এক দিকে আইন এড়ানোর প্রবণতা। অন্য দিকে প্রলোভনের হাতছানি। এই দুইয়ে মিলে সরকারি হাসপাতালে ওষুধ সংস্থার মৌরসিপাট্টা এখনও কায়েম।
এক দিকে, নির্দেশিকা জারি করে সরকারি হাসপাতালগুলিতে মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভদের যাতায়াত নিয়ন্ত্রিত করেছে স্বাস্থ্য দফতর। অন্য দিকে, ওই সব ওষুধ সংস্থা এখনও ডাক্তারদের বেড়াতে নিয়ে যাওয়া, মূল্যবান উপহার দেওয়ার ‘অভ্যাস’ বহাল রেখেছে। ফলে ঘুরপথে নিয়ম ভাঙার ট্র্যাডিশন চলছেই।
সম্প্রতি কলকাতার কয়েকটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসায় নড়েচ়়ড়ে বসেছেন স্বাস্থ্যকর্তারা। স্থির হয়েছে, এই সব ক্ষেত্রে ডাক্তারদের আচরণবিধি কী হওয়া উচিত, তা নিয়ে নির্দেশিকা জারি হবে।
দিন কয়েক আগে এসএসকেএমের কয়েক জন চিকিৎসক মুম্বই-গোয়া বেড়াতে গিয়েছিলেন। অভিযোগ, তাঁদের বেড়ানোর খরচ বহন করেছে একটি ওষুধ সংস্থা। ওই সংস্থার এক কর্তা বলেন, ‘‘আমাদের যা কাজ, আমরা সেটা করছি। ডাক্তারদের নীতি-নৈতিকতা বোধ তো তাঁরা নিজেরা ঠিক করবেন। বেড়াতে যাওয়া, পানভোজন কোনওটাই বাদ থাকেনি।’’ অভিযোগ, কলকাতারই আর এক মেডিক্যাল কলেজের কয়েক জন ডাক্তারকে সদ্য উদয়পুরের বিলাসবহুল রিসর্টে ঘুরিয়ে এনেছে একটি সংস্থা। ওই সংস্থার এক কর্তার মন্তব্য, ‘‘আগে আমরা কথায়-কথায় বিদেশ নিয়ে যাওয়ার কথা বলতাম। এখন ন্যায্য মূল্যের দোকান, জেনেরিক ওযুধ, ফ্রি পরিষেবার চক্করে পড়ে ব্যবসা অনেকটাই মার খাচ্ছে। তাই দেশের মধ্যেই নিয়ে যাচ্ছি।’’
কিন্তু এখন তো স্বাস্থ্য দফতরের নিয়ম অনুযায়ী, নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের পরিবর্তে চিকিৎসকদের জেনেরিক নামে ওষুধ লেখার কথা। পাশাপাশি, সরকারি হাসপাতালে এখন সমস্ত ওষুধই হাসপাতালের ফার্মাসি থেকে নিখরচায় পাওয়ার কথা। ফলে নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের ওষুধ কেনার প্রশ্নই নেই। নিয়ন্ত্রিত হয়ে গিয়েছে মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভদের হাসপাতাল চত্বরে যথেচ্ছ ঘোরাফেরারও।
তবে কেন খরচ করছে সংস্থাগুলি?
বেশ কয়েকটি সংস্থার সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, সরকারি নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এখনও বহু ডাক্তার ব্র্যান্ডের নাম লিখছেন। প্রেসক্রিপশনে না লিখে সাদা কাগজে ওষুধের নাম লিখে বাইরে থেকে কিনে আনতেও বলছেন। এই ডাক্তারেরাই এখন ভরসা ওই সব সংস্থার। তাঁরা নিয়ম ভাঙছেন বলেই ওষুধ সংস্থাগুলি তাঁদের সামনে ‘টোপ’ দেওয়ার সাহস পাচ্ছে।
স্বাস্থ্যকর্তারা মানছেন, এক দিকে যেমন নিয়মের বজ্র আঁটুনি, তেমনই অন্য দিকে ঘুর পথে নিয়ম ভাঙার এই প্রবণতা। সব মিলিয়ে অসাধু চক্রকে ভাঙা যাচ্ছে না কিছুতেই।
স্বাস্থ্য-শিক্ষা অধিকর্তা সুশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায় স্বীকার করেছেন, ওষুধ সংস্থাগুলির সঙ্গে ডাক্তারদের একাংশের ‘অতি সুসম্পর্ক’ নিয়ে তাঁরা নাজেহাল। এ ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘‘সর্ষের মধ্যেই যে ভূত, তা আমরা জানি। স্বাস্থ্য ভবনে বসে লাঠি হাতে সেই ভূত তাড়ানো কতটা সম্ভব, তা জানি না। তবু চেষ্টা করে যাচ্ছি। গরিব মানুষকে পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু চিকিৎসক বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছেন। এই দিকটা রুখতেই হবে।’’
যদিও সরকারের এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ করেছেন মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভরা। তাঁদের ইউনিয়নের তরফে এ নিয়ে স্মারকলিপিও দেওয়া হয়েছে স্বাস্থ্য ভবনে। এ বার সংগঠনের কর্তাদের হুমকি, প্রয়োজনে তাঁরা আইনের পথে যাবেন। ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিক্যাল অ্যান্ড সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভ ইউনিয়নের সম্পাদক দেবব্রত মজুমদার বলেন, ‘‘আমরা স্বাস্থ্যকর্তাদের বারবার বলছি, বিষয়টি আপনারা ডাক্তারদের উপরেই ছেড়ে দিন। তাঁরা ঠিক করুন, তাঁরা কী প্রেসক্রিপশন লিখবেন। আমরা তো তাঁদের জোর করছি না। তা ছাড়া সেলস প্রোমোশন-এর সংশ্লিষ্ট আইনেও রয়েছে যে আমরা হাসপাতাল, নার্সিংহোম, ক্লিনিকে প্রোমোশনে যেতে পারব। সরকার তা বন্ধ করতে পারে না।’’
ওষুধ সংস্থার কাছ থেকে চিকিৎসকদের উপঢৌকন নেওয়া নিয়ে আগেই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল মেডিক্যাল কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া (এমসিআই)। তাদের যুক্তি ছিল, ওষুধ সংস্থার কাছ থেকে উপহার নিলে ডাক্তারদের উপরেও পরোক্ষভাবে সেই সংস্থার ওষুধ প্রেসক্রিপশনে লেখার ব্যাপারে বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। ফলে বহু সময়েই এমন ওষুধ তাঁরা লেখেন, যা না খেলেও চলে কিংবা যার চেয়ে কম দামের ওষুধ বাজারে সহজেই পাওয়া যায়। যদিও এমসিআই-এর সেই নিষেধাজ্ঞার পরেও ডাক্তারদের একটা বড় অংশই তা মানে না। শুধু বেসরকারি নয়, সরকারি ডাক্তারদের একটা অংশও নিয়মিত নানা উপঢৌকন নিয়ে থাকে।
শুধু উপহার নয়, ইন্টার্নশিপ শেষ হওয়ার পরে ওষুধ সংস্থার টাকায় হাসপাতাল খালি করে জুনিয়র ডাক্তাররা বেড়াতেও যান প্রতি বছর। প্রতি বছরই এ নিয়ে স্বাস্থ্যকর্তারা সমালোচনাও করেন। কিন্তু তার পরেও কোনও বছরই এটা বন্ধ করা যায় না। এ ক্ষেত্রেও তেমনই হবে কি না, আপাতত সেটাই দেখার।