Advertisement
E-Paper

কালির জুজু, অচল নোটে ‘না’ মাছ বাজারের

এত দিন তা-ও মাছবাজারে চলছিল বাতিল হয়ে যাওয়া পাঁচশো ও হাজার টাকার নোট। কিন্তু টাকা জমা দিলে ব্যাঙ্ক আঙুলে কালি লাগিয়ে দেবে— এই ঘোষণার পরে বুধবার থেকে অচল পাঁচশো আর হাজারের নোট নেওয়া বন্ধ করে দিলেন মাছ বিক্রেতারাও।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৭ নভেম্বর ২০১৬ ০১:১১
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের একটি শাখায় গ্রাহকদের আঙুলে লাগানো হচ্ছে কালি। বুধবার। —নিজস্ব চিত্র।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের একটি শাখায় গ্রাহকদের আঙুলে লাগানো হচ্ছে কালি। বুধবার। —নিজস্ব চিত্র।

এত দিন তা-ও মাছবাজারে চলছিল বাতিল হয়ে যাওয়া পাঁচশো ও হাজার টাকার নোট। কিন্তু টাকা জমা দিলে ব্যাঙ্ক আঙুলে কালি লাগিয়ে দেবে— এই ঘোষণার পরে বুধবার থেকে অচল পাঁচশো আর হাজারের নোট নেওয়া বন্ধ করে দিলেন মাছ বিক্রেতারাও।

কেন? লেক গার্ডেন্স সুপার মার্কেটের এক মাছ বিক্রেতার জবাব, বাতিল নোট পাল্টালে হাতে কালো কালি লাগিয়ে দেওয়া হবে। সে ক্ষেত্রে, নতুন করে আর বাতিল নোট পাল্টানো যাবে না। এই যুক্তিতে আড়তদার জানিয়ে দিয়েছেন, কোনও মতেই আর অচল ৫০০-১০০০ টাকার নোট নেওয়া হবে না। এ দিন লেক মার্কেট, যাদবপুর সুপার মার্কেট, গড়িয়া বাজার, মানিকতলা বাজার ঘুরে দেখা যায়— যে সব মাছ বিক্রেতা মঙ্গলবার পর্যন্তও পাঁচশো ও হাজারের নোট নিচ্ছিলেন, তাঁরাও তা নিচ্ছেন না।

কোলে মার্কেটের পাইকারি সব্জি বাজারে ক্রেতা কমলেও শহরের অনেক খোলা বাজারে এ দিন সব্জির ক্রেতা ছিল আগের পাঁচ দিনের তুলনায় বেশি। যাদবপুর সুপার মার্কেট, গড়িয়া বাজার, যদুবাবুর বাজার মানিকতলা বাজার, নাগেরবাজার, গোরাবাজারের মাছের দোকানে ভিড় কম থাকলেও, সব্জিবাজারে ক্রেতার সংখ্যা ছিল রবি-সোম-মঙ্গল বারের তুলনায় বেশি। মানিকতলা বাজারের ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক প্রভাত দাস জানান, ‘‘এটিএমগুলি কিছু টাকা ছাড়ায় মানুষের হাতে কিছু খুচরো এসেছে। আগে মানুষ কিছুই কিনতে পারছিলেন না। এখন তা-ও টিপে টিপে খরচ করার অবস্থায় এসেছেন।’’

Advertisement

কোলে মার্কেটে তবে ক্রেতা কম কেন? ওই বাজারের ব্যবসায়ী সমিতির এক কর্তার বক্তব্য, ‘‘যাঁরা একসঙ্গে অনেক টাকার মাল কেনেন, তাঁদের সংখ্যাটা দিনকে দিন কমছে। তবে যে সব ব্যবসায়ী অল্প মাল কিনে খোলা বাজারে বিক্রি করেন, তাঁদের আনাগোনা বেড়েছে।’’ আগামী কয়েক দিনের মধ্যে বাজারে নতুন ৫০০ টাকার নোট না এলে বড় ব্যবসায়ীদের মাল কেনা আরও কমে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন কোলে মার্কেটের পাইকারেরা।

শুধু খোলা বাজার বা পাইকারি বাজারই নয়, সমস্যায় পড়েছেন রাস্তার ধারের ছোট দোকান এবং ফুটপাথের বিক্রেতারাও। সকাল থেকে ব্যাগের পসরা নিয়ে বসেও বিকেল পর্যন্ত বউনি হয়নি অফিসপাড়ার আখতার হোসেনের। ওল্ড কোর্ট হাউস স্ট্রিটে ফুটপাথের লস্যি বিক্রেতা রাকেশ কুমার বছরের এই সময়টায় দিনে চার-পাঁচ হাজার টাকার লস্যি বিক্রি করেন। গত মঙ্গলবার নোট বাতিলের পরে দিনে আয় হচ্ছে ৫০০-৭০০ টাকা। নোটের গেরোয় বিক্রি কমেছে ডাব বিক্রেতা রামপ্রসাদ দামেরও। দিনে গড়ে ৯০০ টাকা থেকে বিক্রি কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০০ টাকায়। রামপ্রসাদ বলেন, ‘‘নোটের সমস্যায় কেউ মাল কিনতে চাইছেন না। অনেকে পুরনো ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট দিতে চাইছেন। অনেকের কাছে পর্যাপ্ত খুচরো না থাকায় ডাব কিনছেন না।’’ গত কুড়ি বছর ধরে বাচ্চাদের খেলার সরঞ্জাম বেচেন বনগাঁর বাসিন্দা শ্যামসুন্দর সাহা। তাঁর কথায়, ‘‘গড়ে হাজার টাকার মতো বিক্রি হতো আগে। নোট বাতিলের পর থেকে বেচাকেনা তিনশোয় নেমেছে।’’

অফিসপাড়ায় খাবারের দোকানগুলোতেও নোট বাতিলের প্রভাব। বিশেষত ফুটপাথে সস্তায় ভাতের দোকানগুলিতে বিক্রির হার তুলনায় কম। ফল বিক্রেতা নুর আহমেদ জানালেন, ‘‘মেছুয়া বাজারে বেচাকেনা এখন প্রায় বন্ধ। পুরনো মালই বিক্রি করছি। কিন্তু তা বেচার লোকও পাচ্ছি না।’’

এ দিকে, গত সাত দিন ধরে খুচরো টাকার সমস্যায় বাজারগুলিতে টানাপড়েনের মধ্যেই নতুন বিপদ জাল নোট নিয়ে গুজব। পুরনো টাকা নয়, গত ৯ নভেম্বর থেকে বাজারে বার হওয়া দু’হাজার নোট পর্যন্ত জাল হয়ে গিয়েছে— এমন গুজবে তোলপাড় পাইকারি বাজারগুলো। বুধবার দুপুরে নতুন দু’হাজার টাকার নোট হাতে পেয়েই আলোর দিকে তুলে ধরলেন কোলে মার্কেটের এক আড়তদার। তার পরে টাকার দু’প্রান্ত ঘষে ঢোকালেন টাকার বাক্সে। টাকার দু প্রান্ত ঘষলেন কেন? ওই আড়তদারের জবাব, ‘‘শুনেছি বাজারে দু’হাজার টাকার জাল নোট বেরিয়ে গিয়েছে। গোলাপি রং করা। নোটটা ঘষে দেখছিলাম রং আসল না নকল।’’

জাল নোট ঠেকাতে পাঁচশো-হাজারের টাকার নোট বাতিলের ঘোষণার পরে বাজারে আনা হয়েছে নতুন ওই দু’হাজার টাকার নোট। সত্যিই কি এত তাড়াতাড়ি তা জাল করা সম্ভব?

ব্যাঙ্ককর্তারা বলছেন, সম্ভব নয়। তবে কি যা রটছে, তা স্রেফ গুজব?

কোলে মার্কেটের এক ব্যবসায়ী বললেন, ‘‘চেষ্টা যে একটা হচ্ছে, তার প্রমাণ পেয়েছি। তবে এত কাঁচা হাতের কাজ যে, আমরাই ধরে ফেলেছি।’’

কী ভাবে? ব্যবসায়ীরা বললেন, ‘‘সোমবারই বৈঠকখানার মশলা বাজারে চারটি নতুন দু’হাজার টাকার ফোটোকপি নিয়ে আসা এক ব্যক্তিকে ব্যবসায়ীরা ধরে ফেলেছিলেন বলে শুনেছি। তার পর থেকে তাঁরা সতর্ক। পরে অবশ্য পুলিশের হাতে না দিয়ে ওই ব্যক্তিকে ছেড়ে দেন ব্যবসায়ীরাই।

তবে পুলিশের বক্তব্য, এক শ্রেণির লোক ২০০০ টাকার জাল নোটের গুজব ছড়িয়ে ব্যবসায়ীদের বিভ্রান্ত করত চাইছে। নতুন দু’হাজারি নোট নিশ্চিন্তে ব্যবহার করা যাবে বলে জানানো হয়েছে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের তরফেও। পুলিশের ধারণা, ব্যবসা ভাল চলছে না, তাই সামান্য গুজবেই উত্তেজিত হয়ে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা। বেচাকেনা ভাল হলে তাঁরা এ সবে কান দেওয়ার ফুরসতই পেতেন না বলে মনে করছে পুলিশ।

banned currency
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy