Advertisement
E-Paper

আস্ত বাড়িগুলো সব ফ্ল্যাট হয়ে গেল

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে পঞ্চাশের দশকের শুরুতে মাঙ্গিরাম বাঙুর ইংরেজদের ছেড়ে যাওয়া ডিফেন্স কারখানার জমি কিনে নিয়ে বেচতে শুরু করেন। ঢাকুরিয়া লেকের দক্ষিণে বজবজ রেল লাইনের ও পারে দেশভাগের পরে গড়ে ওঠা শহরতলি এটি।

উৎপলকুমার চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ২৮ মে ২০১৬ ০১:৩২

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে পঞ্চাশের দশকের শুরুতে মাঙ্গিরাম বাঙুর ইংরেজদের ছেড়ে যাওয়া ডিফেন্স কারখানার জমি কিনে নিয়ে বেচতে শুরু করেন। ঢাকুরিয়া লেকের দক্ষিণে বজবজ রেল লাইনের ও পারে দেশভাগের পরে গড়ে ওঠা শহরতলি এটি। তখনও সে ভাবে প্রোমোটারদের উদ্ভব হয়নি। শুধুমাত্র ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে লেনদেন হত। তাই জমির দাম ছিল

মধ্যবিত্তের আয়ত্তের মধ্যে। শুরুর দিকে পুরো এলাকারই নাম ছিল প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোড। পরবর্তীকালে এখানকার কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির আন্তরিক প্রচেষ্টায় এলাকাটির নাম হয় ‘লেক গার্ডেন্স’। সেটিই পরে ত্রিভুজাকার বাঙুর পার্কে পর্যবসিত হয়।

এক সময়ে বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক ও ডাক্তার পাড়া বলেও এই এলাকা পরিচিত ছিল। প্রথিতযশা অধ্যাপক জনার্দন চক্রবর্তী, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দীনেশচন্দ্র সরকার, গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, ভবতোষ চট্টোপাধ্যায়, মৈথিলী পণ্ডিত পিএন সিংহ প্রমুখের বাস ছিল এখানে। সাহিত্যিক প্রমথনাথ বিশী ও নবেন্দু ঘোষেরও বাড়ি ছিল এ পাড়াতেই। ডাক্তারদের মধ্যে ছিলেন মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ অমরকুমার দত্তগুপ্ত, আরজিকর-এর ইএনটি-র অধ্যাপক মেজর নরেন দত্ত, চিত্তরঞ্জন ক্যানসার হাসপাতালের অধিকর্তা অমিয়কুমার সেন, অস্থিবিদ্যার অধ্যাপক কালীসহায় বসু। পরিতাপের বিষয়, এদের প্রয়াণের পর অনেকেরই বাড়ি প্রোমোটারের করায়ত্ত হয়ে আপাতত ফ্ল্যাটে পর্যবসিত হয়েছে।

পঞ্চাশের দশকের শুরু থেকে বাংলা গানের সুর-মূর্ছণায় শ্রোতাদের যিনি মাতিয়ে রেখেছেন সেই সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়েরও বাড়িও এ পাড়াতেই। তাঁর স্বামী প্রখ্যাত লিপিকার শ্যামল গুপ্ত প্রয়াত হয়েছেন কয়েক বছর আগেই। বাংলা চলচ্চিত্র জগতের প্রতিভাবান অভিনেতা

কালী বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম দিকে এখানে থাকলেও পরে লেক মার্কেটের উল্টো দিকে পৈতৃক গৃহে চলে যান। নায়িকা সুমিতা সান্যাল দীর্ঘ দিন রয়েছেন এ অঞ্চলে। সম্প্রতি ফ্ল্যাট কিনে এসেছেন মৃণাল মুখোপাধ্যায়। ‘পথের পাঁচালী’র সর্বজয়া করুণা বন্দ্যোপাধ্যায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এ পাড়ায়। পরিচালক সুশীল মজুমদার ও কণক মুখোপাধ্যায়ও ওই এলাকার বাসিন্দা ছিলেন।

পাঁচ দশক আগে উত্তর কলকাতার ভাড়া বাড়ি ছেড়ে বাবা-মার হাত ধরে এখানে নিজেদের বাড়িতে উঠে আসি। উত্তরের সেই প্রাণোচ্ছল, বৈচিত্রে ভরা জীবন এখানে খুঁজে না পেয়ে কিছুটা মনমরা হতে হয়েছিল। তবে কাছেই লেক ও রবীন্দ্র সরোবর স্টেডিয়াম কিছুটা হাতছানি দিত। তখনকার ধুলো উড়ানো সুরকির রাস্তায় ট্যাক্সি আসতে রাজি হত না। তাই ট্যাক্সির সন্ধানে অনেক সময় লেক মার্কেট বা দেশপ্রিয় পার্ক পর্যন্ত যেতে হত। মিনিবাস রাস্তায় নামেনি তখনও। লেক গার্ডেন্স রেলওয়ে স্টেশনও চালু হয়নি। স্কুল কলেজে পড়ার সময় স্টেডিয়াম পর্যন্ত হেঁটে গিয়ে ন’নম্বর বা দেশপ্রিয় পার্কে গিয়ে টু/টুবি ধরা ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। হাওড়া স্টেশনের জন্য ছিল পাঁচ নম্বর বাস। এগুলির কোনওটিই আজ আর চালু নেই। মানুষে টানা রিকশা অবশ্য ছ’আনা-আট আনায় দেশপ্রিয় পার্কে নিয়ে যেত। বাড়িতে জলের উৎস ছিল টিউবঅয়েল বা কুয়ো। কিন্তু মার্চ মাস থেকে ভরা বর্ষা না আসা পর্যন্ত পাম্প চালিয়ে জল উঠত না। রাস্তায় লাগানো বাল্‌বগুলিতে টিমটিম করে আলো জ্বলত। কাঁচা ড্রেন থেকে মাঝে মাঝে পাঁক তোলা হলেও অল্প বৃষ্টিতেই জল জমে যেত। এলাকাটি এতটাই পশ্চাদপদ ছিল যে ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্কের সাহায্য দেওয়ার ব্যাপারে সরেজমিন দেখতে রবার্ট ম্যাকনামারা নিজেই এসে হাজির হয়েছিলেন। তবে পুরসভার ট্যাক্সও ছিল খুবই কম।

কিন্তু বাড়িতে বাড়িতে তখন গভীর সংযোগ ছিল। এক বাড়ির সরস্বতী পুজোর অঞ্জলিতে বা বিয়ে-পৈতের অনুষ্ঠানে অন্যেরা এসে যোগ দিতেন। পরিবেশনের কাজে হাত বাড়াতেন। আমার উপণয়নে মা-পিসিমার পরে প্রতিবেশিনী কাকিমা এসেও ব্রতভিক্ষা দান করেছিলেন। তখন বিয়েতে বাড়ি ভাড়া নেওয়ার খুব একটা রেওয়াজ ছিল না। লাগোয়া বাড়িতে ঘর ছেড়ে দিতেও কেউ দোনামনা করতেন না। তখন শববাহী গাড়ির উদ্ভব হয়নি। এক বার পাড়ার আশি ছুঁই ছুঁই এক প্রৌঢ়ার মৃত্যুতে তাঁর একমাত্র পুত্র অথৈ জলে পড়েন। তখন পাড়ার জনা দশেক তরতাজা তরুণ আমরা এগিয়ে এসে তাঁকে কাঁধে করে মহাশ্মশান অবধি নিয়ে গিয়েছিলাম।

দুর্গাপুজোয় বাঙ্গুর পার্কে সর্বজনীন পুজোমণ্ডপে বক্তৃতা হত। সেখানে দেখেছি ব্যায়ামবীর বিষ্ণুচরণ ঘোষের দেহসৌষ্ঠব প্রদর্শন। গান গেয়ে গিয়েছেন পূর্ণচন্দ্র বাউল, অখিলবন্ধু ঘোষ, অশোকতরু বন্দ্যোপাধ্যায়, নির্মলা মিশ্র, সবিতাব্রত দত্তেরা। বিসর্জনের পরে দুই তিন দিন এলাকার যুবকেরা নাটক মঞ্চস্থ করতেন। এখন ‘নিষ্প্রাণ’ থিম পুজোর নামে তা ব্যবসায় রূপান্তরিত হয়েছে। এই পার্কেই বাহাত্তর ঘণ্টা অবিরাম সাইকেল চালানোর প্রতিযোগিতা শেষে পাঁচশো, সাতশো টাকার পুরস্কার পেয়ে কোনও দুঃস্থ যুবক সৎপথে আর্থিক সমস্যার কিছুটা সুরাহা করতেন।

তবে এখন রাস্তা না বা়ড়লেও কয়েক গাড়ির সংখ্যা শত গুণ বৃদ্ধি হওয়ায় হাঁটাচলাই বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। অবিরাম হর্নের শব্দে মানসিক শান্তিও বিঘ্নিত। সবচেয়ে দুঃখের কথা আস্ত সুন্দর বাড়িগুলি ধূলিসাৎ

হয়ে জি-প্লাস ফোর, জি-প্লাস ফাইভ ফ্ল্যাটবাড়ির জন্ম হচ্ছে। সৃষ্টি হচ্ছে জলসঙ্কট। ভবিষ্যতে জলের যোগান হবে কী ভাবে কেউ ভেবে দেখছে কী? বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই সব ফ্ল্যাটের অধিবাসীদের সঙ্গে পুরোনো এলাকাবাসীদের কোনও যোগাযোগ নেই।

সকলের তরে সকলে থাকা, বাঙালিয়ানার বৈশিষ্ট্যে ভরা এই পাড়াটাও কি অতীতের গর্বে বিলীন হতে চলেছে?

লেখক প্রাক্তন সরকারি কর্মী

city story
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy