E-Paper

মাটির জোগান হঠাৎ বন্ধে থমকেছে কাজ, মাথায় হাত কুমোরটুলির

শিল্পীদের দাবি, ভোটের কারণে বহু পুজো কমিটি এখনও প্রতিমার বায়না চূড়ান্ত করেনি।

হিন্দোল ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ২৯ মে ২০২৬ ১০:২৭
অভাব: মাটি নিয়ে চিন্তায় মৃৎশিল্পীরা। কুমোরটুলিতে।

অভাব: মাটি নিয়ে চিন্তায় মৃৎশিল্পীরা। কুমোরটুলিতে। ছবি: বিশ্বনাথ বণিক।

পুজোর আর দেড়শো দিনও বাকি নেই। এই সময়ে কুমোরটুলিরআনাচে কানাচে সাধারণত হাতুড়ির শব্দ, খড়ের গন্ধ আর ব্যস্ততার ছাপ চোখে পড়ে। কিন্তু এ বছর ছবিটা অন্য রকম। বাঁশের কাঠামো তৈরি হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে, খড় বেঁধে রাখা প্রতিমার শরীর শুকিয়ে যাচ্ছে, অথচ তাতে মাটির প্রলেপ পড়ছে না। কারণ, মাটির জোগান বন্ধ। টানা প্রায় ১০-১৫ দিন ধরে দক্ষিণ ২৪ পরগনা-সহ বিভিন্ন এলাকা থেকে মাটি আসছে না কুমোরটুলিতে। সেই সঙ্গে খড় ও পাটের দড়ির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি তো রয়েইছে। ফলে সব মিলিয়ে কপালের চিন্তার ভাঁজ কুমোরটুলির মৃৎশিল্পীদের।

শিল্পীদের দাবি, ভোটের কারণে বহু পুজো কমিটি এখনও প্রতিমার বায়না চূড়ান্ত করেনি। প্রতি বছরএই সময়ের মধ্যে যে পরিমাণবরাত এসে থাকে, এ বার তারপরিমাণ বেশ খানিকটা কম। ফলে এক দিকে যেমন কাজ শুরু করতে দেরি হয়েছে, অন্য দিকে, যাঁরা বরাত দিয়ে গিয়েছেন, তাঁদের প্রতিমার কাজও আটকে রয়েছে কাঁচামালের অভাবে।

শিল্পী প্রশান্ত পালের কথায়, “মাটি আসছে না প্রায় ১০-১৫ দিন হয়ে গেল। দক্ষিণ ২৪ পরগনা থেকেইমূলত মাটির জোগান হত। এখন কাঠামোয় খড় বেঁধেই রেখে দিতে হচ্ছে।মাটির প্রলেপ দিতে পারছি না।” তাঁর মতে, এই সময়টাই প্রতিমা তৈরির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। কারণ, এখন শরীরের গঠন তৈরি না হলে পরে রং বা সূক্ষ্ম কাজের জন্য বেশি সময়হাতে থাকে না।

শুধু মাটির সমস্যাই নয়। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে কাঁচামালের দামও। শিল্পীদের অভিযোগ, বছর কয়েক আগে সাত কেজি ওজনের এক বান্ডিলখড়ের দাম পড়ত ৩৫ টাকা। এখন সেটাই দাম বেড়ে হয়েছে ৭০ টাকা! এক কেজি পাটের দড়ির দাম কয়েক বছর আগেও ছিল ৮০ টাকা, এখন সেই পরিমাণ পাটের দড়ি কিনতে হচ্ছে ২৩০-২৫০ টাকায়। ফলে প্রতিমা তৈরির খরচ কয়েক গুণবেড়ে গিয়েছে।

কারিগর সুনয়ন পালের অভিযোগ, “আগে রায়চক, উলুবেড়িয়া-সহ বিভিন্ন এলাকা থেকে পুকুর কাটা বা জমি কাটার মাটি আসত। এখন সরকার সেইসব কিছুকে ‘অবৈধ’ ঘোষণা করে বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু বিকল্পকোনও ব্যবস্থা নেই।” একই সুরশিল্পী আদিত্য কর্মকারের গলায়ও। তিনি বলেন, “৬ তারিখ থেকে হঠাৎই মাটির জোগান বন্ধ। খড় বেঁধে রেখে দিয়েছি। কবে মাটি দেব, কবে রং করব, কিছুই জানি না।”

মাটির জোগান ঘিরে আরওএক সমস্যার কথা জানালেন কালীঘাট পটুয়াপাড়ার কারিগর বাবলু জানা। তাঁর দাবি, আগে নৌকা করেমাটি আসত। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তার কারণে সেটা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এখন খিদিরপুরেরদইঘাট থেকে কিছু মাটি নেওয়া হচ্ছে। তাঁদের দাবি, আগে যে এক গাড়ি মাটি ৫০০ টাকায় মিলত, এখন তার দাম বেড়ে হয়েছে প্রায় ১২০০ টাকা।

কুমোরটুলি মৃৎশিল্পী সাংস্কৃতিক সমিতির কোষাধ্যক্ষ সুজিত পালের কথায়, “আগে হুগলি থেকে পাটের দড়ি আসত। পরে বাংলাদেশেরদড়ির উপরে নির্ভর করতে শুরুকরি। এখন সেই দড়ি আনতেওসমস্যা হচ্ছে। ২০২৫ সালে যে দড়ি ৮০ টাকায় কিনেছি, এখন তার দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩০ টাকা! এ তো প্রায় তিন গুণ।”

অভিযোগের সুর শিল্পীদের একাংশের কথাতেও। তাঁদের দাবি, আগে বার বার সরকারকে কুমোরটুলিতে একটি স্থায়ী মাটির গুদামঘর তৈরির আবেদন জানানো হলেও তাতে গুরুত্ব দেয়নি প্রশাসন। শিল্পীদের বক্তব্য, রাখার জায়গা থাকলে অন্তত কয়েক সপ্তাহের জন্য মাটি মজুত রাখা যেত।

শ্যামপুকুরের সদ্য নির্বাচিত বিধায়ক পূর্ণিমা চক্রবর্তী অবশ্য জানিয়েছেন, “কুমোরটুলির উন্নয়নের জন্য কিছু আবেদন আমার কাছে এসেছে। তবে মাটি এবং অন্যান্য সমস্যার কথা সরকারি ভাবেএখনও জানানো হয়নি। বিষয়টিগুরুত্ব দিয়ে দেখব এবং মুখ্যমন্ত্রীকে সবটা জানাব।”

সামনে বর্ষা। ফলে কাজে আরও বিঘ্ন ঘটবে, সেই আশঙ্কা এখন বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে শিল্পীদের কাছে। কারণ তখন কুমোরটুলির কর্মব্যস্ততা থমকে গেলে বিঘ্ন ঘটতে পারে শহরের পুজোর প্রস্তুতিতেও।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

kumortuli

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy