আবার সে এসেছে ফিরিয়া! সুকুমার রায়ের নাছোড় পাগলা দাশুর সংলাপ মনে পড়াটা সম্ভবতঅন্যায় হল না শনিবার সন্ধ্যায় কলকাতা বইমেলায় বসে। কারণ, ১৩ বছর বাদে এখানে ফিরলেন অমিতাভ ঘোষ। ঠিক যখন তাঁর প্রিয়সুন্দরবনও অমিতাভের উপন্যাসে ফিরে এসেছে।
ফিরে আসা এবং যাযাবর সত্তার টান— বইমেলার মাঠে দুটোই অবশ্য উস্কে দিয়েছেন তিনি। তরুণ বয়সে তাঁর মনন নির্মাণেবইমেলার ভূমিকা অকপটে বলেছেন অমিতাভ। “বইমেলা মানে আর্জেন্টিনার সঙ্গে বেহালার মোলাকাত, বার্লিনের পাশে বাংলাদেশের লেখনি”, সাহিত্য উৎসবের উদ্বোধনে বলছিলেন তিনি। সেই অমিতাভই অরুণাভ সিংহের সঙ্গে আলাপচারিতায় বাঁচার তাগিদে মানুষের যাযাবর হওয়ার পরিণতি মেলে ধরলেন।সল্টলেক থেকে সুন্দরবন বেশি দূরে নয়! বলেই অমিতাভের প্রিয় বিষয় সুন্দরবন প্রসঙ্গ পাড়েন বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান অনুবাদকঅরুণাভ। অমিতাভ বলছিলেন, “প্রকৃতির ভোলবদল আর মানুষের বাড়াবাড়ি, দায়িত্বহীন পর্যটন সুন্দরবনকে পাল্টে দিচ্ছে।বিশেষত, আয়লার ধাক্কায় সুন্দরবনবাসী আদিম যাযাবর জীবনে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন।” সুন্দরবন বিষয়ক ‘দ্য হাঙ্গরিটাইড’, ‘গান আইল্যান্ড’-এর পরে সাম্প্রতিক ‘গোস্ট-আই’-এর লেখক বললেন, “আজকের সুন্দরবন মানে আলো জ্বেলে গান চালিয়ে সশব্দ ভটভটির অত্যাচার। লালকাঁকড়া আর পাখির ঝাঁক অদৃশ্য! মানুষও বাধ্য হচ্ছে ভারতের ভিন্ রাজ্যে দেশান্তরী হতে।”
অমিতাভ মনে করেন, বাংলাদেশের সাগর পাড়ি দেওয়া দেশান্তরীদের মতো গ্রিস,লিবিয়া, ইটালি না-হলেও পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ীরা গোয়া, কর্নাটকে কয়েক মাস করে শ্রম দিচ্ছেন। কিংবা কলকাতার কাছে বসত গাড়ছেন, আবার বছরের কিছু সময় সুন্দরবনকেও আঁকড়ে বাঁচছেন। তাঁর আশঙ্কা, “যা পরিস্থিতি, সুন্দরবন থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে মানুষের বিচ্ছিন্ন হওয়ারও জোয়ার আসতে চলেছে।”
সভ্যতার এই সঙ্কটে পাশ্চাত্যের উপন্যাসের যুক্তিগ্রাহ্য ছাঁচ, নিষ্প্রাণ বৈজ্ঞানিক ভিত্তির বাইরেবেরোনোর কথা ইদানীং নিয়মিত বলেন অমিতাভ। ‘গোস্ট-আই’ প্রসঙ্গে শুক্রবার আলিপুর জেল মিউজ়িয়ামে কলকাতা লিটারারি মিটে মালবিকা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও অবাস্তবের বাস্তবতা(রিয়েলিটি অব দ্য আনরিয়েল) খোঁজার কথা বলছিলেন। বইমেলাতেও অমিতাভের আনক্যানি বা রহস্যময় অদ্ভুতের প্রতি টানের কথা উঠল। অমিতাভবললেন, “পৃথিবীর সব কিছু বিজ্ঞানগ্রাহ্য কেন হতে হবে? অদ্ভুত ছাড়া পৃথিবীর মূল্য নেই! লেখকের কর্তব্যই, অদ্ভুতের কল্পনা করা। এটা উপেক্ষা করা ভুল।” বনবিবি, মা মনসা, সুফি পিরেরা এবং স্বয়ংদক্ষিণরায়কে নিয়ে সুন্দরবন যে অদ্ভুতের রাজ্যপাট, তা নিয়ে এই সন্ধ্যায়ও মুখর হন অমিতাভ। কিন্তু নতুন উপন্যাসটিতে তাঁর নতুন ঝোঁক নিয়েও প্রশ্নের মুখেপড়েছেন। ‘গোস্ট-আই’-এর শুরুতেই মারোয়াড়ি পরিবারে একটি ছোট শিশু হঠাৎ মাছভাত খেতে চায়, পরিষ্কার বাংলায় চেঁচিয়ে ওঠে।এই অংশটি বাংলা তর্জমায় পড়লেন অরুণাভ। জাতিস্মর এই চরিত্রের ভাষা, খাবারে মিশে আছে গত জন্মের স্মৃতি। ফলে বইমেলারসভায় প্রশ্ন উঠল, তবে কি হিন্দু জন্মান্তরবাদে ঝুঁকছেন লেখক? অমিতাভের ব্যাখ্যা, জন্মান্তর নিয়ে তিনি অজ্ঞেয়বাদী।আর পূর্বজন্মের স্মৃতির গল্প নানা দেশ, সংস্কৃতিতে ছড়িয়ে। তাঁর কথায়, “আমার লেখা অভিজ্ঞতাও কল্পনার। অতীন্দ্রিয় দর্শন-টর্শন বুঝি না।”
সেই কল্পনার জোরেই অমিতাভের লেখায় পাহাড়, জঙ্গল থেকে না-মানুষ জন্তুরাও বাঙ্ময় হয়।অমিতাভ বলার আগে চলচ্চিত্রকার গৌতম ঘোষ ‘সমরেশ মজুমদার পুরস্কার’ নিতে মঞ্চে উঠেছিলেন। প্রয়াত সমরেশ ও তাঁর লেখা চিত্রনাট্যে এক দশকআগের ‘শূন্য অঙ্ক’ ছবিটির কথা বলছিলেন গৌতম। সেই ছবিতে কর্পোরেট লোভে ধ্বস্ত পাহাড়, প্রকৃতির গল্প। সমকালের বিশ্ব সাহিত্যে বাংলার বলিষ্ঠতম কণ্ঠ অমিতাভও বললেন, ‘‘জঙ্গলে কাঠ কাটা, মধু খোঁজা গরিব নয়, ধনীর মুনাফার লোভই প্রকৃতিকে শেষ করে দিচ্ছে।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)