E-Paper

নিজের তৈরি করানো রাস্তা দিয়েই মরদেহ পৌঁছল অরূপের

২০২১ সালে ভয়াবহ স্কুটার দুর্ঘটনায় পড়েও মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে ফেরা আদরের ‘বুঁচু’র যে সরকারি হাসপাতালের লিফ্‌টে আটকে এমন পরিণতি হবে, ভাবতেই পারছেন না কালিন্দীর জপুরের বাসিন্দাদের অনেকেই। ওই তল্লাটের যাঁরা বুঁচুকে চেনেন, তাঁদের অনেকেই অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে মনে করতে পারেন না।

নীলোৎপল বিশ্বাস

শেষ আপডেট: ২২ মার্চ ২০২৬ ০৫:৫৩
সেই রাস্তা দেখাচ্ছেন অরূপের দাদা। শনিবার।

সেই রাস্তা দেখাচ্ছেন অরূপের দাদা। শনিবার। —নিজস্ব চিত্র।

কলার বোন ভেঙে গিয়েছিল। ভেঙেছিল শরীরের অন্য একাধিক হাড়ও। কোনও মতে রড ঢুকিয়ে অস্ত্রোপচার করে বাঁচিয়ে ফিরিয়েছিল ই এম বাইপাসের একটি হাসপাতাল। ২০২১ সালে ভয়াবহ স্কুটার দুর্ঘটনায় পড়েও মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে ফেরা আদরের ‘বুঁচু’র যে সরকারি হাসপাতালের লিফ্‌টে আটকে এমন পরিণতি হবে, ভাবতেই পারছেন না কালিন্দীর জপুরের বাসিন্দাদের অনেকেই। ওই তল্লাটের যাঁরা বুঁচুকে চেনেন, তাঁদের অনেকেই অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে মনে করতে পারেন না। কিন্তু বুঁচু বললেই উত্তর আসে— ‘‘খুব ভাল ছেলে। অসুস্থ কাউকে নিয়ে হাসপাতালে ছোটাই হোক অথবা কেউ মারা গেলে শ্মশানে যাওয়াই হোক— বুঁচু থাকত সবার আগে।’’

সেই বুঁচুর বাড়ির সামনে শনিবার সকালে ভিড় জমেছে। প্রতিবেশীরা এক বার অরূপের বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করে জানিয়ে যেতে চান, পাশে আছেন। কিন্তু অরূপের মা গায়ত্রী বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা বলার অবস্থা ছিল না এ দিনও। শুক্রবার অনেক রাতে তাঁকে জানানো হয়েছে যে, তাঁর ছেলে বুঁচু আর নেই। বৃহস্পতিবার ছিল বুঁচুর জন্মদিন। ছেলের জন্য বানানো পায়েস আর তাঁকে খাওয়ানোর সুযোগ হয়নি বৃদ্ধার। রাতভর পড়ে থাকা সেই পায়েস শনিবার সকালে জঞ্জালের পাত্রে ফেলে দিয়েছেন বৃদ্ধা। চোখের জল মুছে কোনও মতে বললেন, ‘‘অনেকেই বলছেন, সাহায্য করবেন। কী সাহায্য করবেন? আমার টাকাপয়সার দরকার নেই। আমার ছেলে চলে গিয়েছে। ওকে আর ফিরে পাব কি? ছেলেকে ফিরিয়ে দিতে পারলে দু’হাত পেতে নেব।’’ অরূপের বাবা অমল বন্দ্যোপাধ্যায় অশক্ত শরীরে শুয়ে ছিলেন তাঁদের কালিন্দীর ফ্ল্যাটের একটি ঘরে। রং-পেন্সিলে নাতির দেওয়ালজোড়া আঁকিবুকি দেখিয়ে বললেন, ‘‘খুব দুষ্টু। তবে, বাবা ছিল ওর প্রাণ। ছেলেকে ভালবেসে বাম্পা বলে ডাকত বুঁচু। ছেলের ভাঙা হাত সারাতে গিয়ে আমার ছেলেটাই আর ফিরল না। এত লোকের পাশে থেকেছে। এত লোকের আশীর্বাদ ওর সঙ্গে ছিল। তা-ও এ রকম হল?’’ উত্তর খুঁজে পাওয়া যায় না বৃদ্ধের প্রশ্নের।

বুঁচুর বন্ধুরাও উত্তর খুঁজে পান না, কী করে এমনটা হয়ে গেল, সেই ভেবে। তাঁরা জানাচ্ছেন, তৃণমূল কংগ্রেসের দীর্ঘ দিনের কর্মী বুঁচু ‘পাড়ায় সমাধান’ প্রকল্পের মাধ্যমে ১০ লক্ষ টাকা খরচ করে এলাকার রাস্তা তৈরি করিয়েছিলেন কয়েক মাস আগেই। নতুন পিচ হওয়া সেই রাস্তা দিয়েই শুক্রবার সন্ধ্যায় এসেছে বুঁচুর মরদেহ। সেখানেই দাঁড়িয়ে এ দিন বুঁচুর বন্ধু শুভম দত্ত বললেন, ‘‘কখনও কারও দল থেকে সাহায্য করতে যায়নি ও। ফুটবল-পাগল ছেলেটা কেউ অসুস্থ হলে বা কারও মৃত্যু হলে তাঁর পরিবারের পাশে সকলের আগে গিয়ে দাঁড়াত। আমরা মজা করে বলতাম, সবেতেই সকলের আগে নিমন্ত্রণ পাস তুই। ক’দিন আগে পাড়ায় ক্রিকেট প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিল একা হাতে।’’

বুঁচুর দাদা জয় বন্দ্যোপাধ্যায় বললেন, ‘‘আমার ডাকনাম মান্টি। মান্টি-বুঁচুকে সকলে এক ডাকে চেনেন। আমাদের একান্নবর্তী পরিবার ছিল। পিঠোপিঠি বড় হয়েছি। আমি ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। বুঁচুর তেমন খেলা হয়নি। কিন্তু যেখানেই আমার খেলা থাকত, ও যেত। ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের খেলা থাকলে বুঁচু মাঠে যাবেই। ওর মৃত্যুর খবর শুনে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবও শুক্রবার নীরবতা পালন করেছে।’’

কথা শেষ হতে না হতেই ফোন আসে আর জি কর হাসপাতাল থেকে। বুঁচুর পোশাক এসে নিয়ে যেতে বলা হচ্ছে। জয় বললেন, ‘‘পোশাক বলে তো আর অবশিষ্ট কিছু নেই। কী দেবে গিয়ে দেখে আসি। তবে, আমরা চাইছি, অরূপের স্ত্রীর একটা চাকরি হোক। ওর ছেলেটাকে একটা ভাল স্কুলে ভর্তির ব্যবস্থা করে দেওয়া হোক।’’ নির্বাচন মিটে গেলে দাবিগুলি পূরণ করে দেওয়া হবে বলেই আশ্বাস এসেছে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

RG Kar Case RG Kar Medical College And Hospital Accidental Death

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy