‘ন্যাশনাল অর্গান অ্যান্ড টিসু ট্রান্সপ্লান্ট অর্গানাইজ়েশন’ (নোটো)-এর পরিসংখ্যান বলছে, এ দেশে জীবিত মানুষের অঙ্গদানের ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশই নারী। বিশ্বের পরিসংখ্যানের নিরিখে যা ৬০ শতাংশ। কেন এতটা পার্থক্য?
তা হলে ‘জীবিত মানুষের অঙ্গদানেও লিঙ্গ-বৈষম্যই কি বাস্তব?’ আনন্দবাজার পত্রিকা আয়োজিত ‘শহর কী বলছে’ শীর্ষক আলোচনায় এই প্রশ্নই রাখা হয়েছিল দমদম পার্কের বাসিন্দাদের সামনে। অনুষ্ঠানের ডিজিটাল পার্টনার আরও আনন্দ। আজ, শুক্রবার মুক্তি পাওয়া ছবি ‘ফুলপিসি ও এডওয়ার্ড’ এই প্রশ্নকে আরও প্রাসঙ্গিক করে তুলছে। দমদম পার্ক ভারতচক্র ক্লাবে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ছবিটির পরিচালকদের এক জন নন্দিতা রায়, অভিনেতা অর্জুন চক্রবর্তী, অভিনেত্রী অনন্যা চট্টোপাধ্যায়। ছিলেন নেফ্রোলজিস্ট উপল সেনগুপ্ত।
বিশ্বজোড়া এই প্রবণতা আদতে পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতারই প্রকাশ। তাই নারী অঙ্গদানে অনেক এগিয়ে থাকলেও বেশির ভাগ নারীই নিজেদের প্রয়োজনে অঙ্গ প্রতিস্থাপন তো দূর, চিকিৎসাটুকুও পান না। এ কথা মেনে নিলেন সভাঘরে উপস্থিত সকলেই। নন্দিতা বললেন, ‘‘সিনেমা মনোরঞ্জনের জন্য। কিন্তু মানুষকে ভাবানোর কাজ করতে পারে সিনেমাই। মনোরঞ্জনের ফাঁকে তাই গুরুত্বপূর্ণ এই বার্তা সকলের কাছে পৌঁছে দিতে চেয়েছি। সিনেমা দেখে বাড়ি ফিরেও যাতে মানুষ ভাবেন বিষয়টি নিয়ে। এক-দু’জন মানুষের ভাবনায় পরিবর্তন ঘটাতে পারলে সেটাও সাফল্য।” যদিও এই পরিস্থিতি নিয়ে খানিকটা হতাশ অর্জুনের কথায়, ‘‘আমরা দেখেছি, সব কিছুতেই মেয়েরা এগিয়ে আসেন। সারা বিশ্বে জীবিত মানুষের অঙ্গদানের ক্ষেত্রে সেই একতরফা প্রবণতা উদ্বেগের। তবে আলোচনা বা সেমিনারের মাধ্যমে সেই মানসিকতা বদলানো সম্ভব, এতটাও আশাবাদী হতে পারছি না। এ-ও জানি না, পরিবর্তন কী ভাবে সম্ভব।”
প্রশ্ন ছিল, শুধু কি অঙ্গদানের ক্ষেত্রেই লিঙ্গ-বৈষম্যের শিকার মেয়েরা? না কি সব ক্ষেত্রেই বৈষম্যের আঁচ পোহাতে হয়? অনন্যার স্বীকারোক্তি, “হ্যাঁ, কর্মক্ষেত্রে লিঙ্গ-বৈষম্যের শিকার হয়েছি। এটাও বিশ্বাস করি যে, বহু মেয়েকেইনিজের কর্মক্ষেত্রে বা সংসারে লিঙ্গ-বৈষম্যের বলি হতে হয়। এই একই কারণে আমরা বেতন-বৈষম্যেরও শিকার।” নেফ্রোলজিস্ট উপল সেনগুপ্তের বক্তব্য, অঙ্গদানে লিঙ্গ-বৈষম্য এতই প্রকট, যা চিকিৎসককে কষ্ট দেয়। তিনি বলেন, “মেয়েরা শুধু দিয়ে যান। আর ছেলেরা শুধুই নিয়ে যান। এ দেশে জীবিত মানুষের অঙ্গদানের প্রায় ৮০ শতাংশ নারীর দান। অথচ, গ্রহীতা হিসেবে মেয়েরাই বঞ্চিত। জীবিত মানবদেহের অঙ্গের মাত্র ১৫ শতাংশ মেয়েরা পান। বাকি ৮৫ শতাংশ পান পুরুষেরা।” উপল আরও বলেন, ‘‘যখন দেখি, কোনও মহিলার কিডনি প্রতিস্থাপন জরুরি জেনেও স্বামী, ভাই বা ছেলেকিডনি দানে আগ্রহ দেখান না, উপরন্তু ডাক্তার দেখানোও বহু নারীরপক্ষে আকাশকুসুম, তখন খুবঅসহায় লাগে।’’
উপলের মতে, ‘‘সচেতনতা ছড়িয়ে মরণোত্তর অঙ্গদানের সংখ্যা বাড়ানোই এই পরিস্থিতি মোকাবিলার উপায়। নোটোর ওয়েবসাইটে গিয়ে আগাম সেই পদক্ষেপ করে রাখতে পারেন যে কেউ। এ দেশে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলি বেশি করে মরণোত্তর অঙ্গদানের পথে হাঁটছে। কয়েক দশক ধরে তারা এ বিষয়ে কাজ করছে। যার ফল এখন পাচ্ছে।’’ এ বিষয়ে সহমত অর্জুন ও অনন্যা। অনন্যার মতে, ‘‘মরণোত্তর অঙ্গদান নিয়ে আমাদের গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। এটা প্রিয় মানুষকে কষ্ট দেওয়া নয়, বরং তাঁর অঙ্গগুলি অন্যকে বাঁচিয়ে দিয়ে আরও কিছু বছর থাকবে।’’
নন্দিতা জানালেন, তিনি নিজেও সরকারি ওয়েবসাইট থেকে মরণোত্তর অঙ্গদানের অঙ্গীকার করবেন। তাঁর আবেদন, সিনেমাটি দেখার পরে যদি সরকারি পদ্ধতি মেনে আগাম এই আবেদন করে রাখেন দর্শক, তা হলে ভবিষ্যতে অন্তত অঙ্গদানে লিঙ্গ-বৈষম্যের শিকার হতে হবে না মেয়েদের।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)