Advertisement
E-Paper

সদর দরজা হাট থাকলেও চুরি হয় না এখানে

আমার পাড়া ঝামাপুকুর লেন। পাড়া বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে রাজবাড়ির টানা বারান্দা, পঙ্খের কাজ করা ঠাকুরদালান, পাড়ার অলিগলির ঝলক আর অসংখ্য পরিচিত মুখ। কিছু নিজস্বতা নিয়েই গড়ে ওঠে পাড়ার চরিত্র আর বিশেষত্ব। সেটাই আসলে পাড়ার আত্মা, যা অন্য পাড়া থেকে আমার পাড়াটাকে স্বতন্ত্র করেছে।

রজতাভ মিত্র

শেষ আপডেট: ১২ মার্চ ২০১৬ ০১:৪৬

আমার পাড়া ঝামাপুকুর লেন। পাড়া বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে রাজবাড়ির টানা বারান্দা, পঙ্খের কাজ করা ঠাকুরদালান, পাড়ার অলিগলির ঝলক আর অসংখ্য পরিচিত মুখ। কিছু নিজস্বতা নিয়েই গড়ে ওঠে পাড়ার চরিত্র আর বিশেষত্ব। সেটাই আসলে পাড়ার আত্মা, যা অন্য পাড়া থেকে আমার পাড়াটাকে স্বতন্ত্র করেছে।

কেশবচন্দ্র সেন স্ট্রিট থেকে শুরু হয়ে সোজা গিয়ে বেচু চ্যাটার্জি স্ট্রিটে গিয়ে মিশেছে ঝামাপুকুর লেন। পাশেই সুবলচন্দ্র লেন। কিছুটা এগিয়ে আমহার্স্ট স্ট্রিট। অন্য দিকে বিধান সরণি। কাছেই ব্রজনাথ মিত্র লেন। ঝামাপুকুর শুধুমাত্র রাস্তার নাম নয়, এটা একটা বড় অঞ্চল।

পাড়ার সকালটা এখনও শুরু হয় চায়ের দোকানের উনুনের ধোঁয়ায়, খবরের কাগজওয়ালার বাড়ি বাড়ি কাগজ দেওয়া, কিছু পরে মিষ্টির দোকানে কচুরি-জিলিপি কিনতে আসা ক্রেতাদের ভিড়ে। বেলা বাড়তেই জীবনের দ্রুততায় মিশে যায় পাড়ার দিনযাপনের ছবিটা।

সময়ের সঙ্গে নানা পরিবর্তন এলেও, পাড়ার চরিত্র কিন্তু বদলায়নি। শান্তিপূর্ণ এ পাড়ায় আজও আছে আত্মিকতার এক বন্ধন। কারও বিপদে আপদে পড়শিরা নিঃস্বার্থে পাশে এসে দাঁড়ান। হারায়নি পাড়া-পড়শি সকলকে নিয়ে সুখে দুঃখে থাকার অভ্যেস। এ পাড়ার প্রত্যেকে প্রত্যেককে ব্যক্তি হিসেবে চেনেন, বাড়ি হিসেবে নয়।

সময়ের সঙ্গে উন্নত হয়েছে নাগরিক পরিষেবা। এখন নিয়মিত রাস্তা পরিষ্কার, জঞ্জাল সাফাই হয়। জোরালো আলো বছরভর ধরে রাখে উৎসবের আমেজ। নিয়ম করে মশার তেল ও ব্লিচিং ছড়ানো হয়। কাউন্সিলর সাধনা বসু এলাকার উন্নয়নে সচেষ্ট। তবে বাসিন্দাদের সচেতনতার অভাব রয়েছে। তাই সব সময় পাড়াটা পরিচ্ছন্ন থাকে না। বর্ষায় জল জমার সমস্যা এখনও বিব্রত করে। শুনছি, এবার নাকি ছবিটা বদলাবে। একটা কথা গর্ব করে বলতে পারি, এ পাড়ার নিরাপত্তা আজও সুরক্ষিত। সদর দরজা বেশির ভাগ সময়ে খোলা থাকলেও সচরাচর চুরির ঘটনা ঘটে না।

সময়ের সঙ্গে হারিয়েছে পাড়ার পরিচিত আড্ডাটা। আগে বেশির ভাগ বাড়ির সামনে ছিল রক। কালের প্রভাবে একে একে রকগুলি যেমন উধাও হয়েছে, তেমনই স্মৃতির খাতায় নাম লিখিয়েছে পাড়ার আড্ডা। এখনও কদাচিৎ পাড়ার গলির মুখে চেয়ারে বসে কিছু মানুষকে আড্ডা দিতে দেখা যায়। আগে বাড়ির সামনে একটা রকে বসত জমজমাট এক আড্ডা। সেখানে বসতেন মোহনবাগান ক্লাবের ফুটবলার হাবুল সরকার। আর আসতেন পাড়ার কালুবাবু, পলুবাবু, অমূল্যচরণ মিত্র। এখন পাড়ার যুব সম্প্রদায় আর রাস্তায় আড্ডা দিতে পছন্দ করে না। তাঁদের পছন্দ কফিশপ, ফুড-কোর্ট কিংবা সাধ্যের মধ্যে ছোটখাটো রেস্তোরাঁ। পুরনো বাসিন্দাদের মধ্যে ভাল যোগাযোগ থাকলেও কালের প্রভাবে পাড়ার ছেলেদের মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ এবং যোগাযোগের সময় নানা কারণে কমেছে। এখন উৎসবে অনুষ্ঠানে তাঁদের দেখা হয়।

ছিয়াশি বছরের পুরনো ঝামাপুকুর সর্বজনীন দুর্গোৎসবে পাড়ার সকলের আন্তরিক অংশগ্রহণ দেখে মনে হয় যেন একান্নবর্তী পরিবারের পুজো। পুজোকে কেন্দ্র করে যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে একটা হোয়্যাট্স অ্যাপ গ্রুপ আছে। পুজোয় নতুন কী করা যায় তা নিয়ে চলে চিন্তা-ভাবনার আদানপ্রদান। তেমনই পাড়ার দুর্গাপুজো কমিটির উদ্যোগে রথযাত্রাও বিশেষ উল্লেখযোগ্য। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে জগদ্ধাত্রী পুজোও।

পাঁচ পুরুষ ধরে এ পাড়ায় আমাদের বসবাস। গর্ব করে বলতে পারি আজও এটা আপাদমস্তক বাঙালি পাড়া। এ পাড়ায় অবাঙালিরাও যেন সেই প্রভাবে প্রায় বাঙালি হয়ে গিয়েছেন। এখনও রাতবিরেতে কেউ অসুস্থ হলে কাছাকাছির মধ্যে ডাক্তারদের খবর দিলে তাঁরা রোগীর বাড়িতে আসেন।

অনেকটাই কমেছে এ পাড়ায় খেলাধুলোর পরিবেশ। আগে গলির মুখে ছোটরা বল খেলত। কাছেই রয়েছে ঝামাপুকুর পার্ক আর কিছুটা দূরে হৃষীকেশ পার্ক। বিকেলে কিছু ছেলেদের সেখানে খেলতে দেখা যায়।

আজও ঝামাপুকুর লেনের ইট, কাঠ পাথরে কান পাতলে ইতিহাস ফিসফিস কথা কয়। এ পাড়ার ল্যান্ডমার্ক ঝামাপুকুর রাজবাড়ি। তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে শ্রীরামকৃষ্ণ ও রাজা দিগম্বর মিত্রের স্মৃতি। এ পাড়ায় রয়েছে ব্রাহ্ম বয়েজ স্কুল। সেই স্কুলে পড়তেন প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশ। আমাদের পাড়া ও বেচু চ্যাটার্জি স্ট্রিটের সংযোগস্থলে রয়েছে শ্যামসুন্দর জিউর মন্দির। কালের প্রভাবে এখানেও থাবা বসিয়েছে ফ্ল্যাট কালচার। আমার বাড়ির সামনে ওই যে বহুতল দাঁড়িয়ে, অতীতে এখানেই ছিল তারক ঘোষের বাড়ি। সে বাড়িতেই যাতায়াত ছিল মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও দীনবন্ধু মিত্রের। জনশ্রুতি, সেখানে বসেই ব্রজাঙ্গনা কাব্য লিখেছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। এ পাড়াতেই রয়েছে পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ড-এর অফিসটি।

বর্ণময় ছিল এ পাড়ার দোল। সকালে প্রতিবেশীদের সঙ্গে দোল খেলা আর মিষ্টি মুখ। সন্ধ্যায় দোলের গান গেয়ে শোভাযাত্রা বেরোতো। ধুতি পাঞ্জাবি পরে কপালে আবির দিয়ে নানা ধরনের যন্ত্রানুষঙ্গ সহকারে কার্বাইড ল্যাম্পের আলো নিয়ে আশেপাশের অঞ্চলে প্রদক্ষিণ করা হত। মনে পড়ছে একটা গান। ‘এসো এসো আজ কেন দূরে রবে, আবিরে কুমকুমে এসো রাঙা হবে...।’ সে সব কোথায় হারিয়ে গেল?

এখনকার মতো আগে বাড়িতে বাড়িতে টিভি আর ফোন ছিল না। পাড়ায় দু’একটি বাড়িতে টিভি থাকায় বিশ্বকাপ বা অন্য ম্যাচ দেখার আকর্ষণে পাড়া-পড়শি সেখানে ভিড় করতেন। তেমনই প্রয়োজনে প্রতিবেশীদের ফোনে খবর দেওয়া নেওয়া চলতই। তবে কেউ বিরক্ত হতেন না। সে কালে কালীপুজোর আগে বাড়ি বাড়ি তৈরি হত তুবড়ি, রংমশাল ইত্যাদি। তুবড়ি প্রতিযোগিতা হত পা়ড়ায়। বিশ্বকর্মা পুজোয় ঘুড়ি ওড়ানোর আকর্ষণও কম ছিল না। কেউ কেউ প্রতিবেশীদের সঙ্গে পয়সা দিয়ে বাজি লড়ে প্যাঁচ খেলতেন। সে সব স্মৃতি।

অতীতের বর্ণময় স্মৃতি আবছা হলেও ফিকে হয়নি পাড়া-পড়শির আন্তরিকতার রং। সেটা আজও উজ্জ্বল।

লেখক বিশিষ্ট শিক্ষক

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy