘণ্টা কাটার আগেই যে ভাবে তৃণমূলের নানা স্তর থেকে ক্ষোভ, বিক্ষোভ এবং রাজনৈতিক ভাবে ‘আত্মসমর্পণ’ করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তাতে দলের অনেকেই একান্ত আলোচনায় মানছেন, রাজধানীর ছোট লালবাড়িতে পদ্মফুল ফোটাও সময়ের অপেক্ষা।
আরও পড়ুন:
শনিবার ২৫শে বৈশাখ রবীন্দ্রজয়ন্তীর দিন ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে নতুন সরকারের শপথ। নতুন শাসকদলের তরফে এখনও আনুষ্ঠানিক ভাবে কলকাতা পুরসভা বা লাগোয়া রাজ্যের পুরনিগমগুলির ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু বলা হয়নি। তবে তৃণমূলের আশঙ্কা, কলকাতা পুরসভা-সহ রাজ্যের পুরনিগম এবং শতাধিক পুরসভার ভোট নির্ধারিত সময়ের আগেই হয়ে যেতে পারে। ভোট যখনই হোক, কী হবে? প্রকাশ্যে না-বললেও তৃণমূলের প্রথম সারির নেতারা একান্ত আলোচনায় মেনে নিচ্ছেন, কলকাতা পুরসভা তাঁদের পক্ষে ধরে রাখা কঠিন হবে।
প্রসঙ্গত, বাম জমানাতেই দু’বার কলকাতা পুরসভায় জিতেছিল তৃণমূল। প্রথম বার ২০০০ সালে। তার পরে আবার ২০১০ সালে। ২০১১ সালে ‘পরিবর্তন’-এর পর থেকে কলকাতা তৃণমূলেরই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে বিরোধীদের অভিযোগ ছিল, কলকাতা-সহ শহরাঞ্চলে পুরসভায় দিনের পর দিন ভোটই হয় না। কারণ, তৃণমূল নিজের মতো করে ভোট করাত। যার নেপথ্যে থাকত পুলিশের ‘সক্রিয়তা’। ক্ষমতা হারানোর পরে সেই সুযোগ তৃণমূলের সামনে নেই। ফলে সদ্যপ্রাক্তন শাসকদল মনে করছে কসবা, তিলজলা, তপসিয়া, খিদিরপুর, মোমিনপুর, বালিগঞ্জ, রাজাবাজারের মতো সংখ্যালঘু অধ্যুষিত কিছু ওয়ার্ড ছাড়া তৃণমূল আর কোথাওই সে ভাবে মাথা তুলতে পারবে না। কলকাতা পুরসভার এক বরো চেয়ারম্যানের কথায়, ‘‘বেশ কিছু জায়গায় কাউন্সিলারেরা প্রতিনিয়ত কাজ করেছেন। কিন্তু তা দিয়ে এ বারের ভোট হবে না। দলের বিরুদ্ধে যে গণক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব প্রকট।’’ কলকাতা পুরসভার ৯৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তথা তৃণমূলের মুখপাত্র অরূপ চক্রবর্তী অবশ্য বলছেন, ‘‘বিজেপি জেতার পর থেকে যে কার্যকলাপ শুরু করেছে, তাতে এখন আমাদের কর্মীদের, দলের কার্যালয় রক্ষা করাই মূল কাজ। পুরসভা ভোটের কথা এখনও ভাবার সময় আসেনি।’’
তৃণমূলের প্রবীণ নেতাদের অনেকে আবার রাজ্যের ক্ষমতা থেকে সরার পরে ভিন্ন একটি ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। তাঁদের বক্তব্য, বিধানসভা ভোটে যে ফলাফল হয়েছে, তাতে মানুষের যা না ক্ষোভ ছিল মমতার সরকারের উপর, তার চেয়েও বেশি ক্ষোভ ছিল স্থানীয় স্তরের জনপ্রতিনিধিদের উপর। যাঁদের সম্পত্তি বেড়েছে চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়ার মতো। স্থানীয় স্তরের দুর্বৃত্তায়নও হয়েছে তাঁদের নেতৃত্বেই।
তৃণমূল জমানার গোড়া থেকেই সিন্ডিকেটরাজের অভিযোগ ছিল। সন্দেহ নেই যে, কলকাতা-সহ শহরাঞ্চলের জনপ্রতিনিধিরা ছিলেন তৃণমূলের টাকা সরবরাহের অন্যতম কারিগর। ফলে ভান্ডার রক্ষার স্বার্থে দলও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে চোখ বুজেই ছিল। না হলে গত ১৫ বছরে পূর্ব কলকাতা-সহ বিভিন্ন এলাকায় যে কায়দায় জলাজমি ভরাট করে বহুতল উঠেছে, তাতে বেপরোয়া মনোভাব স্পষ্ট ছিল। বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ উঠলেও তাতে আমল দেওয়া হয়নি। শুধু কলকাতা নয়, তৃণমূল ‘সন্দিহান’ বাকি পুরসভা বা পুরনিগমগুলির ভবিষ্যৎ নিয়েও। বিধাননগর পুরনিগম যে তিনটি বিধানসভা এলাকায় বিস্তৃত, তার তিনটিতেই হেরেছে তৃণমূল। হাওড়ার ক্ষেত্রেও মধ্য হাওড়া এবং দক্ষিণ হাওড়া বাদ দিয়ে বালি থেকে শিবপুর পর্যন্ত জোড়াফুলের ‘দুর্গ’ দখল করে ফেলেছে বিজেপি। একই ধারা অব্যাহত চন্দননগর, আসানসোল, দুর্গাপুর এবং শিলিগুড়ি পুরনিগম এলাকায়।
এই সমস্ত পুরসভাই পর্যায়ক্রমে হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে বলে শঙ্কা তৈরি হয়েছে গত ১৫ বছর রাজ্যের ক্ষমতায় আসীন শাসকদলের অন্দরে। কলকাতা পুরসভার এক কাউন্সিলরের কথায়, ‘‘ক্ষমতাবদলের পর যে ভাবে বিজেপির লোকজন এসে ভাঙচুর করছে আর হুমকি দিচ্ছে, তাতে বাড়ি ছেড়েই বেরোতে পারছি না। দলের কর্মীদের পাশে গিয়ে যে দাঁড়াব, তারও উপায় নেই। যে কর্মীদের আমি সুরক্ষা দিতে পারছি না বা যাঁদের পাশে গিয়ে এই কঠিন সময়ে দাঁড়াতে পারছি না, তাঁরা কি আর আমার হয়ে কাজ করতে চাইবেন? পুরসভার ভোটে জেতা তো পরে, আগামী কয়েক মাস ঠিকঠাক কাজ করতে পারব কি না, তা নিয়েই সংশয়ে আছি।’’