দু’দফায় কেমো চলেছিল প্রায় আট মাস করে। হাসপাতাল-বাস ছিল তারও বেশি সময়। রক্তের কর্কট রোগের সঙ্গে আড়াই বছর ধরে চলা ‘যুদ্ধ’ এখনও শেষ হয়নি। নিয়মিত চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে থাকতে হয়। ভর্তি থাকতে হয় হাসপাতালেও। আগামী সপ্তাহে রয়েছে কেমো দেওয়ার দিন। যদিও এর পরেও কর্কট রোগের কাছে হার মানেনি একরত্তি। থেমে না থেকে ‘হার না মানা’র পাঠ দিতে, অন্য আক্রান্তদের কাছে উদাহরণ তৈরি করতে সে হাজির হল মঞ্চে। কর্কট রোগ থেকে সেরে ওঠা অন্যদের সঙ্গেই এক মঞ্চে নৃত্য পরিবেশন করল চার বছরের শ্রেয়ান পাত্র।
কর্কট রোগে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘লাইফ বিয়ন্ড ক্যানসার’ আয়োজিত যষ্ঠ বার্ষিক অনুষ্ঠান ছিল রবিবার। রবীন্দ্র সদনের মঞ্চে একরত্তি শ্রেয়ান শুধু নয়, অনুষ্ঠানে নৃত্য পরিবেশন করেন কর্কট রোগকে হার মানানো আরও ছ’জন। ওই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার তরফে পার্থ সরকার বললেন, ‘‘ক্যানসার শব্দটা শুনেই অনেকে ভেবে নেন, সব শেষ। কিন্তু সব কিছু যে এখানেই শেষ নয়, তারই উদাহরণ এরা।’’ তিনি জানান, শহরের তিনটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তাঁদের সহায়তা কেন্দ্র রয়েছে। কর্কট রোগের চিকিৎসা যাতে কোনও ভাবে মাঝপথে থেমে না যায়, তা দেখাই তাঁদের মূল লক্ষ্য। পার্থের কথায়, ‘‘কাজ করতে গিয়ে অনেক চ্যালেঞ্জ আসে। কিন্তু সব চ্যালেঞ্জ পেরিয়েই ক্যানসার জয়ীদের মতো এগিয়ে যাওয়া আমাদের লক্ষ্য।’’
এ দিনের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে ভদ্রেশ্বর থেকে বাবা-মায়ের হাত ধরে এসেছিল চার বছরের শ্রেয়ান। শ্রেয়ানের মা সুপ্রিয়া জানালেন, ছেলের যখন প্রথম রক্তের কর্কট রোগ ধরা পড়ে, তখন তার বয়স ছিল এক বছর ছ’মাস। ঠিক মতো কথা বলতেও পারত না। মাঝেমধ্যেই ওর সর্দি-কাশি হত। এক বার হলে সারতেই চাইত না। জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ঘোরার পরে সেখান থেকে শ্রেয়ানকে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। এর পরে কলকাতা মেডিক্যালে ভর্তি করে বিভিন্ন পরীক্ষার পরে ওর রক্তের কর্কট রোগ ধরা পড়ে। সুপ্রিয়ার কথায়, ‘‘প্রথম দফায় ওকে আট মাস ধরে কেমো দিতে হয়েছিল। এর কয়েক মাস পরে আবার ক্যানসার ফিরে আসে। তখন আবার দ্বিতীয় দফায় আট মাস কেমো দেওয়া হয়। পরে ওর বুকে একটি সংক্রমণে ক্যানসার ধরা পড়ে। আপাতত সেই চিকিৎসা চলছে। আপাতত ও আগের থেকে অনেক সুস্থ।’’
জানা গেল, আগামী সপ্তাহের সোমবার ও বুধবার শ্রেয়ানের কেমো দেওয়ার দিন ঠিক হয়ে আছে কলকাতা মেডিক্যালে। যদিও কেমোর যন্ত্রণা, ঝক্কি টলাতে পারেনি একরত্তিকে। এ দিন প্রেক্ষাগৃহের গ্রিনরুমে শ্রেয়ান ব্যস্ত ছিল নাচের সাজ সাজতে। সেই সাজের ফাঁকে তাকে মঞ্চে ওঠার আগে ভয় করছে কিনা জিজ্ঞাসা করতেই উত্তর দিল, ‘‘কিসের ভয়? বাড়িতে কত বার অনুশীলন করেছি জানো!’’
শুধু শ্রেয়ান নয়, কর্কট রোগকে হারিয়ে আরও ছয় কিশোর-কিশোরী এ দিনের অনুষ্ঠানে নাচে অংশ নিল। এ দিনের নাচের জন্য কর্কট রোগ জয়ীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত এবং তাঁর নৃত্যগোষ্ঠী। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অভিনেত্রী নিজেও। অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করেন আরমান রাশিদ খান। দর্শকাসনে ছিলেন কর্কট রোগে আক্রান্তদের অভিভাবকের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)