এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে প্রাচীন মন্দির, রাস্তার ধারে বহুকালের নীরব নহবতখানা। পাশেই আদিগঙ্গা। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতেই পায়ে পায়ে ফুটবল গড়াতে গড়াতে কচিকাঁচাদের মাঠে ছোটা। সন্ধ্যা নামতেই চায়ের দোকানে কিংবা মাঠে নবীনে-প্রবীণে দেদার আড্ডা ধরে রেখেছে আমাদের মধ্যবিত্ত পাড়ার ছবিটা।
টালিগঞ্জ রোড— বৃহৎ এই রাস্তাটার বিস্তৃতি টালিগঞ্জ সার্কুলার রোড থেকে কেওড়াতলা মহাশ্মশানের সামনে রাসবিহারী অ্যাভিনিউ, চেতলা রোড পর্যন্ত। তবে পাড়াটার বিস্তৃতি বাজারের কাছে পঞ্চাননের মন্দির থেকে ছোট রাসবাড়ির মাঠ পর্যন্ত। এ পাড়ায় এখনও ভোর হয় পাখির ডাকে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাখিদের কিচির-মিচির ঢেকে যায় মানুষের কোলাহলে। শুরু হয় দৈনন্দিন জীবনযাত্রা।
আজও এখানে আছে পাড়া-পাড়া একটা পুরনো গন্ধ। অন্য পাড়ার তুলনায় এখানে পরিবর্তন কমই চোখে পড়ে। এখনও বাড়ির সংখ্যাই বেশি। তবে তৈরি হয়েছে কিছু বহুতল। থাকেন মূলত মধ্যবিত্ত মানুষ। এখানে থাকার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি মানুষে-মানুষে সুসম্পর্ক আর আত্মিক টান। কর্মব্যস্ত জীবনের চাপে রোজ দেখাসাক্ষাৎ নাই বা হল, অন্তরের টান এখনও বজায় রয়েছে। তার প্রমাণ মেলে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে বা কারও কোনও সমস্যা হলে। প্রতিবেশীরা আর পরিচিতেরা এসে খোঁজ নেন, প্রয়োজনে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। পাড়ার বাসিন্দারা প্রত্যেককে নামে চেনেন। সকলকে নিয়ে মিলেমিশে থাকায় উপলব্ধি করা যায় এ পাড়ার বর্ণময় চরিত্রটা। এ পাড়ায় লোকবলের অভাবে কাউকে অসহায় বোধ করতে হয় না।
আমাদের পাড়ায় যুব সম্প্রদায় এলাকার উন্নয়নে সচেষ্ট। যে কোনও সমস্যায় তাঁদের এক ডাকেই পাশে পাওয়া যায়। আগে পাড়ায় বসত নিয়মিত আড্ডা। আড্ডাই ছিল মানুষের অন্যতম বিনোদন। সেটা সময়ের সঙ্গে কিছুটা হলেও কমেছে। এখন সন্ধ্যার পরে কম বেশি সকলেই টিভির সামনে মশগুল। তবে এখনও যুব প্রজন্মকে আড্ডা দিতে দেখা যায় কখনও চায়ের দোকানে, কখনও বা ক্লাবে। আড্ডা দেন প্রবীণেরাও। পাড়ার ক্লাবের উদ্যোগে হয় নানা সমাজসেবামূলক অনুষ্ঠান।
সময়ের সঙ্গে অন্য পাড়ায় খেলাধুলোর পরিবেশ কমলেও আমাদের পাড়ায় সেটা বেড়েছে। ফুটবল, ক্রিকেট, ভলিবল থেকে ক্যারম বাদ যায় না কিছুই। খেলার জন্য রয়েছে তিনটি মাঠ। ছুটির দিন ছাড়াও প্রতিদিন বিকেলে বড় রাসবাড়ি, ছোট রাসবাড়ি আর আমার বাড়ির পাশের মাঠে ছোটদের এবং তরুণদের নিয়মিত খেলতে দেখা যায়। এ ছাড়াও মাঠগুলি থাকায় এখানে নেই কোনও পার্কিং সমস্যাও। এ পাড়ার পুজো-পার্বণও কম আকর্ষণীয় নয়। কাছাকাছির মধ্যে হয় বেশ কয়েকটি দুর্গাপুজো। তা ছাড়াও অন্য পুজো তো আছেই।
গত কয়েক বছরে এলাকায় ভালই উন্নয়ন হয়েছে। রয়েছে পর্যাপ্ত আলো, জল। নিয়ম করে হয় জঞ্জাল সাফাই, রাস্তা পরিষ্কার। কাউন্সিলর জুঁই বিশ্বাস এলাকার মানুষের সঙ্গে ভাল জনসংযোগ রেখে চলেন।
এ পাড়ার আকর্ষণ হল সুপ্রাচীন মন্দিরগুলি। পাড়ার শুরুতেই পঞ্চাননের বহু প্রাচীন মন্দির দাঁড়িয়ে। সেখানে নীলের পুজো, চৈত্র সংক্রান্তি আর শিবরাত্রির সময় বহু ভক্ত সমাগম হয়। আর আছে বাওয়ালির মণ্ডল পরিবারের প্রতিষ্ঠিত মন্দিরগুলি। বেশ কিছু শিব মন্দির ছাড়াও রয়েছে বড় রাসবাড়ির বিখ্যাত আটচালা মন্দির আর কিছু দূরে নবরত্ন মন্দিরযুক্ত ছোট রাসবাড়িটি। দেখে বেশ ভালো লাগে যে ক্যামেরা হাতে বিদেশিরা এবং উৎসুক মানুষ এসে এগুলির ছবি তোলেন, অধীর আগ্রহে জেনে নেন অজানা ইতিহাস। এক সময়ে এখানেই আসতেন মন্দির গবেষক ডেভিড ম্যাককাচ্চন আর তারাপদ সাঁতরা। আগে রাসপূর্ণিমায় বসত জমজমাট মেলা। গত কয়েক বছর সেই মেলাটা আর বসে না। বসে হাতে গোনা কিছু দোকান।
কাছেই টালিগঞ্জ বাজার। ভাগ্যিস এখানে তৈরি হয়নি কোনও শপিং মল! সাবেক বাজারের পরিবেশ রয়েছে বহাল তবিয়তে। খাদ্যদ্রব্যের পাশাপাশি পাওয়া যায় মাটির কলসি থেকে ফুলের টব। টিকে আছে ক্রেতা-বিক্রেতার আন্তরিক সম্পর্কও। এখনও আমাদের পাড়ায় শোনা যায় ফেরিওয়ালার ডাক। জোয়ারের সময় এখনও আদি গঙ্গায় পণ্যবাহী নৌকা চলাচল করে। এক কালে এখানেই থাকতেন অতীতের যাত্রা অভিনেতা মথুর শা, আইনজীবী শীতলচন্দ্র সেন। আর পাড়া সংলগ্ন চারু অ্যাভিনিউ-এ কবি কালীদাস রায়, অভিনেতা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়।
এক কালে পাড়ায় মাঝে মধ্যেই গোলমাল হত। সন্ধ্যার পরে কখনও কখনও হত বোমাবাজি। এখন সেই পাড়াই নির্ঝঞ্ঝাট, শান্তিপূর্ণ। এমনকী রাতেও নিরাপদ। কত রাত পর্যন্ত রোগীরা আসেন ডাক্তারখানায়। কখনও কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। দরকার পড়লে পাড়ার ছেলেরা ট্যাক্সি ডেকে রোগীদের তুলেও দেন। এমনটা কি সব পাড়ায় হয়?
দেখতে দেখতে বাইশটা বছর এ পাড়াতেই কাটিয়ে দিলাম। এ পাড়ার পরিবেশের মধ্যে মিশে আছে এক আকর্ষণী শক্তি। আপাত দৃষ্টিতে ঝাঁ চকচকে, তাক লাগানো নয় ঠিকই। কিন্তু এ পাড়ার আকর্ষণ সহজ সরল জীবনযাত্রা আর মানুষে মানুষে সুসম্পর্ক। এখনও রাস্তায় বেরোলে সকলে হেসে কুশল বিনিময় করেন। কাউকে উপেক্ষা নয়, অবহেলা নয়। সকলকে নিয়ে সুখে-দুঃখে থাকাই এ পাড়ার ঐতিহ্য।
বহু বার এ পাড়া ছেড়ে অন্যত্র যাওয়ার সুযোগ এলেও কখনও ছাড়তে পারিনি— কারণ এ পাড়ার পরিবেশ, প্রতিবেশী আর নিরাপত্তা অন্যত্র পাব কি?
লেখক পরিচিত চিকিৎসক
ছবি : সুমন বল্লভ