‘নাম-মাহাত্ম্য’ যে অতি বিষম বস্তু, তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে স্বাস্থ্য দফতর। তাই ভোটের আগের জটিল আবহেও কার্যত নিয়ম ভেঙে একটি প্রতিবন্ধকতা নির্ণায়ক শিবিরে তারা যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছে বলে অভিযোগ।
যে নামটি খবরের কেন্দ্রে, কলকাতার ভবানীপুরের সেই ক্লাবের ‘নাম’ প্রণিধানযোগ্য— ‘ভবানীপুর অভিষেক।’ সপ্তাহখানেক আগে এ হেন ক্লাব স্বাস্থ্য দফতরকে জানায়, ১৪ মার্চ, শনিবার প্রতিবন্ধীদের প্রতিবন্ধকতা নির্ণায়ক ও শংসাপত্র প্রদানের শিবির করতে হবে ভবানীপুরের ডিএন মিত্র স্কোয়ারে (গাঁজা পার্কে)। শিবির পরিচালনা করতে তারা নিজেরা ডাক্তার আনবে না। নিকটস্থ এসএসকেএম হাসপাতালের চিকিৎসকেরাও যাবেন না। সেটা করতে হবে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসকদের। এর কারণ অবশ্য ক্লাবকর্তারা ব্যাখ্যা করেননি।
একে জায়গাটা ভবানীপুর। তার উপরে ক্লাবের এমন ‘বিশেষ’ নাম এবং ক্লাবের মূল উপদেষ্টা, তৃণমূলের অন্যতম নেতা সুব্রত বক্সী। উপদেষ্টাকমিটির সদস্য, পুরপ্রতিনিধি সন্দীপরঞ্জন বক্সী। দ্বিরুক্তি না করে সম্মতি দেন স্বাস্থ্যকর্তারা। আর সংশ্লিষ্ট ‘ভবানীপুর অভিষেক’ও নিজেদের ফেসবুকের পাতায় জ্বলজ্বলে বিজ্ঞাপন টাঙিয়েছে, ‘ডিজ়এবিলিটি ডিটেকশন অ্যান্ড সার্টিফিকেশন ক্যাম্প’। আয়োজক— কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, সহযোগী ‘ভবানীপুর অভিষেক’। অর্থাৎ, রাতারাতি বেসরকারি শিবির পরিণত হয়েছে ‘সরকারি’ শিবিরে! বেসরকারি ক্লাবের শিবিরের ‘আয়োজক’ হতে হয়েছে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজকে! তাতেই কার্যত বিদ্রোহ দেখা দিয়েছে ওই মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসক মহলে।
ক্ষোভের অনেক কারণ আছে। প্রথমত, এটা রক্তদান শিবির নয়। যে কোনও বেসরকারি সংস্থার ডাকে সরকারি হাসপাতাল মাঠেঘাটে প্রতিবন্ধকতা পরীক্ষা করে না। তা ছাড়া, নিয়মানুযায়ী সরকারি হাসপাতাল নিজেদেরক্যাম্পাসের চার দিকে নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যেই এমন শিবির করতে পারে। কলকাতার প্রতিটি মেডিক্যাল কলেজের ক্ষেত্রে ওয়ার্ড ভাগ করা রয়েছে। সে দিক থেকে ভবানীপুরের যাবতীয় ওয়ার্ড এসএসকেএমের আওতায়। তা হলে সেই এলাকার মানুষকে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসকেরা কী করে প্রতিবন্ধী শংসাপত্র দেবেন?
শিবিরে প্রাথমিক স্ক্রিনিংয়ের পরে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের মেডিক্যাল বোর্ডে আবেদনকারীদের ডেকেপরীক্ষা করা হয়। এ ক্ষেত্রে ভবানীপুরের শিবিরে যাঁরা আসবেন, ধরে নেওয়া যায়, তাঁরা আশপাশের বাসিন্দা।তাঁদের কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে যেতে হবে। অথচ, তাঁদের বাড়ির ঠিকানা ভবানীপুর, হাজরা, কালীঘাট এলাকায় হলে নিয়মানুযায়ী সংশ্লিষ্ট এলাকার হাসপাতালের মেডিক্যাল বোর্ড, অর্থাৎ এসএসকেএমেই তাঁদের ফের রেফার করার কথা।
বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলতে স্বাস্থ্যসচিব থেকে স্বাস্থ্য-অধিকর্তা, সকলেই ফোন ও মেসেজ এড়িয়েছেন। কথা বলতে চাননি কলকাতা মেডিক্যালের এমএসভিপি অঞ্জন অধিকারী। আর তৃণমূল নেতা সুব্রত বক্সী বললেন, ‘‘১৪ তারিখ শিবিরে থাকব। দেখবেন কী হচ্ছে।’’
কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের চোখ বা নাক-কান-গলা বিভাগের চিকিৎসকদের মতো অনেকেই পড়েছেন মুশকিলে। এত বড় বড় যন্ত্র নিয়ে তাঁরা ভবানীপুরে যাবেন কী করে? এর মধ্যে কিছু যন্ত্র আবার পিপিপি মডেলে চলে। ফলে, তাঁরাসেগুলি নিতে পারবেন না। তা হলে সেই সব যন্ত্র অন্য জায়গা থেকে আনার ব্যবস্থা কি‘ভবানীপুর অভিষেক’ করবে? যদি করেও, সেই যন্ত্র ঠিক আছে কিনা, তার শংসাপত্র কে দেবে? রোগীকেপরীক্ষা করলে যে ফলাফল বেরোবে, তার দায় সরকারি ডাক্তার নেবেন কী ভাবে?
ক্লাবের কর্ণধার পার্থসারথি নাথের দাবি, ‘‘আমাদের ধারণা ছিল, শুধু মেডিক্যাল কলেজই এ রকম শংসাপত্র দিতে পারে।’’ তাঁর আরও বক্তব্য, ‘‘স্বাস্থ্য দফতর জানিয়েছে, শিবিরে স্ক্রিনিংয়ের পরে যাঁরা প্রতিবন্ধী শংসাপত্রের জন্য বিবেচিত হবেন, তাঁরা কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পরীক্ষার জন্য গেলে লাইনও দিতে হবে না।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)