E-Paper

ফাঁকা প্ল্যাটফর্মে নিরাপত্তাবোধের প্রশ্ন মহিলা যাত্রীদের

গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনগুলিতে সিসি ক্যামেরার নজরদারি, নিরাপত্তারক্ষী এবং কন্ট্রোল রুম থেকে পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। তবু বহু বছরের পরিচিত ‘স্টেশন-সংস্কৃতি’ বদলে যাওয়ায় যাত্রীদের একাংশের অভিজ্ঞতাও বদলাচ্ছে।

হিন্দোল ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ২৯ জুন ২০২৬ ০৭:২৮
হকার উচ্ছেদের পরে ফাঁকা রাতের দমদম স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম।

হকার উচ্ছেদের পরে ফাঁকা রাতের দমদম স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম। ছবি: স্নেহাশিস ভট্টাচার্য।

রাত প্রায় ১০টা। টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। শিয়ালদহ দক্ষিণ শাখার ১৮ নম্বর প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ট্রেনের অপেক্ষায় ছিলেন বাঘা যতীনের বাসিন্দা নীলাঞ্জনা কর। অফিস থেকে ফেরার পথে এটাই তাঁর নিত্যদিনের রুটিন। কিন্তু কয়েক দিন আগে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে হঠাৎই যেন তাঁর মনে হয়, কিছু একটা বদলে গিয়েছে। চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখেন, পরিচিত চায়ের দোকান নেই, খাবারের স্টল নেই, নেই সেই চেনা ডাকাডাকি। প্ল্যাটফর্ম যেন আগের চেয়ে অনেক বেশি শান্ত, নির্জন। নীলাঞ্জনা বলেন, “পরিবেশটা এতটাই ফাঁকা লাগছিল যে, পরের দিনদমদমে নেমে মেট্রোতেই বাড়ি ফিরেছিলাম।”

শিয়ালদহ ও হাওড়া শাখার বিভিন্ন স্টেশনে হকার উচ্ছেদ অভিযানের পরে এমন অনুভূতির কথা বলছেন অনেক যাত্রী। রেলের দাবি, যাত্রী চলাচল নির্বিঘ্নে করা এবং স্টেশনকে আরও সুশৃঙ্খল করতেই এই পদক্ষেপ। গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনগুলিতে সিসি ক্যামেরার নজরদারি, নিরাপত্তারক্ষী এবং কন্ট্রোল রুম থেকে পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। তবু বহু বছরের পরিচিত ‘স্টেশন-সংস্কৃতি’ বদলে যাওয়ায় যাত্রীদের একাংশের অভিজ্ঞতাও বদলাচ্ছে। রাত ১০টা ২০ মিনিটের হাসনাবাদ লোকালের নিয়মিত যাত্রী, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী সুপর্ণা চক্রবর্তীর অভিজ্ঞতাও কিছুটা একই রকম। তাঁর কথায়, “আগে মহিলা হকারেরাও আমাদের সঙ্গে ফিরতেন। এখন অনেক বগিই ফাঁকা থাকে।” নিরাপত্তাহীনতার চেয়ে পরিচিত মুখের অভাব এক ধরনের অস্বস্তির জন্ম দিচ্ছে বলেই মনে করেন তিনি। চাঁপাপুকুর স্টেশনের যাত্রী প্রীতি মুস্তারীর পর্যবেক্ষণ, আগে স্টেশন চত্বর পেরোনোর সময়ে কয়েকটি দোকান খোলা থাকত, ফলে তাঁর বাড়ির রাস্তাটি আলোকিত থাকত। “এখন বিপদে-আপদে কাউকে ডাকলে ছুটে আসার কেউ নেই”— বলেন তিনি।

শুধু শিয়ালদহ নয়, উচ্ছেদের পরে ফাঁকা হয়েছে হাওড়া শাখার বেশ কিছু স্টেশন। বালি স্টেশনের যাত্রী বহ্নি ভট্টাচার্যের মতে, হকার উচ্ছেদের প্রভাব শুধু প্ল্যাটফর্মেই নয়, স্টেশন ঘিরে গড়ে ওঠা ছোট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও পড়েছে। আগে স্টেশন থেকে ফেরার পথে বাজার করা ছিল রোজকার অংশ। এখন সেই জায়গা ফাঁকা। বহ্নি বলেন, ‘‘এক নম্বরের পিছন দিকের অন্ধকার অংশটা এখন আড্ডার জায়গা হয়ে উঠেছে। রাতে সেখান দিয়ে যেতে একটু অস্বস্তিই হয়।” চন্দননগরের নিত্যযাত্রী, কলেজছাত্রী ব্রততী দেবনাথও মনে করেন, সূর্য ডুবলেই স্টেশন চত্বরে এক প্রকারের নিস্তব্ধতা নেমে আসছে। তাঁর কথায়, “রাতের স্টেশনের পরিবেশটাই যেন বদলে গিয়েছে।”

তবে সকলের অভিজ্ঞতা এক নয়। দমদম স্টেশন চত্বরে দীর্ঘদিন ধরে পথশিশুদের পড়ান কান্তা চক্রবর্তী। হকার উচ্ছেদের পরেও তাঁর কাজে কোনও সমস্যা হয়নি। তিনি বলেন, “আমি নিরাপদ জায়গায় বসে ক্লাস করাই। এখনও পর্যন্ত কোনও অসুবিধা হয়নি।” অন্য দিকে, উচ্ছেদ হওয়া হকারদের একাংশের দাবি, তাঁরা শুধু ব্যবসা করতেন না, বহু যাত্রীর সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কও গড়ে উঠেছিল। দমদম স্টেশনের ফুচকা বিক্রেতা বাণী নাথ কুণ্ডুর বক্তব্য, অনেক যাত্রী প্রয়োজনে তাঁদের সাহায্য চাইতেন। রেল যাত্রী হকার সমন্বয় কমিটির সদস্য কল্পনা দত্তের মতে, গভীর রাতেও অনেকে হকারদের সঙ্গে গল্প করতেন, সময় কাটাতেন। ফলে স্টেশন এলাকায় মানুষের স্বাভাবিক উপস্থিতি বজায় থাকত। সেই উপস্থিতি কমে যাওয়ায় নির্জনতার অনুভূতি বাড়ছে।

যাত্রীদের আলোচনার কেন্দ্রে এখন তাই শুধু নিরাপত্তা নয়, নিরাপত্তাবোধের প্রশ্নও। অনেক যাত্রীর কাছেই নিরাপদ স্টেশন মানে শুধু ক্যামেরা বা প্রহরা নয়, চারপাশে মানুষের উপস্থিতি এবং একটি জীবন্ত পরিবেশও।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

station platform

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy