দু’জন লিফ্টকর্মী ঘটনার বহু আগে হাসপাতাল ছেড়েছিলেন। আর ডিউটি থাকলেও আর এক জন লিফ্টকর্মীকে দিনভর হাসপাতালে দেখাই যায়নি। কোথায় ছিলেন জানেন না কেউই। আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের লিফ্টে আটকে থেঁতলে অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর ঘটনার তদন্তে এমনই তথ্য উঠে আসছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর। আবার আদালতে অরূপের পরিবারের আইনজীবী জানান, বেসমেন্টে গ্রিলের দরজার তালা খুলে অরূপদের উদ্ধার করার বদলে আচমকা লিফ্ট চালু করে দেওয়ায় বিপর্যয় ঘটে।
ওই হাসপাতালের লিফ্ট বিকল হলে যে চাবি ব্যবহার করে খুলতে হয়, তা পূর্ত দফতরের ঠিক কোন কর্মীর কাছে থাকে, হাসপাতালের কেউই শনিবার রাত পর্যন্ত সে ব্যাপারে স্পষ্ট করে তদন্তকারীদের কিছুই বলতে পারেননি বলে সূত্রের দাবি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে গাফিলতির একাধিক অভিযোগেরও স্পষ্ট উত্তর মেলেনি রাত পর্যন্ত। লালবাজারের গোয়েন্দা বিভাগের হোমিসাইড শাখার পাশাপাশি এ দিন ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান রাজ্য ফরেন্সিক সায়েন্স ল্যাবরেটরির পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অফিসারেরা। সোমবার রাজ্য ফরেন্সিক সায়েন্স ল্যাবরেটরির জীববিজ্ঞান বিভাগের অফিসারদের সেখানে যাওয়ার কথা। এই ঘটনায় ধৃত পাঁচ জনকে এ দিন আদালতে তোলা হলে বিচারক আগামী ২৭ মার্চ পর্যন্ত তাঁদের পুলিশ হেফাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। আদালতে সরকারি আইনজীবী বলেছেন, ‘‘সাধারণ মানুষের ব্যবহারের লিফ্টগুলিকে মারণ যন্ত্রে পরিণত করা হয়েছে।’’
শুক্রবার রাতেই অরূপের স্ত্রী সোনালি বন্দ্যোপাধ্যায় আর জি কর হাসপাতাল থেকে তিন বছর বয়সি ছেলে আরুষের ছুটি করিয়ে বেরিয়ে আসেন। আরুষ ও তাঁর মাকে কালিন্দীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। শনিবার সকালে রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী তথা আসন্ন নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রসের এক প্রতিনিধির মধ্যস্থতায় এর পরে তাঁদের ইএম বাইপাসের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে। সেখানে এমআরআই-সহ বেশ কয়েকটি পরীক্ষা করানো হয়েছে দু’জনের। হাসপাতাল ও পরিবার সূত্রে খবর, দু’জনের শারীরিক অবস্থা ভাল। দ্রুত তাঁদের ছুটি দেওয়া হতে পারে।
সোনালি এ দিন বলেছেন, ‘‘আর জি করের ছায়া যেন আমার ছেলের উপর না পড়ে, তাই সরিয়ে নিয়েছি। দ্রুত আমি ওকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে চাই।’’ মৃতের বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের অনেকেরই দাবি, পুলিশের তদন্তে তাঁরা খুশি। তবে এমন ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সেটা নিশ্চিত করা হোক। পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সোনালির জন্য একটি সরকারি চাকরি এবং আরুষের জন্য একটি ভাল স্কুলে ভর্তির ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। মৃত অরূপের দাদা জয় বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘ভোটের আগে এই ঘটনা নিয়ে রাজনীতি হোক আমরা চাই না। অরূপ নিজে তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মী ছিল। নির্বাচন থাকায় এখনই হয়তো চাকরির ব্যবস্থা হচ্ছে না। কিন্তু ভোট মিটে গেলে হবে বলে আশ্বাস পেয়েছি আমরা। এই আশ্বাসে আমরা ভরসা রাখছি।’’
যদিও অরূপের মা গায়ত্রী বন্দ্যোপাধ্যায় এ দিন বলেছেন, ‘‘টাকা বা অন্য কিছুই চাই না। পারলে আমার ছেলেটাকে ফিরিয়ে দিক।’’ মৃতের বাবা অমল বন্দ্যোপাধ্যায় এ দিনও বলেছেন, ‘‘ওই অবস্থায় আমার ছেলেকে ছটফট করতে দেখলেও কেউ সাহায্য করেননি। সিআইএসএফ, পুলিশ, নিরাপত্তারক্ষী সকলেই বলেছেন, দরজার তালা ভেঙে বার করা আমাদের কাজ নয়।’’
এ দিন শিয়ালদহের অ্যাডিশনাল চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সুলতান মামুদের এজলাসে ধৃত তিন লিফ্টকর্মী ও দু’জন নিরাপত্তারক্ষীকে তোলা হলে সরকারি আইনজীবী অরিন্দম চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘‘সমস্যা থাকলে লিফ্ট কর্মীদের দায়িত্ব লিফ্ট বন্ধ করা। তা করা হয়নি। ওই ঘটনার সময়ে নিরাপত্তারক্ষীরা দাঁড়িয়ে গান শুনছিলেন।’’ মৃতের পরিবারের আইনজীবী শুভজ্যোতি দত্ত এবং জয়দীপ দে আদালতে জানান, ট্রমা কেয়ার বিল্ডিংয়ের দোতলায় অস্ত্রোপচারের ঘরের সামনে এক জন নিরাপত্তারক্ষী বসেছিলেন। অরূপ ও তাঁর পরিবার যে লিফ্টে উঠছেন, সেটায় গন্ডগোল রয়েছে জানা সত্ত্বেও তিনি কিছুই জানাননি।
শুভজ্যোতি বলেন, ‘‘লিফ্ট ওঠানামা করে শেষে বেসমেন্টে দাঁড়িয়ে যায়। বেসমেন্টে লিফ্টের দরজা খোলে। সামনে একটা গ্রিলের গেট থাকলেও সেটা তালাবন্ধ ছিল। লিফ্টের দরজাটাকে খোলা রাখার জন্য অরূপ পা দিয়ে আটকানোর চেষ্টা করেন। তাঁর স্ত্রী ছেলেকে নিয়ে অরূপের সামনে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। ওঁদের কাছে ফোন ছিল না। ওঁদের চিৎকারে একতলা থেকে কিছু মানুষ শুনতে পেয়ে নীচে যান। তাঁরা নিরাপত্তারক্ষী, পুলিশ, সিআইএসএফকে সাহায্য করার জন্য বলেন। কিন্তু কেউ সহযোগিতা করেননি। সিআইএসএফ কর্মীরা বলেন, এটা আমাদের কাজ নয়। উপস্থিত পুলিশ কর্মীদের বলা হলেও তাঁরা বিষয়টিকে আমল দেননি।’’ তাঁর প্রশ্ন, ‘‘তিন জন মানুষ লিফ্টের মধ্যে আটকে রয়েছেন, কষ্ট পাচ্ছেন, আর তাঁরা দেখছেন? উদ্ধার করে আনা কার দায়িত্ব?’’
এরপর শুভজ্যোতি দাবি করেন, অরূপের কয়েক জন বন্ধু দরজা টপকে বেসমেন্টের দিকে যেতে গেলেও বাধা পান। ফিরে এসে লিফ্টকর্মী, সিআইএসএফ, পুলিশকে দরজাটি খোলার জন্য অনুরোধ করলে বলে দেওয়া হয়, ‘চাবি আছে পূর্ত দফতরের কাছে। আমরা কিছু করতে-বলতে পারব না।’ তিনি বলেন, ‘‘কিছুক্ষণ পর পর তিন জন আসেন। বলা হয় তাঁরা লিফ্টম্যান। তাঁদের একজন উপরে গিয়ে লিফ্ট চালু করে দেন। ফলে লিফ্ট বেসমেন্ট থেকে উপরে উঠে যায়। তার ফলে অরূপের স্ত্রী সন্তানকে নিয়ে নীচে পড়ে যান। ওঁদের বেসমেন্টের দরজা খোলা দরকার ছিল। তার বদলে লিফ্ট চালু করে দেওয়ায় অরূপ মাঝখানে আটকে যান। তাঁর মারাত্মক আঘাত লাগে, মৃত্যু ঘটে। স্ত্রীর কোলে এসে পড়ে স্বামীর রক্তাক্ত মৃতদেহ।’’
ধৃত তিন লিফ্টকর্মীর তরফে আইনজীবী উত্তম ঘোষ ধৃতদের অল্প দিনের জন্য পুলিশ হেফাজতে পাঠানোর আর্জি জানান। ধৃত দুই নিরাপত্তারক্ষীর আইনজীবী শুভেন্দু সাহা বলেন, ‘‘আমার এক মক্কেল দোতলার অস্ত্রোপচারের ঘরের নিরাপত্তারক্ষী। দেড় বছর ধরে তিনি এই কাজ করছেন। ঘটনাটি ঘটেছে লিফ্টের মধ্যে। এই ঘটনায় তাঁর কী ভূমিকা? লিফ্ট তো লিফ্টকর্মী চালান।’’ শুভেন্দুর দাবি, ‘‘আসল অপরাধীদের ছেড়ে পুলিশ নিরীহ লোকেদের গ্রেফতার করে এনেছে।’’ সরকারি আইনজীবী প্রশ্ন তোলেন, নিরাপত্তারক্ষীর কাজ কি শুধু অস্ত্রোপচারের ঘরের নিরাপত্তা দেওয়া? বিপদগ্রস্ত কেউ সাহায্য চাইলে, তাঁকে সাহায্য না করার দায়ও নিরাপত্তারক্ষীর উপরে এসে পড়ে। সাহায্য করার দায়িত্ব যাঁদের, সেই সব পক্ষের থেকে আদালতকে রিপোর্ট চাওয়ার আর্জিও জানানো হয়। সওয়াল-জবাব শুনে ধৃতদের সকলকেই পুলিশ হেফাজতে পাঠান বিচারক।
এ দিনও ট্রমা কেয়ার বিল্ডিংয়ে দেখা যায়, বেসমেন্টে নামার সিঁড়ি তালা বন্ধ। আগুন লাগলে বা অন্য কোনও আপৎকালীন পরিস্থিতিতে লিফ্ট ছাড়া বেরনোর পথ নেই। একই অবস্থা দোতলা থেকে সিঁড়িতে বেরনোর পথেও। সে দিকেও তালা বন্ধ। অথচ সেখানেই আপৎকালীন পরিস্থিতিতে লিফ্ট ব্যবহার না করার নির্দেশ টাঙানো। সেখানে দাঁড়ানো এক রোগীর আত্মীয় বলেন, ‘‘এত বড় দুর্ঘটনার পরেও কর্তৃপক্ষের হুঁশ ফেরেনি। তা হলে আর কী আশা করতে পারি আমরা? আমাদের জীবন খোলামকুচি হয়েই থেকে গেল।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)