Advertisement
E-Paper

পিসি হোক বা জেঠু, উন্নতির পথে রেয়াত করেনি কাউকেই! পাপাই থেকে দেবরাজ, দুর্নীতির গোড়ায় যেতে সিট গড়ল পুলিশ

বাগুইআটি, জ্যাংড়া এলাকার মানুষের স্মৃতিতে এখনও স্পষ্ট, আজকের দেবরাজ এক যুগ আগেও এলাকার একজন সাদামাঠা মিষ্টভাষী যুবক হিসাবে পরিচিত ছিলেন। কী ভাবে বদলে গেলেন তিনি?

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৩ জুলাই ২০২৬ ১৫:০২
How TMC Leader Aditi Munshi Husband Came Under the SIT Probe in Alleged Corruption Case

দেবরাজ চক্রবর্তী। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

আপনার বাড়ি ঠিক কোথায়? কিছু দিন আগে কেউ প্রশ্ন করলে একসময় বাগুইআটির পাপাই ‘ল্যান্ডমার্ক’ হিসাবে বলতেন ডায়মন্ড কোচ অমল দত্তের বাড়ির কথা। সেই পাপাইয়ের বাড়িই এখন বাগুইআটি এলাকার মানুষের কাছে অন্যতম ‘ল্যান্ডমার্ক’! সৌজন্যে পাপাই ওরফে বিধাননগর পুরনিগমের প্রাক্তন মেয়র পারিষদ দেবরাজ চক্রবর্তীর গত এগারো বছরে রকেটগতিতে রাজনৈতিক উত্থান এবং তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ।

সেই দুর্নীতির তদন্ত করতে বিধাননগর পুলিশ তৈরি করেছে বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট। নেতৃত্বে এক ডিসি পদমর্যাদার আধিকারিক। তদন্তকারী দলে রয়েছেন এমন আধিকারিক, যাঁকে একসময় দেবরাজের কথা না-শোনায় ভিজিল্যান্সে বদলি করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ।

দেবরাজের বিরুদ্ধে তোলাবাজি, সংগঠিত অপরাধে মদত দেওয়া এবং অবৈধ পথে বিপুল সম্পত্তি করার অভিযোগের তদন্ত করছে পুলিশ। প্রকাশ্যে এসেছে, গত পাঁচ বছরে কী ভাবে দেবরাজ এবং তাঁর স্ত্রী রাজারহাট, নিউটাউন, ভিন্‌‌রাজ্যে একের পর এক সম্পত্তি কিনেছেন। পুলিশের পাশাপাশি বিপুল সম্পত্তির অর্থের উৎস খুঁজতে তদন্তের জন্য তৈরি হচ্ছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট। রাজারহাট গোপালপুর বিধানসভার বিজেপি বিধায়ক তরুণজ্যোতি তিওয়ারির অভিযোগ, ১৩০০ কোটির সম্পত্তি তৈরি করেছেন দেবরাজ। নির্বাচনী হলফনামায় দেবরাজের স্ত্রী অদিতি মুন্সি সম্পত্তি নিয়ে ভুল তথ্য দিয়েছেন বলেও অভিযোগ বিজেপি বিধায়কের। তদন্তকারীদের নজরে দেবরাজের সংস্থা ডিসি গ্লোবাল। টাকা পাচারে এই সংস্থাকে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ।

বাগুইআটি, জ্যাংড়া এলাকার মানুষের স্মৃতিতে এখনও স্পষ্ট, আজকের দেবরাজ এক যুগ আগেও এলাকার একজন সাদামাঠা মিষ্টভাষী যুবক হিসাবে পরিচিত ছিলেন। ওই এলাকাতেই তখন বাস বর্তমানে তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ দোলা সেন এবং পূর্ণেন্দু বসুর। ২০১১ সালে বিধানসভা নির্বাচনে রাজারহাট গোপালপুর আসন থেকে জিতে মন্ত্রী হন পূর্ণেন্দু। এলাকার পুরনো তৃণমূল কর্মীদের কথায়, ‘‘দোলাদির সঙ্গে এলাকার বিভিন্ন কর্মসূচিতে থাকত দেবরাজ। দোলাদিকে পিসি বলে ডাকত। এর পর দোলাদির সুপারিশেই মন্ত্রী পূর্ণেন্দু বসুর আপ্তসহায়ক হয় দেবরাজ।’’

অভিযোগ, মন্ত্রীর আপ্তসহায়কের পরিচয় ব্যবহার করে দ্রুত নিজের রাজনৈতিক পরিধি বাড়াতে থাকেন দেবরাজ। বাগুইআটি এলাকার এক তৃণমূল কর্মীর কথায়, ‘‘মন্ত্রীকে ‘জেঠু’ বলে ডাকা দেবরাজ পূর্ণেন্দু বসুর কাছে কাউন্সিলর হওয়ার টিকিটের আবদার করে। কিন্তু সেই আবদার মানেননি দোলা-পূর্ণেন্দু।’’ তারপর থেকেই চিড় ধরে দেবরাজের সঙ্গে মন্ত্রীর সম্পর্কে।

এর মধ্যেই রাজারহাট-গোপালপুর পুরসভা বিধাননগর পুরনিগমের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। ওই এলাকায় দলের অন্দরে তখন প্রবল প্রভাবশালী দোলা এবং পূর্ণেন্দু। এ বারেও টিকিট না পেয়ে স্রোতের বিপরীতে হেঁটে কংগ্রেসে যোগ দেন দেবরাজ। পুরনিগমের সাত নম্বর ওয়ার্ড থেকে প্রার্থী হন। ভোটের দিনের আগের রাতেই গ্রেফতার করা হয় তাঁকে। ওই ভোটে বাগুইআটি এলাকা সাক্ষী ছিল বেনজির হিংসার। বোমা-গুলি থেকে শুরু করে ভিআইপি রোডে পুলিশের গাড়িতে আগুন— পুরোটাই ঘটে সেই সাত নম্বর ওয়ার্ডকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ, এই হিংসার নেপথ্যে ছিল কৈখালি মণ্ডলগাঁতি এলাকার কিছু ‘বাছাই করা’ সমাজবিরোধী। সাত নম্বর ওয়ার্ড থেকে শাসকদলের প্রার্থীকে হারিয়ে জয়ী হন কংগ্রেস প্রার্থী দেবরাজ। একার উদ্যোগে দেবরাজের ওই জয় তাঁর ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক জীবনেও টার্নিং পয়েন্ট বলে দাবি তৃণমূলের ওই এলাকার নেতাদের একাংশের। তখন দলের অন্দরেই সমান্তরাল দল বাড়ছে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের। জামিনে ছাড়া পেয়ে পুরপ্রতিনিধি হিসাবে শপথ নেওয়ার ছ’মাসের মধ্যেই খোদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে দেবরাজের তৃণৃমূলে যোগদান। সেই সময় থেকে তাঁর উত্থান হয় অপ্রতিরোধ্য গতিতে।

ক্যামাক স্ট্রিটের ক্ষমতার বৃত্তে আসার পরেই দেবরাজ ওই এলাকার রাজনীতিতে দোলা এবং পূর্ণেন্দু জুটির রাজনৈতিক প্রভাব খর্ব করতে উঠেপড়ে লাগেন বলে অভিযোগ। সেই সময় তৃণমূল-ঘনিষ্ঠ সমাজবিরোধী হিসাবে পরিচিত স্বপন থেকে শুরু করে বুড়োর খুন, খুনের মামলায় একসময়ের তৃণমূল কাউন্সিলরের ছেলে বাবাই বিশ্বাসের গ্রেফতারি— সবের পিছনেই এই ক্ষমতার লড়াইয়ের যোগ ছিল বলে দাবি তৃণমূলের অন্দরে। তত দিনে দেবরাজ ‘যুবরাজ’-এর ঘনিষ্ঠ বৃত্তে থাকা অন্যতম মুখ হিসাবে পরিচিত। নদিয়ার এক দাপুটে তৃণমূল নেতার ছেলের সঙ্গে দেবরাজের বন্ধুত্বও তখন চর্চায়।

এর মধ্যেই দলের অন্দরে এবং বাইরে ফের দেবরাজকে ঘিরে চর্চা শুরু হয় তাঁর বিয়ের দিন থেকে। রিয়্যালিটি শো-খ্যাত গায়িকা অদিতিকে বিয়ে করা নিয়ে যত না চর্চা, তার থেকে বেশি চর্চা ছিল ইকো পার্কে বিয়ের এলাহি অনুষ্ঠান ঘিরে। মাত্র কয়েক বছর কাউন্সিলর হয়ে কী ভাবে এত এলাহি আয়োজন, জল্পনা শুরু হয় দলের অন্দরে। তৃণমূলের একাংশের অভিযোগ, তখন থেকে বাগুইআটির নির্মাণ ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে অন্য ব্যবসায়ীদের কাছে স্পষ্ট বার্তা যায়, দেবরাজকে ‘খুশি’ না করলে এলাকায় ব্যবসা করা যাবে না।

জেলা রাজনীতিতেও যুব সভাপতি হিসাবে দেবরাজ কার্যত অভিষেকের ‘দূত’। ২০২১ সালে পূর্ণেন্দুকে পাকাপাকি ‘রাজনৈতিক বাণপ্রস্থ’-এ পাঠিয়ে টিকিট পেলেন দেবরাজের স্ত্রী অদিতি। নির্বাচনের পরে তৃণমূল থেকে দূরত্ব তৈরি করা এক প্রাক্তন কাউন্সিলর বলেন, ‘‘শুরু থেকেই আমরা জানতাম অদিতি রবার স্ট্যাম্প।’’

স্ত্রী বিধায়ক হওয়ার পরে দেবরাজের নাম উঠে আসে নির্বাচনোত্তর হিংসা মামলায়। সিবিআই তদন্ত শুরু হয়। তার দু’বছর পরে শিক্ষাক্ষেত্রে নিয়োগ দুর্নীতি মামলাতেও জড়িয়ে যায় দেবরাজের নাম। বাড়িতে তল্লাশি চালায় সিবিআই। দেবরাজ যদিও সমস্ত অভিযোগই অস্বীকার করেছেন।

কিন্তু পালাবদলের পর বাগুইআটি থানায় জমা হতে থাকে একের পর এক অভিযোগ। এর মধ্যে ছিল লক্ষ লক্ষ টাকা তোলাবাজির অভিযোগ। গ্রেফতার হতে থাকেন দেবরাজের ঘনিষ্ঠেরা। তারপর থেকে কার্যত বেপাত্তা দেবরাজের শেষপর্যন্ত হদিস মেলে পুরুলিয়া-ঝাড়খণ্ড লাগোয়া একটি নির্মীয়মাণ রিসর্টে।

পুলিশ সূত্রে খবর, ‘পাকা অপরাধী’র মতোই একের পর এক ডেরা পাল্টে থাকছিলেন দেবরাজ। প্রথমে উত্তরবঙ্গ, সেখান থেকে ঝাড়খণ্ড। কয়েকজন ঘনিষ্ঠও দেবরাজের সঙ্গে ছিলেন তাঁর এই অজ্ঞাতবাস পর্বে। তাঁদের গতিবিধির দিকেও নজর ছিল পুলিশের। মোবাইল বন্ধ ছিল আগাগোড়া। পুলিশ সূত্রে খবর, ভিন্‌রাজ্যে একাধিক ব্যবসায়ীর সঙ্গে যৌথ ভাবে বেশ কিছু সম্পত্তি করেছিলেন এই প্রাক্তন কাউন্সিলর। সেই ব্যবসায়ীদের মাধ্যমেই জোগাড় হচ্ছিল অজ্ঞাতবাসের খরচ। ফলে ব্যাঙ্কিং চ্যানেল থেকেও হদিস মিলছিল না। কিন্তু শেষপর্যন্ত এক সঙ্গীর গতিবিধি থেকেই খোঁজ মেলে দেবরাজের। ইতিমধ্যেই দেবরাজের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে মোবাইল, ল্যাপটপ উদ্ধার করেছে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে স্ত্রী তথা প্রাক্তন বিধায়ক অদিতিকেও। তদন্তকারীদের দাবি, বেশ কিছু ইলেকট্রনিক তথ্য ডিলিট করা হয়েছে। যেগুলি উদ্ধার করতে ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নেওয়া হবে। দেবরাজের তোলাবাজির টাকার ভাগ কোথায় কোথায় যেত, তা-ও পুলিশের তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

দলের অন্দরে প্রশ্ন, দেবরাজের এই কর্মকাণ্ডের কথা কি শীর্ষ নেতৃত্ব জানতেন না? জানলে ব্যবস্থা নেননি কেন?

Debraj Chakraborty TMC Councilor Aditi Munshi

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy