Advertisement
E-Paper

প্যাকেটে মরা বাচ্চা ‘দেখল’ কে? মুখে কুলুপ এঁটেছে কলকাতা পুলিশ

সোমবার দিনভর সেই একই কথা বললেন হরিদেবপুর থানার একাধিক আধিকারিক। সবারই দাবি তিনি দেখেননি। অন্য কেউ দেখেছেন। তবে কে যে ঠিক প্যাকেটের মুখ খুলে দেখেছেন তা কেউই বলতে পারলেন না।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ১৯:১২
সরেজমিন: হরিদেবপুরে ঘেরা জমিতে তদন্তকারীরা। রবিবার। —নিজস্ব চিত্র।

সরেজমিন: হরিদেবপুরে ঘেরা জমিতে তদন্তকারীরা। রবিবার। —নিজস্ব চিত্র।

প্রায় ২৪ ঘণ্টা কেটে গিয়েছে। তার পরেও হরিদেবপুরের হেঁয়ালির উত্তর খুঁজে পাননি খোদ পুলিশ কর্তারাই। আগাছা সাফ করতে গিয়ে উদ্ধার হওয়া ‘১৪টি প্লাস্টিকে মোড়া কেমিক্যাল ছড়ানো ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চার দেহ’হাসপাতালে পৌঁছতেই কীভাবে বড়দের ডায়াপার হয়ে গেল,সোমবার তা নিয়েই পুলিশ কর্তাদের মধ্যে দিনভর চলল চাপানউতোর।

এ ভাবে গোটা কলকাতা পুলিশকে হাস্যস্পদ করার দায়টা যে আদতে কার, সেটা ঠিক করাই মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে কর্তাদের কাছে।

শুরুটা করা যাক বাবাই বেরাকে দিয়ে। বালাসারিয়া গোষ্ঠীর নেওয়া এই ৭২ কাঠার জমিতে কাজ করা শ্রমিকদের ঠিকাদার। সোমবার তিনি বলেন,“চার-পাঁচ জন শ্রমিক ওখানে কাজ করছিল। তাদেরই একজনের নজরে আসে একটি প্লাস্টিকে মোড়া ছোট কোল বালিশের মতো জিনিস। কিছুক্ষণের মধ্যে ঠিক ওই রকম আরও কয়েকটা প্লাস্টিক পাওয়া যায়। তাই দেখে ওরা আমাকে জানায়। আমি ব্যান্ডেজের মতো জিনিস ভেতরে দেখতে পাই। তাতেই সন্দেহ হয়। প্যাকেটগুলোর যা মাপ, তাতে বাচ্চা বা ভ্রুণের মতো লাগছিল।”

বাবাই আর দেরি করেননি। বিষয়টি জানান বালাসারিয়া কর্তৃপক্ষকে। তাঁদের কাছেই খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছন স্থানীয় কাউন্সিলর সোমা চক্রবর্তী। খবর যায় হরিদেবপুর থানাতে। কাউন্সিলর থাকতে থাকতেই পৌঁছয় পুলিশ।রবিবারই কাউন্সিলর বলেছিলেন,“প্লাস্টিকের ব্যাগে সদ্যোজাত শিশুদের দেহ পাওয়া গিয়েছে।” সেটা কি তিনি নিজে দেখে বলেছিলেন? সোমবার অবশ্য তা নিয়ে মুখ খোলেননি সোমা। তবে ওখানে রবিবার উপস্থিত থাকা শ্রমিকরা অবশ্য বলছেন, ‘‘কাউন্সিলর আদৌ নিজে কিছু দেখেননি। তিনিও শ্রমিকদের কাছ থেকেই শুনেছেন।’’

ততক্ষণে ঘটনাস্থলে হরিদেবপুর থানার অফিসারদের নিয়ে হাজির খোদ ওসি। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, তিনি এবং তাঁর অফিসাররা কাউন্সিলরের কাছ থেকেই গোটা বিষয়টি শোনেন।পুলিশ কি প্যাকেটগুলো খুলে দেখেছিল? প্রশ্ন করা হয়েছিল বাবাইকে। তিনি বলেন,“আসলে তখন আমি ফোনে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলছিলাম। আমি দেখিনি।”

আরও পড়ুন: ভুল না ভানুমতীর খেল্‌? হরিদেবপুরে ‘ভ্রূণ’গুলো হয়ে গেল মেডিক্যাল বর্জ্য!

সোমবার দিনভর সেই একই কথা বললেন হরিদেবপুর থানার একাধিক আধিকারিক। সবারই দাবি তিনি দেখেননি। অন্য কেউ দেখেছেন। তবে কে যে ঠিক প্যাকেটের মুখ খুলে দেখেছেন তা কেউই বলতে পারলেন না। যেমন ঊর্ধ্বতন আধিকারিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলতে পারেননি ওসি দেবাশিস চক্রবর্তী। ঘনিষ্ঠদের তিনি বলেছেন, ততক্ষণে ঘটনাস্থলে পৌঁছে গিয়েছেন মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায়, পুলিশ কমিশনার, যুগ্ম কমিশনার (অপরাধ) এবং বিভাগীয় ডেপুটি কমিশনার। গোটা এলাকা তখন ভিভিআইপি জোন। তাঁদের সামলাতেই তখন ব্যস্ত ওসি।

আরও পড়ুন: খাটে বৃদ্ধের পচাগলা দেহ, পাশে শুয়ে স্ত্রী

শীর্ষ কর্তাদের নির্দেশে ততক্ষণে অ্যাম্বুল্যান্স চলে এসেছে। প্যাকেটগুলো সেখানে তোলা হয়। ময়নাতদন্তের জন্য চলে যায় এম আর বাঙুর হাসপাতালে।ওসি যাঁদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন, সেই পুলিশ কর্তারা কি নিজেরা দেখেছিলেন প্যাকেটের মুখ খুলে? সোমবার আর তা নিয়ে কেউ মুখ খোলেননি। কিন্তু, নিজেরা দেখলে যে এ ঘটনা ঘটত না সেটা তো স্পষ্ট।

আর এখানেই অবাক হচ্ছেন কলকাতা পুলিশের একাধিক আধিকারিক। তাঁদের একজন, দু’সপ্তাহ আগের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। চেতলা থানা এলাকায় এক ব্যক্তির অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়। স্থানীয় কিছু যুবক দাবি করেন, ওই ব্যক্তিকে তাঁর স্ত্রী খুন করেছে এবং মৃতের যৌনাঙ্গ কেটে দিয়েছে। কারণ, মৃতের পরনের হাফ প্যান্টে যৌনাঙ্গের কাছে চাপ চাপ রক্ত। সেদিন চেতলা থানার ওসি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে ঘটনাস্থলেই দেহ পরীক্ষা করে প্রমাণ করেন যে, ওই ব্যক্তি গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মঘাতী হয়েছেন। এবং গলায় ফাঁস দিলে যে ভাবে মল এবং বীর্য নিঃসরণ হয়, ঠিক তাই হয়েছে ওই ব্যক্তির। আর মলের সঙ্গে রক্ত বেরনোর জন্য পরনের প্যান্টে রক্ত। তার সঙ্গে খুন বা যৌনাঙ্গ কেটে দেওয়ার কোনও সম্পর্ক নেই।

কলকাতা পুলিশের একাধিক আধিকারিক সোমবার বলেন, সেদিন চেতলার ওসি বা অফিসাররা যেটা করেছিলেন, সেটাই স্বাভাবিক। কোনও ঘটনাস্থল পরিদর্শনের প্রথম কাজটাই হল গোটা বিষয়টি খুঁটিয়ে দেখা। তাঁরা সেই প্রসঙ্গেই বলেন, ক’দিন আগে হাওড়ার ডোমজুড়ে বস্তাবন্দি ব্যাঙ্ক কর্মীর খণ্ড খণ্ড দেহ পাওয়ার ঘটনা। এক পুলিশ অফিসার বলেন,“সেদিন কি সেখানকার পুলিশ বস্তা না খুলেই মর্গে পাঠিয়ে দিয়েছিল? সোমবার পুলিশের প্রথম কাজ ছিল, যে কোনও একটা প্যাকেট খুলে তাতে সাপ আছে না ব্যাঙ, সেটা দেখা। হতেও তো পারত, মানুষের বদলে অন্য কিছুর দেহ।”

রবিবার যে অফিসাররা ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন, তাঁদের একটা বড় অংশেরই কলকাতা পুলিশে দু’দশকের বেশি কাজ করার অভিজ্ঞতা। তাঁরা এ রকম ভুল কী করে করলেন? তা-ও আবার পুলিশ কমিশনারের উপস্থিতিতে— সেটাই ভাবাচ্ছে বাকিদের। যিনি এই কলকাতা পুলিশের ডেপুটি কমিশনার থেকে বিভিন্ন পদে ছিলেন দীর্ঘ দিন।

যদিও হরিদেবপুর থানার কয়েক জন আধিকারিকের দাবি, শ্রমিকরা যখন একটি প্যাকেটের মুখ খোলেন, তখন ব্যান্ডেজের মতো কাপড় দেখেই অনেক আধিকারিক বাকিটা আর খুলতে না করেছিলেন। তাঁদের দাবি, জল কাদাতে পড়ে থেকে ডায়াপার যে শিশুর দেহের অবয়ব নিতে পারে সেটা তাঁরা ভাবতেও পারেননি।

আরও পড়ুন: পেরিয়েছে ৪৮ ঘণ্টা, শিশু খুনে দুষ্কৃতীরা এখনও অধরা

তাঁদের এই ভুলটাকে যদিও সোজা ভাবে দেখতে রাজি নন স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ। তাঁদের কয়েক জনের সোজাসাপ্টা অভিযোগ, “কাল যেভাবে পুলিশ সাধারণ মানুষকে ধারে পাশে যেতেই দিল না, সেখান থেকেই আমাদের সন্দেহ হচ্ছিল। আমরা দূর থেকে ছবি তুলতে গেলেও আমাদের বাধা দিচ্ছিল পুলিশ। এত গোপনতা কিসের?”

যদিও এম আর বাঙুরের বিভিন্ন বিভাগের কর্মীই বলেছেন, ওই প্লাস্টিকে কিছুই ছিল না ডায়াপার ছাড়া। চিকিৎসকরা তাই পরীক্ষা করেও কিছু পাননি। আর তার পরেই ঘুম ভাঙে পুলিশ কর্তাদের। তবে পুলিশের এই ‘ভুল’ নিয়ে রহস্য দূর হচ্ছে না স্থানীয় মানুষদের। কারণ তাঁদের অভিযোগ, ওই জমিতে দিনেদুপুরে পুকুর ভরাট হলেও প্রশাসন ‘ভুল’ করে তা বন্ধ করতে আসেনি। তাঁদের ইঙ্গিতটা বেশ স্পষ্ট।

(কলকাতার ঘটনা এবং দুর্ঘটনা, কলকাতার ক্রাইম, কলকাতার প্রেম - শহরের সব ধরনের সেরা খবর পেতে চোখ রাখুন আমাদের কলকাতা বিভাগে।)

Haridevpur Kolkata Police Newborn Babies Post Mortem
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy