E-Paper

এসআইআরের আতঙ্কে খাওয়া-কাজ ভুলে হলফনামা জমার ভিড় কোর্টে

এসআইআরের আতঙ্কে বিভিন্ন আদালতে হলফনামা দিতে আসা মানুষের ভিড়। হলফনামার কাজ মিটতে লেগে যাচ্ছে প্রায় গোটা দিন।

মিলন হালদার

শেষ আপডেট: ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:১৯
প্রতীক্ষা: ব্যাঙ্কশাল কোর্ট চত্বরে হলফনামা জমা দেওয়ার ভিড়। শুক্রবার।

প্রতীক্ষা: ব্যাঙ্কশাল কোর্ট চত্বরে হলফনামা জমা দেওয়ার ভিড়। শুক্রবার। ছবি: দেবস্মিতা ভট্টাচার্য।

ব্যাঙ্কশাল আদালত চত্বরে ভিড়ের মধ্যে উদ্বিগ্ন মুখে বসে প্রৌঢ়া মেহসুদা বেগম। ভোটার, আধার ও রেশন কার্ড-সহ যাবতীয় নথি নিয়ে তালতলার বাড়ি থেকে ছেলের সঙ্গে এসেছেন আদালতে। তাঁর ভোটার কার্ডে মৃত স্বামী শেখ জয়রুল হকের নাম রয়েছে ‘জ়াহিরুল’। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) শুনানিতে ডাক পেয়েছেন তিনি। নাম বাদ যাওয়ার আতঙ্কে হলফনামা দিতে এসেছেন। মেহসুদা বললেন, ‘‘সকাল ১০টায় এসেছি। সন্ধ্যা হতে চলল। কখন বাড়ি ফিরব, জানি না। ভোগান্তির সীমা নেই।’’

এসআইআরের আতঙ্কে বিভিন্ন আদালতে হলফনামা দিতে আসা মানুষের ভিড়। হলফনামার কাজ মিটতে লেগে যাচ্ছে প্রায় গোটা দিন। ‘পশ্চিমবঙ্গ ল’ ক্লার্ক অ্যাসোসিয়েশন’-এর ব্যাঙ্কশাল আদালত ইউনিটের সম্পাদক বাপন চক্রবর্তী বললেন, ‘‘এসআইআরের আগে দৈনিক ৩০-৩৫টি হলফনামা জমা পড়ত। এখন তা বেড়ে হয়েছে ২৫০-৩০০!’’ শিয়ালদহ আদালতের আইন বিষয়ক করণিক পরিমল কর্মকার জানান, ওই আদালতেও সেই সংখ্যা দৈনিক ৫০ থেকে বেড়ে ৩০০ ছুঁইছুইঁ। বললেন, ‘‘এসআইআর আতঙ্কেই এই ভিড়। সকলের এক দিনে হলফনামার কাজ হচ্ছেও না। তাঁদের ফের পরের দিন আসতে হচ্ছে।’’ আলিপুরআদালতের এক আইনজীবী জানালেন, হলফনামা দিতে আসা মানুষের সংখ্যা দিনে হাজার ছাড়িয়ে যাচ্ছে! নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছে,ভোটার তালিকায় কোনও পরিবর্তন করতে হলে আট নম্বর ফর্ম পূরণ করতে হচ্ছে।

অতীতে হলফনামার জন্য এমন ভিড়ের কথা মনে পড়ছে না আইনজীবী থেকে আদালতের কর্মচারীদের কারও। বাপনের কথায়, ‘‘প্রায় ৪৫ বছর ব্যাঙ্কশাল আদালতে রয়েছি। কিন্তু হলফনামার জন্য এমন ভিড় আগে দেখিনি। এসআইআরের আতঙ্কই এর কারণ।’’ শুনানিতে ডাক পাচ্ছেন মন্ত্রী, বিধায়ক, নেতা, অভিনেতারাও। যাঁরা পাননি, আতঙ্ক পিছু ছাড়ছে না তাঁদেরও। যেমন, সিঁথির বর্ষা মণ্ডল। বিয়ের সূত্রে বহু দিন কলকাতার বাসিন্দা মহারাষ্ট্রের এই ৬৭ বছরের মহিলা। হলফনামা জমা দেওয়ার লাইনে দাঁড়িয়ে বর্ষা বললেন, ‘‘২০০২ সালের ভোটার তালিকায় আমার নাম ‘বি’ দিয়ে লেখা ছিল। আমি ‘ভি’ দিয়ে লিখি। এই ভুল সংশোধন করা হয়েছে। তবু হলফনামা দিয়ে জানাতে এসেছি, দু’টি নাম এক জনেরই। সাবধানের মার নেই!’’ রেলের কর্মী মধ্যবয়সি এক ব্যক্তি বললেন, ‘‘ভোটার তালিকায় আমার পদবি নিয়ে সমস্যা রয়েছে। তাই হলফনামা দিতে এসেছি। সকাল ৯টায় এসে সারা দিন বসে আছি। টাকাও খরচ হচ্ছে। এসআইআরের কারণেই এই হেনস্থা।’’ হলফনামার কাজ করেন আইনজীবী নিমাইচরণ ঘোষ। বললেন, ‘‘দিনে পাঁচ-ছ’জনের কাজ করছি। কারও মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ডে পদবি দেবশর্মার ইংরেজি বানানে ‘বি’ রয়েছে, ভোটার কার্ডে ‘ভি’। আতঙ্কে তিনিও হলফনামা দিতে এসেছেন। ‘বি’ আর ‘ভি’-র মধ্যে কী ফারাক?’’

শিয়ালদহ আদালতে হলফনামার লাইনে বার বার ঘড়ি দেখছিলেন বেলেঘাটার অজয় প্রসাদ। ২০০২-এর তালিকায় তাঁর প্রয়াত বাবা মঙ্গল প্রসাদের ইংরেজি বানানে ‘এ’ এবং ‘ও’-র গোলমাল রয়েছে। তাই হলফনামা দিতে এসেছেন। তাঁর কথায়, ‘‘কত ক্ষণ লাগবে, জানি না। অফিস থেকে ফোন আসছে। অফিসে যাব, না এটা সামলাব, বুঝতে পারছি না। বাবার নামের বানানে ভুল থাকলে যদি দেশ থেকে তাড়িয়ে দেয়?’’

সকাল ৬টায় লাইনে দাঁড়িয়েছেন এন্টালির বাসিন্দা অজয় রজক। তাঁর স্ত্রীর ভোটার কার্ডে স্ত্রীর বাবার নাম ভুল রয়েছে। ১০টায় শিয়ালদহ আদালতে আসেন শ্বশুর লক্ষ্মণ দাস। অজয়ের কথায়, ‘‘বয়স্ক মানুষের পক্ষে এত সকালে এসে লাইনে দাঁড়ানো সম্ভব নয়। তাই আমি এসেছি। ইলেকট্রিকের কাজ করি। আজ কাজে যেতে পারলাম না। কিন্তু ভোটার তালিকায় নাম না থাকলে তো আরও সর্বনাশ।’’

আলিপুর আদালতের ছবিটাও ভিন্ন নয়। আইনজীবী আব্দুস সালাম কয়াল বলেন, ‘‘দিনে ১২০০-১৩০০ মানুষ হলফনামা দিতে আসছেন। রাত ৯টা-সাড়ে ৯টা পর্যন্ত লাইন থাকছে।’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

SIR Bankshal court

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy