Advertisement
E-Paper

পার্বণী পানীয়ে ঘরোয়া ছোঁয়া

বছরের এই সময়টায় লরা আন্টির বাড়ি গেলে অরেঞ্জ ওয়াইন আর প্লাম কেক জুটতই। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকে আর বড়দিনে দেখা হয় না সেই লরা আন্টির সঙ্গে। আসানসোলে ওয়াইন-কেকের সংসার আগলে রয়ে গেলেন লরা জেমস্‌ আর মেধাবী তানিয়া কর পড়াশোনা শেষ করে যোগ দিলেন কর্পোরেট জগতের দৌড়ে।

সুচন্দ্রা ঘটক

শেষ আপডেট: ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮ ০০:৩৮
ফলের রস ও বরফের ছোঁয়ায় পানীয় প্রাণ পাবে এ বার বড়দিনে। ছবি: পিক্সঅ্যাবে।

ফলের রস ও বরফের ছোঁয়ায় পানীয় প্রাণ পাবে এ বার বড়দিনে। ছবি: পিক্সঅ্যাবে।

বছরের এই সময়টায় লরা আন্টির বাড়ি গেলে অরেঞ্জ ওয়াইন আর প্লাম কেক জুটতই। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকে আর বড়দিনে দেখা হয় না সেই লরা আন্টির সঙ্গে। আসানসোলে ওয়াইন-কেকের সংসার আগলে রয়ে গেলেন লরা জেমস্‌ আর মেধাবী তানিয়া কর পড়াশোনা শেষ করে যোগ দিলেন কর্পোরেট জগতের দৌড়ে। ঘুরলেন দেশ-দুনিয়া। তবু ডিসেম্বরের হাওয়াটা বারবার ফিরিয়ে আনত কমলালেবুর ঘ্রাণে মগ্ন টলমল সেই রঙিন পানীয়ের স্মৃতি!

ইউরোপে এক ক্রিসমাস মার্কেটে গিয়ে তানিয়া দেখেছিলেন, শুধু কমলা লেবু নয়, চেরি, আঙুর, রাস্পবেরি, ব্ল্যাকবেরি মতো কত ফল দিয়েই সেখানকার বিভিন্ন বাড়িতে তৈরি হয় ওয়াইন। তা আবার স্টলে বিক্রিও করতে আসেন সেখানকার মানুষজন। বছর দশেক পরে হঠাৎ লরা আন্টির ইউরোপীয় সংস্করণদের দেখে তানিয়ারও ইচ্ছে হয় নতুন কিছু শেখার। একটি আর্ন্তজাতিক ব্যাঙ্কের সিনিয়র ম্যানেজার তানিয়া বলছিলেন, ‘‘সেই থেকে একটু একটু করে বিভিন্ন ফল দিয়ে বাড়িতে ওয়াইন বানানো শুরু করি। আমার বাড়িতে বড়দিনের সময়ে কেউ এলেও এখন কমলালেবুর ওয়াইন পান।’’ তাঁর বানানো ওয়াইন বিক্রির চিন্তা এখনও না করলেও, আরও বিভিন্ন রকমের ফলে ওয়াইন বানানোর রেসিপি রপ্ত করার চেষ্টায় আছেন তানিয়া।

কখনও বিদেশ কিংবা ভিন্‌ রাজ্য থেকে কেনা নামী ব্র্যান্ডের পানীয়, কখনও বা বো ব্যারাকের কোনও অ্যাংলো গিন্নির হাতে বানানো রেড ওয়াইন— এই সব নিয়ে বছরের পর বছর আনন্দেই বড়দিন কাটিয়েছেন এ শহরের বাঙালি। দিন বদলের সঙ্গে ‘হোমমেড’ তকমার জেল্লা বাড়তেই ওয়াইন সংস্কৃতিতেও নিজস্ব ছোঁয়া দিতে উৎসাহী এখন বহু মধ্যবিত্ত বাঙালি। কয়েক জন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা মিলে একটি ওয়াইন তৈরির দল বানিয়েছিলেন বছর কয়েক আগে। মাঝেমাঝেই তাঁদের কারও বাড়িতে বসত ওয়াইন তৈরির আড্ডা। আঙুর, কলা, কালো জাম, আম— এক এক মরসুমে এক এক রকমের ফল থাকত সেই ওয়াইন কেন্দ্রিক আড্ডায়। এখন নানা কাজে নিয়মিত ওয়াইন মেকার্স আড্ডা না বসলেও, নিজ নিজ ড্রয়িং রুমে আপ্যায়নের জন্য তরলটুকু নিজেদের হাতে মনেরমতো করেই বানিয়ে রাখতে পছন্দ করেন তাঁরা। গরমের ফল আর শীতের ফল ঘিরেই বসত মূলত ওয়াইন তৈরির আড্ডা। তাঁদেরই এক জন সোমা মুখোপাধ্যায় জানান, এখনও মাঝেমাঝেই মরসুমি ফলের ওয়াইন বানানোর নামে জমায়েত হয় তাঁদের। গরমের সময়ে যেমন আম সকলের পছন্দের। এক দিন বসে একসঙ্গে বেশ কয়েক কিলোগ্রাম আম ছাড়িয়ে, আঁটি আলাদা করে তা ভাল করে গুলে চিনি আর সামান্য ইস্ট দিয়ে রেখে দেওয়া হয়। তার পরে টানা বেশ কিছু দিন অন্ধকার ঘরে একটি বিশাল পাত্রে জিরোয় সেই ফলের কাই। মাস খানেক পরে আবার দেখা করার পালা। একসঙ্গে ফের হইচই। এ বার এক দফা ছেঁকে বার করা হয় খানিকটা তরল। এ ভাবেই দফায় দফায় চলে আড্ডা আর ওয়াইন বানানোর পালা। গোটা প্রক্রিয়া শেষ হতে লাগে অন্তত খান চারেক বৈঠক।

পেশায় স্কুল শিক্ষিকা মৃত্তিকা সিংহ আবার একা নিজের দক্ষিণ কলকাতার বাড়িতে বসেই অবসরযাপনের নামে মাতেন ওয়াইন গবেষণায়। ওয়াইন বানানোর দলের কথা জেনে খুবই উৎসাহী হলেন তিনি। বলেন, ‘‘আগে মায়েদের একসঙ্গে গোল করে বসে পিঠে-পুলি, নাড়ু-মোয়া বানাতে দেখতাম। ওঁদের আড্ডার কথা শুনে মনে হচ্ছে ধীরে ধীরে আপন হয়ে যাচ্ছে ঘরে ওয়াইন তৈরির সংস্কৃতিও।’’ মৃত্তিকা জানান, বৌবাজার অঞ্চলে বড় হওয়া সহকর্মী শিলা গোমসের কাছে প্রথম বাড়িতে তৈরি ওয়াইন চেখেছিলেন। ওঁর থেকে জেনে একটু একটু করে নিজে বানাতে শুরু করেন। এই শিক্ষার অঙ্গ হিসেবেই প্রতি বছর শীতের সময়টায় বো ব্যারাকের নানা বাড়িতে ঢুঁ দেন মৃত্তিকা। সেখানকার বিভিন্ন ঘরে তৈরি জিঞ্জার ওয়াইন তাঁর বিশেষ প্রিয়।

ঘরে বানানো ফলের ওয়াইন এখনও বিক্রি করেন না এঁরা কেউই। তবে নিজের বানানো নুডল্স, চিকেনের মতোই অতিথিকে ‘স্বপাক’ ওয়াইনের স্বাদটুকু দিতে ভালবাসেন তাঁরা।

Homemade wine Fruit Wine Christmass
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy