×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১৮ এপ্রিল ২০২১ ই-পেপার

এঁটেলের জোগানে টান, কপালে ভাঁজ কুমোরটুলির

আর্যভট্ট খান
০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৪ ০২:০০
কাজ চলছে কুমোরপাড়ায়।  ছবি: শৌভিক ভট্টাচার্য

কাজ চলছে কুমোরপাড়ায়। ছবি: শৌভিক ভট্টাচার্য

কুমোরটুলিতে আকাল এঁটেল মাটির।

মৃৎশিল্পীদের মতে, প্রতিমা তৈরির ভিত হল এই মাটি। প্রতিমার খড়ের কাঠামো তৈরি করার পরেই লাগে এঁটেল মাটি। এই মাটির মান খারাপ হলে খড়ের উপরে মাটির ‘চিট’ ভাল করে ধরে না। ফলে প্রতিমার মাটি আলগা হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। কিছু কিছু অংশ ফেটে যাওয়ারও সম্ভাবনা থাকে। প্রতিমা শিল্পীদের মতে, এমনিতেই কুমোরটুলিতে সহকারী শিল্পীর অভাব। ফলে কাজের গতি কম। সেই সঙ্গে ভাল এঁটেল মাটির জোগান কম হওয়ার জন্য কাজের মানের সঙ্গেও আপস করতে হচ্ছে।

পুজোর আর বাকি মাত্র এক মাস। কুমোরটুলিতে ব্যস্ততা তুঙ্গে। মৃৎশিল্পীরা জানালেন, এঁটেল মাটিকে তুষের সঙ্গে মিশিয়ে শক্ত করে খড়ের উপরে লাগানো হয়। তার উপরে দেওয়া হয় বেলে মাটির প্রলেপ। মাটি শুকিয়ে গেলে কোথাও যদি ফাটল দেখা দেয়, তা হলে আবার মাটি দিয়ে তা বন্ধ করা হয়। প্রতিমাশিল্পী অপূর্ব পাল বলেন, “প্রতিমা তৈরির প্রায় প্রতি স্তরেই এঁটেল মাটির প্রয়োজন। এই মাটির জোগান কমে গেলে প্রতিমার ভিতই নড়বড়ে হয়ে যায়। ফলে এই বছর বহু প্রতিবন্ধকতার সঙ্গেই কাজ করতে হচ্ছে।” প্রতিমাশিল্পীরা জানালেন, এক ঠেলা এঁটেল মাটির দাম এত দিন ছিল ৩০০ টাকা। এ বছর দামও বেড়েছে।

Advertisement

কুমোরটুলি মৃৎশিল্প সংস্কৃতি সমিতির মুখপাত্র বাবু পাল জানান, কুমোরটুলিতে ভাল এঁটেল মাটি আসে উলুবেড়িয়ার গঙ্গার পাড় থেকে। তিনি বলেন, “পুজোর আগে যেখানে প্রতি সপ্তাহে ৭-৮ নৌকা এঁটেল মাটি উলুবেড়িয়া থেকে কুমোরটুলিতে আসত, এ বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩-৪টি নৌকা। ডায়মন্ড হারবার থেকে মাটি আসছে, কিন্তু তার মান তত ভাল নয়। ফলে প্রতিমা তৈরির সময়ে মাটির জোর কমে যাচ্ছে।”

কুমোরটুলি প্রগতিশীল মৃৎশিল্প ও সাজশিল্প সমিতির কয়েক জন শিল্পীর মতে, এখন বহু পুজোয় থিমের প্রতিমা হয়। সেই প্রতিমার নানা কারুকাজ করতে গেলে ভাল মানের এঁটেল মাটি প্রয়োজন। না হলে প্রতিমায় চিড় ধরার সম্ভাবনা থাকে। তাঁরা জানাচ্ছেন, চিড় না ধরার জন্য এঁটেল মাটির সঙ্গে পাট মেশানো হয়। তবে ওই মাটি ভাল মানের না হলে পাটকুচি মিশিয়েও ঝুঁকি থেকে যায়। কুমোরটুলির আর এক শিল্পী তপন রুদ্র পাল জানালেন, প্রতিমা তৈরির বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন মাটির মিশ্রণ লাগে। বেলে মাটির সঙ্গে এঁটেল মাটি মিশিয়ে দো-আঁশ মাটি তৈরি হয়। তা লাগে প্রতিমার মুখ তৈরিতে। এর পরে ছুরি দিয়ে কেটে কেটে প্রতিমার চোখ-মুখ তৈরি করা হয়। দো-আঁশ মাটিতে এঁটেল মাটির অংশ কম থাকলে ঠাকুরের মুখ ফেটে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।” কুমোরটুলির আর এক শিল্পী বিশ্বনাথ পালের কথায়, “প্রতিমার বাহন তৈরিতে এঁটেল মাটির ব্যবহার খুব বেশি। তাই এই মাটির জোগান কম হলে কাজের গতি অনেক কমে যায়।”

কিন্তু কেন এই অভাব? প্রতিমা শিল্পীদের একাংশের মতে, ভাল এঁটেল মাটি পাওয়া যায় গঙ্গাপাড়ের মাটির কিছুটা নীচে। শিল্পীদের অভিযোগ, পারিশ্রমিক কম হওয়ায় মাটি কাটার লোক কমে যাচ্ছে। এ ছাড়া, ইটভাটায় ইট তৈরিতে লাগে এঁটেল মাটি। বহু ক্ষেত্রে ইটভাটার মালিকেরা ভাল এঁটেল মাটি বেশি দামে কিনে ইট তৈরিতে লাগাচ্ছেন। ফলে শুধু উলুবেড়িয়াতেই নয়, যেখানে যেখানে ভাল মানের এঁটেল মাটি পাওয়া যেত সার্বিকভাবেই সেখানে এই মাটি কম মিলছে।

Advertisement