Advertisement
E-Paper

বালি-পাথর পাচারে তিতিবিরক্ত হয়ে মাটি কাটতে বাধা! ডায়মন্ড হারবার বেঁকে বসায় দুশ্চিন্তায় কুমোরটুলি, দ্বারস্থ হল সরকারের

পুজোর মরসুম ধরে বছরে অন্তত ৫০০ লরি মাটি লাগে কুমোরটুলিতে। পুজোর চার-পাঁচ মাস আগে থেকে পুরোদমে প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। এ বার কিছুই করা যায়নি। পাওয়া যাচ্ছে না মাটি!

সারমিন বেগম

শেষ আপডেট: ১৭ জুন ২০২৬ ২৩:৪৬
কুমোরটুলিতে প্রতিমা গড়ার কাজে ব্যস্ত মৃৎশিল্পী।

কুমোরটুলিতে প্রতিমা গড়ার কাজে ব্যস্ত মৃৎশিল্পী। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

হাতে আর মাস চারেকও নেই। পুজোর ঢাকে কাঠি পড়ার দিন যত এগিয়ে আসছে, কুমোরটুলির অলিগলিতে ততই গাঢ় হচ্ছে চিন্তার মেঘ। শিল্পী আছেন, কারিগরেরা আছেন, মূর্তি তৈরির কাজও পড়ে আছে বিস্তর। কিন্তু মাটি নেই! কুমোরটুলিতে মাটির জোগান প্রায় এক মাস ধরে বন্ধ, দাবি সেখানকার কর্মচারীদের। প্রতিমা তৈরির জন্য বিশেষ ধরনের মাটি আসে ডায়মন্ড হারবার থেকে। অভিযোগ, তৃণমূল নেতাদের দুর্নীতির হদিস পেয়ে সেখানে মাটি কাটার কাজ বন্ধ করে দিয়েছে নতুন সরকার। মৃৎশিল্পীদের সংগঠনের তরফে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। মাটি আনার অনুমতিও মিলেছে। তবে এখনও সেই মাটি কুমোরটুলিতে পৌঁছোয়নি।

তৃণমূল আমলে বালি পাচার, কয়লা পাচার, গরু পাচারে পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতি প্রকাশ্যে এসেছে আগেই। পাচার নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। তৃণমূল ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সেই ক্ষোভ আর কেউ চেপে রাখছেন না। ডায়মন্ড হারবারের মাটি কাটার বিরুদ্ধেও তাই স্থানীয় স্তর থেকে গড়ে তোলা হচ্ছে প্রতিরোধ। সেখানকার মানুষ মাটি কাটতে দিচ্ছেন না। ফলে সমস্যায় পড়েছে কুমোরটুলি।

মূর্তি গড়ার কাজ চলছে কুমোরটুলিতে।

মূর্তি গড়ার কাজ চলছে কুমোরটুলিতে। —নিজস্ব চিত্র।

শিল্পীরা জানাচ্ছেন, পুজোর মরসুম ধরে বছরে অন্তত ৫০০ লরি মাটি লাগে কুমোরটুলিতে। পুজোর চার-পাঁচ মাস আগে থেকে পুরোদমে প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। জুনের এই সময়ে অন্যান্য বছরে মা দুর্গার মূর্তিতে মাটি দেওয়ার কাজও সম্পন্ন হয়ে যায়। কিন্তু এ বার তা হয়নি। শেষ বার মাটিবোঝাই লরি কুমোরটুলিতে ঢুকেছিল ভোটের আগে। সেখানে মাটি মজুত করে রাখার তেমন কোনও ব্যবস্থা নেই। খ়ড়ের কাঠামোতে মাটির প্রলেপ দিতে না পারলে কিছু দিনের মধ্যেই পরিশ্রম বৃথা হয়ে যায়। তাই শিল্পী ও কারিগরদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। অনেক কারিগরকে কুমোরটুলি ছেড়ে চলেও যেতে হয়েছে। কুমোরটুলি মৃৎশিল্পী সংস্কৃতি সমিতির যুগ্ম সম্পাদক বাবু পাল বলেন, ‘‘কেন মাটি আসছে না, প্রথমে বুঝিনি। কুমোরটুলি মৃৎশিল্পী সমিতির পক্ষ থেকে আমরা ডায়মন্ড হারবারে গিয়ে জানতে পারি, সেখানে সারদা গার্ডেন থেকে মাটি তোলা হয়েছে। স্থানীয় তৃণমূল নেতারা মাটি কেটে বিক্রি করেছেন বলে অভিযোগ। তাই নতুন সরকার মাটি কাটা বন্ধ করে দিয়েছে। আমরা মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি দিয়ে বিষয়টি জানাই। অর্থমন্ত্রী, স্থানীয় বিধায়ককেও জানিয়েছি। দু’এক দিনের মধ্যে মাটি চলে আসবে বলে আমরা আশাবাদী।’’

কুমোরটুলিতে তৈরি করে রাখা আছে মূর্তির কাঠামো।

কুমোরটুলিতে তৈরি করে রাখা আছে মূর্তির কাঠামো। —নিজস্ব চিত্র।

শুধু দুর্গা নয়, কালী, জগদ্ধাত্রীর মতো প্রতিমাও এখন থেকেই বানিয়ে রাখা হয় কুমোরটুলিতে। পুজোর মরসুম শুরু হয়ে গেলে আর কাজ শেষ করার সুযোগ থাকে না। অনেকে সেই মতোই কালী প্রতিমা গড়ার কাজে আগে হাত দিয়েছিলেন। কিছু তৈরিও আছে। কিন্তু হাতে পর্যাপ্ত মাটি না থাকায় প্রতিমা গড়ার নতুন ‘অর্ডার’ নিতে পারছেন না কুমোরটুলির শিল্পীরা। বাবুর কথায়, ‘‘অর্ডার নেওয়ার সাহস পাচ্ছি না। এক মাস পিছিয়ে যাওয়া মানে অনেকটা পিছিয়ে যাওয়া। আমার কাছে এখন ১০টা অর্ডার রয়েছে। দুশ্চিন্তায় আছি।’’

ফুরিয়ে এসেছে মাটি। উদ্বেগে শিল্পীরা।

ফুরিয়ে এসেছে মাটি। উদ্বেগে শিল্পীরা। —নিজস্ব চিত্র।

কুমোরটুলিতে ২০০টির বেশি দোকান রয়েছে। সেখানে পাঁচ শতাধিক শিল্পী কাজ করেন। সঙ্গে রয়েছেন সাড়ে তিন হাজারের বেশি কারিগর। তবে এই কারিগরদের সংখ্যা কমছে। মাটি না থাকায় অনেকেই ফিরে গিয়েছেন। বাকিরা আতঙ্কিত। নবদ্বীপের মানিক সাধুখাঁ তেমনই এক জন। বলেন, ‘‘মাটির অভাবে কাজ বন্ধ। আমাকেও হয়তো বাড়ি ফিরে যেতে হবে। পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে বাইরে কাজ খুঁজতে হবে।’’ মাটি যত দিন না আসছে, বাকি কাজ এগিয়ে রাখা যায় না? মানিক বলেন, ‘‘মূর্তি তৈরির প্রাথমিক পর্যায়ে খড় বাঁধার কাজ শেষ। কিন্তু এক সপ্তাহের মধ্যে এতে মাটি না দিলে খড় নরম হয়ে যাবে। তা আর মাটি দেওয়ার মতো অবস্থায় থাকবে না। তখন পুরো কাজটাই মাটি হয়ে যাবে।’’ পাশে বসে খড়ের কাঠামোয় হালকা মাটির প্রলেপ বোলাচ্ছিলেন অভিজিৎ পাল। তাঁর কথায়, ‘‘আমার কাছে যা মাটি আছে, টেনেটুনে এক দিনের কাজ হবে। কালী, লক্ষ্মী তৈরির কাজও বন্ধ আছে। মাটি না থাকলে কী করব? আবার মাটি এলে কাজ হবে। মাটি না এলে আর অর্ডার নেব না।’’ পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে অনেকে মাটির জন্য বাড়তি দাম চাইছেন বলেও অভিযোগ।

ছোটবড় মূর্তি গড়ার কাজে মজে কারিগরেরা।

ছোটবড় মূর্তি গড়ার কাজে মজে কারিগরেরা। —নিজস্ব চিত্র।

ডায়মন্ড হারবার থেকে মাটি আসা বন্ধ হওয়ায় কুমোরটুলি কেন অচল হয়ে পড়েছে? রাজ্যের আর কোথাও কি মাটি পাওয়া যায় না? কেন ওই অংশের মাটিই প্রয়োজন হয়? আসলে প্রতিমা গড়ার জন্য প্রয়োজন শক্ত এঁটেল মাটি। দেবীর মুখের গড়ন থেকে শুরু করে ‘ফিনিশিং টাচ’ কিংবা আঙুলের সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম কারুকার্য, আঠালো মাটি ছাড়া অসম্ভব। কারিগরেরা জানাচ্ছেন, কাঠামোয় খড় বাঁধার পর প্রথমে এক বার এঁটেল মাটির প্রলেপ দেওয়া হয়, যাতে কাঠামো শক্ত থাকে। তার পরে বালি মাটি বা গঙ্গার যে কোনও মাটি দেওয়া হয় প্রতিমায়। পরে আবার কাজ শেষ করা হয় এঁটেলে। আর এই বিশেষ মাটি ডায়মন্ড হারবারেই মেলে। কারণ, সেখানেই গঙ্গা গিয়ে মিশেছে সমুদ্রের সঙ্গে।

খড়ের কাঠামোয় মাটির প্রলেপ দিতে না পারলে পরিশ্রম বৃথা!

খড়ের কাঠামোয় মাটির প্রলেপ দিতে না পারলে পরিশ্রম বৃথা! —নিজস্ব চিত্র।

বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন নদী বিশেষজ্ঞ কল্যাণ রুদ্র। তাঁর মতে, মৃৎশিল্পীরা যে এঁটেল মাটি খোঁজেন, তা নদীর উজানের দিকে নয়, মোহনার কাছে পাওয়া যায়। নদীবাহিত মাটি একেবারে মিহি হয়ে আসে সমুদ্রের কাছে। কল্যাণের কথায়, ‘‘নদীর পলি বহন এবং সঞ্চয়ের মধ্যে একটা ছন্দ আছে। হরিদ্বারে যেখানে গঙ্গা প্রথম সমতলে নামল, সেখানকার মাটিতে কাঁকড়, বালি, পাথর পাওয়া যায়। তার পর নদী যত নীচের দিকে নেমেছে, সাগরের দিকে পলি তত সুক্ষ্ম হয়েছে। মৃৎশিল্পীরা তাই মোহনার কাছের মাটি চান। সেটা একমাত্র ডায়মন্ড হারবারেই পাওয়া যায়।’’ গঙ্গা ছাড়া অন্য কোনও নদীর মাটি এ ক্ষেত্রে কাজে লাগানো যাবে না বলে মনে করেন কল্যাণ। তিনি বলেন, “এটায় গঙ্গার মাটিই লাগবে। দামোদরের মাটিতে এই কাজ হবে না। কারণ, দামোদর বালি বহন করে। গঙ্গা ছাড়া অন্য যে শাখা নদীগুলি সাগরে মিশেছে, তাতে উজানের স্রোত বয় না। সেগুলির সঙ্গে গঙ্গার যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন। তাই একমাত্র হুগলি নদীর মোহনাতেই এই পলি পাওয়া যায়।’’

কপালে চিন্তার ভাঁজ নিয়েই প্রতিমা গড়ার কাজে মন দিয়েছেন শিল্পীরা।

কপালে চিন্তার ভাঁজ নিয়েই প্রতিমা গড়ার কাজে মন দিয়েছেন শিল্পীরা। —নিজস্ব চিত্র।

গত ১৫-২০ বছর ধরে কুমোরটুলিতে মাটি সরবরাহ করে আসছেন অশোক পাল। দিনে অন্তত ১০ লরি করে মাটি এলে পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দেওয়া যাবে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর কথায়, ‘‘আগে উলুবেড়িয়া থেকে মাটি আসত কুমোরটুলিতে। এখন ডায়মন্ড হারবার থেকে আসে। মাটি নিয়ে দুর্নীতির সঙ্গে তো মৃৎশিল্পের কোনও সম্পর্ক নেই! শেষ বার মাটি এনেছি ভোটগণনার আগে। এখন যা অবস্থা, তাতে দিনে যদি ১০টা করে গাড়ি আসে, কাজের কিছুটা সুরাহা হতে পারে। রোজই কেউ না কেউ আমার কাছে মাটির খোঁজে আসছেন। আমাকেও কারিগর ছেড়ে দিতে হয়েছে। কাজ শেষ করে যাওয়ার কথা ছিল তাঁর। এ বার তিনি বেঙ্গালুরুতে চলে যাবেন। প্রায় ৫০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়ে যাবে আমার। আমরা তো মাটি নষ্ট করি না!’’ বাবু জানিয়েছেন, কুমোরটুলিতে ৫০০ লরি, উল্টোডাঙা এবং পানিহাটি মিলিয়ে মোট ৬০০ লরি মাটির কথা সরকারকে জানিয়েছেন তাঁরা। কবে সেই গাড়ি কুমোরপাড়ায় পৌঁছোবে, পথ চেয়ে আছেন শিল্পীরা।

Kumortuli Idol Makers Durga Puja
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy