Advertisement
E-Paper

প্রাণঘাতী টিউমার সারিয়ে বাঁচাল প্রতিবেশী দেশ

আক্ষরিক অর্থেই কলকাতা এখন ‘প্রতিবেশী’ হয়ে উঠেছে নেপালের। কলকাতার চিকিৎসকেরা এক জোট হয়ে নেপালের এক মুমূর্ষু কিশোরীকে বাঁচানোর চেষ্টা করে চলেছেন।

সোমা মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১৬ মে ২০১৬ ০২:৫০
টিউমার-সহ রেবেকা রাই। (ডান দিকে) অস্ত্রোপচারের পরে। — নিজস্ব চিত্র

টিউমার-সহ রেবেকা রাই। (ডান দিকে) অস্ত্রোপচারের পরে। — নিজস্ব চিত্র

আক্ষরিক অর্থেই কলকাতা এখন ‘প্রতিবেশী’ হয়ে উঠেছে নেপালের। কলকাতার চিকিৎসকেরা এক জোট হয়ে নেপালের এক মুমূর্ষু কিশোরীকে বাঁচানোর চেষ্টা করে চলেছেন। আর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা নেপালিরা সে দিকে বাড়িয়ে দিয়েছেন আর্থিক সাহায্যের হাত। সব মিলিয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্র নেপাল এখন সব অর্থেই এই শহরের প্রতিবেশী।

কাঠমান্ডুর ১৪ বছরের রেবেকা রাই-এর মুখের প্রায় সমস্তটা জুড়ে বেড়ে উঠেছিল একটি টিউমার। খাওয়াদাওয়া বন্ধ হতে হতে ক্রমশ তা ঢেকে ফেলে তার দৃষ্টিশক্তিকেও। এরই মধ্যে ভূমিকম্পে বাড়ি-ঘরদোর নষ্ট হয়ে যায় তাদের। দিনমজুর বাবা-মা কোনও মতে সংসার চালাচ্ছিলেন। তারই মধ্যে তাঁদের সন্তান তিল তিল করে এগিয়ে যাচ্ছিল মৃত্যুর দিকে। বহু কষ্টে তিন-তিন বার নেপালে অস্ত্রোপচার হয়েছিল। কিন্তু টিউমারটি এমন ভাবে চোখ-কান পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল যে নেপালের চিকিৎসকেরা পুরোটি বাদ দিতে পারেননি। তাঁরা পরামর্শ দেন, এ ক্ষেত্রে রেবেকার সহায় হতে পারে কলকাতা। কলকাতার বড় হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেন তাঁরা। কিন্তু এই চিকিৎসা ও তার পরবর্তী প্রক্রিয়া যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ। ভিন্‌দেশে গিয়ে তা করাতে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। কী ভাবে তা জোগাড় হবে?

এই সময়েই এগিয়ে আসেন কাঠমান্ডুর বাসিন্দা রেবেকার প্রতিবেশীরা। নিজেরা তো সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেনই, পাশাপাশি ইন্টারনেটের মাধ্যমে যোগাযোগ করেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত ছড়িয়ে থাকা নেপালিদের সঙ্গে। দ্রুত আর্থিক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন তাঁরাও। সবটুকু নিয়ে প্রতিবেশীরা কয়েকজন চলে আসেন কলকাতায়।

দিন কয়েক আগে এখানেই এক হাসপাতালে সফল অস্ত্রোপচারে মুখের টিউমারটি বাদ দেওয়া গিয়েছে। আপাতত ঠোঁট নাড়তে পারছে রেবেকা। ইশারায় নিজের বক্তব্য বোঝাতেও পারছে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, দিন কয়েকের মধ্যেই মুখ দিয়ে খাওয়া শুরু করতে পারবে সে।

কলকাতায় রেবেকার অস্ত্রোপচার করেছেন তিন জন ম্যাক্সিলোফেশিয়াল ও মুখের ক্যানসারের শল্য চিকিৎসক— সইদুল ইসলাম, আব্দুস সালাম এবং জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়। চিকিৎসক সইদুল ইসলাম বলেন, ‘‘হু হু করে মেয়েটির টিউমারের আকার বেড়ে যাচ্ছিল। বিষয়টি চ্যালেঞ্জিং বলে অন্য দেশের সার্জনরাও নেপালে গিয়ে অস্ত্রোপচার করেছিলেন। কিন্তু টিউমার পুরোটা বাদ দেওয়া যায়নি। হয়তো ওখানকার পরিকাঠামোগত সমস্যাও সে ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।’’

চিকিৎসক জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় জানান, খাওয়াদাওয়া করতে পারত না বলে মেয়েটির ওজন দাঁড়িয়েছিল ৩০ কিলোগ্রামে। হিমোগ্লোবিনও কমে গিয়েছিল অনেকটাই। ফলে অস্ত্রোপচার করাটাই বড় ধরনের ঝুঁকি ছিল। পাশাপাশি, টিউমারটি বাড়তে বাড়তে এমন সব জায়গায় ছড়িয়েছিল যে পুরোটা কাটতে গেলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্নায়ু নষ্ট হওয়ার ভয় ছিল। এই কারণেই আগে তিন-তিনবার নেপালে অস্ত্রোপচার সফল হয়নি। তাঁর কথায়, ‘‘সব অর্থেই এটা আমাদের কাছে একটা চ্যালেঞ্জ ছিল। মুখের ক্যানসার যে হেতু বাড়ছে, তাই এই ধরনের অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে রোগীদের প্রতি আমাদের একটাই কথা, যত দ্রুত সম্ভব অস্ত্রোপচার করান। সামান্য দেরিও অস্ত্রোপচারে সাফল্যের সম্ভাবনা বহু গুণ কমিয়ে দেয়। বাড়িয়ে দেয় খরচ ও শারীরিক যন্ত্রণা।’’

পরিবারের লোকেরা জানিয়েছেন, রেবেকার অবস্থা ক্রমে এমনই দাঁড়িয়েছিল যে কোনওমতে সামান্য তরল খাবার কোনও খাওয়ানো হত তাকে। অনবরত টিউমার থেকে চুঁইয়ে পড়ত রক্ত। যেহেতু হিমোগ্লোবিন খুবই কম, তাই আগে দু’ইউনিট রক্ত দিয়ে তার পর অস্ত্রোপচার করা হয়। আট ঘণ্টার অস্ত্রোপচারে টিউমার বাদ দেওয়ার সময়ে উপরের চোয়ালের যে অংশটা বাদ পড়েছে, পেট থেকে মাংস নিয়ে তা পুনর্গঠন করেছেন চিকিৎসকেরা। এ ছাড়া চোখের চারপাশে যে হাড় থাকে, টিউমার পৌঁছে গিয়েছিল সেখানেও। সেই হাড়গুলিও নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। টাইটেনিয়াম জাল দিয়ে অংশটি তৈরি করে নেওয়া হয়। তার পরে কানের উপর থেকে মাংস নিয়ে জালের উপরে লাগানো হয়।

রেবেকার এক আত্মীয়া আলিশা কারকি বলেন, ‘‘নেপালে যে ডাক্তারের কাছে গিয়েছি, তাঁরাই বলেছেন, ওকে বাঁচাতে পারেন একমাত্র কলকাতার ডাক্তারেরাই। আমরা তাই অনেক আশা নিয়ে এই শহরে এসেছিলাম। এখানকার মানুষ যে ভাবে আত্মীয়ের মতো পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন তা ভাবা যায় না। ডাক্তারবাবুরাও প্রতি পদে চেষ্টা করেছেন, কী ভাবে আমাদের পাশে থাকা যায়।’’

যত ক্যানসার হয়, এখন তার মধ্যে মুখগহ্বর ও গলার ক্যানসারই প্রায় এক তৃতীয়াংশ। ক্যানসার শল্য চিকিৎসক গৌতম মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘মুখের ক্যানসারের চিকিৎসার দু’টি ধাপ। অস্ত্রোপচার ও মুখের বাদ যাওয়া অংশের পুনর্গঠন। এই ধরনের অস্ত্রোপচারে মুখের বিকৃতির ভয় থাকে ষোলআনা। কিন্তু টিউমার বাদ দেওয়ার সময়ে চিকিৎসককে সে সব খেয়াল রাখলে চলে না। কারণ পুরো বাদ না গেলে ফের টিউমার তৈরি হয়। আর এ সব ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার না করে ফেলে রাখাটাও খুব বিপজ্জনক। এ ক্ষেত্রে মেয়েটির যা পরিস্থিতি ছিল, তাতে বেশি দেরি করলে তাকে হয়তো বাঁচানো যেত না।’’

life safe city doctor
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy