Advertisement
E-Paper

ওয়ার্কশপ-ই পঙ্গু, বিকল গাড়ি নিয়ে বিপাকে দমকল

ঘটনা এক: আগুন লেগেছে বালিগঞ্জে। গ়ড়িয়াহাটের দমকলকেন্দ্র থেকে বিপদঘন্টি বাজিয়ে ছুটল দমকলের গাড়ি। কিন্তু মাঝপথেই সেই গাড়ি গেল বিগড়ে। শেষে তড়িঘড়ি কালীঘাট থেকে জরুরি ভিত্তিতে গাড়ি পাঠাতে হল ঘটনাস্থলে।

মেহবুব কাদের চৌধুরী

শেষ আপডেট: ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০০:২৬

ঘটনা এক: আগুন লেগেছে বালিগঞ্জে। গ়ড়িয়াহাটের দমকলকেন্দ্র থেকে বিপদঘন্টি বাজিয়ে ছুটল দমকলের গাড়ি। কিন্তু মাঝপথেই সেই গাড়ি গেল বিগড়ে। শেষে তড়িঘড়ি কালীঘাট থেকে জরুরি ভিত্তিতে গাড়ি পাঠাতে হল ঘটনাস্থলে।

ঘটনা দুই: বড়বাজারের আগুন নেভাতে গাড়ি পাঠানো হয়েছিল লালবাজার দমকলকেন্দ্র থেকে। কিন্তু ঘটনাস্থলে পৌঁছনোর ঠিক আগে, এক ঘিঞ্জি গলির মধ্যে দমকলের গাড়ি বিকল। অবস্থা সামাল দিল সেন্ট্রাল ফায়ার স্টেশনের গাড়ি।

ঘটনা তিন: তেহট্টে আগুন নেভাতে দমকলের গাড়ি রওনা দিয়েছিল কৃষ্ণনগর থেকে। দূরত্ব ৫৫ কিলোমিটার। কিন্তু গাড়ি বিগড়ে গেল ২০ কিলোমিটার যেতে না যেতেই। তখন ঘটনাস্থলের ১৫০ কিলোমিটার দূরে করিমরপুর দমকলকেন্দ্র থেকে গাড়ি পাঠাতে হল। ততক্ষণ আগুনে ক্ষতি হয়ে গিয়েছে অনেকটাই।

এ রকম দু’-তিনটি ঘটনা নয়, আগুন নেভানোর উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে মাঝপথে দমকলের গাড়ি বিকল হওয়া এখন প্রায় নিয়মে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। কারণ, গাড়িগুলির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব। যা হওয়া জরুরি বলে দমকল সূত্রে খবর।

এক অফিসারের কথায়, ‘‘দমকলের গাড়িকে পড়িমরি করে ছুটতে হয় আগুন নেভানোর কাজে। কোনও মোটরযানকে দীর্ঘদিন সুস্থ রাখতে হলে যে ভাবে তা চালাতে হয়, দমকলের গাড়ি সে ভাবে চালানো সম্ভব নয়। তাই ওই গাড়ি খারাপও হয় দ্রুত।’’ ওই অফিসার বলেন, ‘‘গাড়িগুলির রক্ষণাবেক্ষণ নিয়মিত হওয়া জরুরি। কিন্তু তা হচ্ছে না।’’ দমকলের মতো আপৎকালীন পরিষেবা দেওয়া একটি বিভাগে এমন ঢিলেঢালা মনোভাব যে বিপজ্জনক, সে কথা স্বীকার করছেন কর্তারাও।

দমকল সূত্রে খবর, অগ্নিনির্বাপক গাড়িগুলির রক্ষণাবেক্ষণ, যত্ন ও পরিচর্যার জন্য রয়েছে বিভাগের নিজস্ব বিভিন্ন ওয়ার্কশপ। কিন্তু গাড়ির পরিচর্যা করা তো দূরের কথা, তারা নিজেরাই ধুঁকছে লোকাভাবে।

রাজ্যে এমন ওয়ার্কশপ রয়েছে পাঁচটি। হাওড়া, ব্যারাকপুর, দুর্গাপুর, শিলিগুড়ি ও ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে দমকলের সদর দফতরে রয়েছে সেন্ট্রাল ওয়ার্কশপ। দমকলের এক কর্তা জানান, শুধু সেন্ট্রাল ওয়ার্কশপেই ৮৪টি পদ খালি। ঠেকনা দিচ্ছেন মাত্র ১৪ জন কর্মী। গাড়ি বিকল হলে সারাইয়ের জন্য এখন মাত্র দু’জন ‘ফোরম্যান’ রয়েছেন, তাঁদের আবার এ বছরেই অবসর নেওয়ার কথা।

ওয়ার্কশপে সব চেয়ে পটু বলে ধরা হয় মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারকে। সেন্ট্রাল ওয়ার্কশপে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার থাকার কথা ২৬ জন। কিন্তু এখন এক জনও নেই। তাঁদের কাজ করানো হচ্ছে মেকানিকদের দিয়ে। এক আধিকারিকের প্রশ্ন, ‘‘এক জন প্রশিক্ষিত ও ডিগ্রিধারী মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতির কাজ যে দক্ষতা ও নৈপুণ্যের সঙ্গে করবেন, সেই কাজ এক জন মেকানিককে দিয়ে কী করে হবে? সুতরাং, জোড়াতাপ্পি দেওয়া হচ্ছে। কাজের কাজ হচ্ছে না কিছুই।’’

হাওড়া, ব্যারাকপুর, দুর্গাপুর ও শিলিগুড়ির চারটি ওয়ার্কশপেও মোট ৭১টি পদ ফাঁকা। চারটি ওয়ার্কশপে রয়েছেন মাত্র ৩১ জন কর্মী।

এর ফলে কী হচ্ছে? দমকল সূত্রে খবর, কোনও গাড়ি আগুন নেভাতে গেলে ফিরে আসার পরে সেটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করবেন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ও অন্য কর্মীরা। তাঁরাই গাড়িটির পরিচর্যা করে সেটি এমন ভাবে রাখবেন, যাতে ফের সেটি ঠিক মতো আগুন নেভানোর কাজে ছুটে যেতে পারে। কিন্তু ওয়ার্কশপে কর্মীর অভাবে সেই কাজ হচ্ছে না।

অথচ নতুন গাড়ি কেনার বিরাম নেই দমকলে। রাজ্যের ১২০টি দমকলকেন্দ্রে নতুন-পুরনো প্রায় ৬০০টি অগ্নিনির্বাপক গাড়ি রয়েছে। গত দু’বছরেই কেনা হয়েছে ২২২টি গাড়ি। ফের গাড়ি কেনার জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ১০০ কোটি টাকা। কিন্তু ওয়ার্কশপগুলি ঠিক মতো চাঙ্গা না করে কেবল নতুন নতুন গাড়ি কিনে গেলে অচিরেই সেগুলো পঙ্গু হবে বলে দমকলকর্তাদের একাংশের মত।

প্রশিক্ষিত কর্মীর অভাবে ওয়ার্কশপগুলি যে ধুঁকছে, তা স্বীকার করেছেন দমকলমন্ত্রী জাভেদ খান। তাঁর কথায়, ‘‘ওয়ার্কশপে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার না থাকায় সমস্যা হচ্ছে। বিভিন্ন ওয়ার্কশপে শূন্যপদগুলি পূরণ করে যাতে সেগুলি পুরোদমে চালু করা যায়, সে বিষয়ে আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে।’’

কিন্তু সেই পরিকল্পনা রূপায়িত কবে হবে? উত্তর জানা নেই কারও।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy