রাত পোহালে দিদির অন্ত্যেষ্টি। আয়োজন সব সারা। তবু টাকার জন্য এমন হা-পিত্যেশ করে বেড়াতে হবে তা কে ভেবেছিল!
স্বামী-স্ত্রী দু’জন মিলে ঘণ্টাখানেকের বেশি লাইন দিয়ে হাজার বিশেক টাকার বন্দোবস্ত করতে পেরেছেন। তাতে আর কতটুকু হয়? দুর্বিপাক দেখে প্রবীণ মানুষটির এক স্নেহভাজন এগিয়ে এসেছেন। তিনি হাজার আটেক মতো ধার দিয়েছেন। এর পরেও বাড়িতে লক্ষ্মীর ভাঁড় ভেঙে আর একটু বাড়তি খরচের জন্য খুচরোয় ১২০০ টাকার বন্দোবস্ত। তাতে আবার অন্য গেরো! বাজারে ১০ টাকার মুদ্রা কেউ নিতে রাজি নয়।
এমন অভিজ্ঞতা যাঁর হয়েছে, তিনি রাজ্য সরকারের দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের চেয়ারম্যান কল্যাণ রুদ্র।
অনেকটা তেমনই দশা এক হবু বর সুমন দত্তের বাবা দীপঙ্কর দত্তের। বিলেত থেকে নিউ টাউনের ফ্ল্যাটে বর ফিরবেন বিয়ের ঠিক দু’দিন আগে। তার আগে এই নোট-আকালের দিনে বাবার অ্যাকাউন্টে পাঠানো টাকা সামলাতেই দত্ত বাড়ি রীতিমতো নাজেহাল।
নোট-নাকালের গেরো এ ভাবেই মিলিয়ে দিয়েছে দেশের উচ্চপদস্থ আমলা থেকে আমনাগরিককে।
শনিবার সন্ধ্যায় দীপঙ্করবাবু বললেন, ‘‘বৌমার গয়নার অনেকটা টাকা, অনুষ্ঠানবাড়ি, কেটারার, ডেকরেটরের অ্যাডভান্স— সব তো এত দিন নগদে দিতে হবে বলে ওরা জেদ ধরেছিল। সেই মতো টাকা তুলে রাখার পরে এই বিপত্তি।’’ এখন কেউ ৫০০, ১০০০-এর নোট নিতে রাজি নয় দেখে ৭০ ছুঁই ছুঁই দীপঙ্করবাবু প্রায় লাখখানেক টাকা ফের ব্যাঙ্কে জমা দিয়ে এসেছেন। তাঁর স্ত্রী নীলিমার কথায়, ‘‘সুগারের রোগী। দুপুরের ভাত খাওয়া শিকেয় তুলে প্রায় চার ঘণ্টা লাইন দিয়ে টাকা জমা দিয়ে এল।’’ এখন বেশির ভাগ টাকা চেকে দেবে বলে রাখলেও বিয়ের জন্য হাজার পঞ্চাশেক টাকা তো হাতে রাখতেই হবে। সেই টাকা তুলতে ফের দফায় দফায় এটিএম ও ব্যাঙ্কে লাইন দিতে এখন সেই বৃদ্ধই নিরুপায় হয়ে তোড়জোড় করছেন।
বেহালার ঊর্মি দত্তও ছেলের বিয়ে নিয়ে দুশ্চিন্তায়। আগাম তুলে ফেলা টাকা না-পারছেন ফেলতে, না-পারছেন গিলতে। কার্ডে, চেকে খানিকটা সুরাহা হলেও নমস্কারির শাড়ি, দশকর্মা ভাণ্ডারের সরঞ্জাম বা গামছা কিনতে গিয়েও বাতিল হওয়া নোট নিয়ে কী করবেন, ভেবে উঠতে পারছেন না। ভবানীপুরে নাতির বিয়ে উপলক্ষে সুদূর গুজরাত থেকে কলকাতায় এসে ঘুম নেই চম্পকলাল মেটারও। হাতে ১০০ বা তার থেকে কম অঙ্কের যা নগদ, পাইপয়সা মেপে খরচ করতে হচ্ছে, জানালেন বৃদ্ধ।
বিয়ের মরসুমে আচমকা নোটের আকালে মালদহ ও দক্ষিণ ২৪ পরগনায় কয়েকটি বিয়ে পিছিয়ে যাওয়ার ঘটনাও শোনা যাচ্ছে। দক্ষিণ কলকাতার এক গয়নার কারবারিও ঘোর সমস্যায়। নগদের আকালে বরাতমাফিক নতুন গয়না গড়ার সোনা জোগাড় করতেও তাঁরা হিমশিম।
তবে প্রধানমন্ত্রীর ফতোয়ায় বিয়েবাড়ির খরচে কর ফাঁকির রাস্তা কার্যত বন্ধ এখন। উত্তর কলকাতার জনৈক নামী কেটারার যেমন চেক ছাড়া কথাই বলছেন না। সবাইকে তিনি বলে দিয়েছেন, ‘‘কিছু করার নেই, কর-সহ চেকেই পুরোটা দিতে হবে। ফলে, প্লেটের দামও বাড়বে।’’ এই গ্রীষ্মে টালিগঞ্জের রামাশিস সরকারের ছেলের বিয়ের খাওয়াদাওয়া শহরের আর এক নামজাদা কেটারার আয়োজন করে। চেনা লোক বলে কেটারারই দীর্ঘদিন টাকাটা ‘নিচ্ছি, নেব’ করছিলেন। রামাশিসবাবু এ দিকে নগদ তুলে অপেক্ষা করছেন। এখন বাধ্য হয়ে একাধিক চেকে ভাগ করে টাকাটা মেটানোর অনুরোধ করেছেন কেটারারেরা। আর বলেছেন, চেকের নামের জায়গাটা খালি রাখতে। নিজেরা সরাসরি চেকটা না-নিয়ে বিভিন্ন ‘সাপ্লায়ার’দের পাওনা ওই চেকে মেটাবেন বলে তাঁরা মনস্থ করেছেন। তবে এত কৌশলেও বহু কেটারারই কারিগরদের মাইনে দিতে সমস্যায় পড়েছেন।