স্নায়ুর চিকিৎসার জন্য এ রাজ্যের বহু মানুষই ভেলোরের হাসপাতালের উপরে ভরসা করেন। কিন্তু সেই ভেলোরও যখন আশার আলো দেখাতে পারেনি, তখন যন্ত্রণার মুক্তি দিল কলকাতা।
উত্তর ২৪ পরগনার হাবরার বাসিন্দা গোবিন্দ ঘোষ। বছর আড়াই আগে তিনি মাঝেমধ্যেই চোখে ঝাপসা দেখতেন, মাথা ঘুরত। ক্রমশ মাথার যন্ত্রণা বাড়তে থাকে, শরীরের বাঁ দিকটা অসাড় হতে শুরু করে। চিকিৎসকের কাছে গিয়ে জানতে পারেন, তাঁর মস্তিষ্কে একটি টিউমার হয়েছে। চিকিৎসক পরামর্শ দিয়েছিলেন, সময় নষ্ট না করে ভেলোর যেতে। অস্ত্রোপচারে দেরি হলে জীবন সঙ্কটও হতে পারে!
পেশায় দিনমজুর গোবিন্দবাবু নিজের শারীরিক অবস্থার থেকেও বেশি চিন্তিত হয়ে পড়েন নিজের আর্থিক অবস্থা নিয়ে। কারণ চিকিৎসকেরা জানান, এই অস্ত্রোপচারে খরচ হবে প্রায় ছ’লক্ষ টাকা। যেটুকু জমা পুঁজি ছিল, তা নিয়েই মার্চে ভেলোর পাড়ি দেন গোবিন্দবাবু। কিন্তু আশা দেখাতে পারেনি তারা। ভেলোরের হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিলেন, মাস তিনেকের আগে কিছুই করার নেই। অস্ত্রোপচার খুবই জটিল, উপযুক্ত ব্যবস্থা না করে অস্ত্রোপচার সম্ভব নয়। বাধ্য হয়েই কলকাতায় ফিরে আসতে হয় তাঁকে। এর পরে স্থানীয় এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা তাঁকে কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। সেখানে অস্ত্রোপচারের পরে আপাতত সুস্থ জীবনে ফিরেছেন গোবিন্দবাবু।
কেন এই টিউমার অস্ত্রোপচার ঝুঁকির ছিল? চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, টিউমারটি এতটাই বড় হয়ে গিয়েছিল যে, মস্তিষ্কের কাজ করার ক্ষমতা কমে যাচ্ছিল। এমনকী মস্তিষ্কের বেশির ভাগ অংশ ঢেকে ফেলেছিল টিউমারটি। কিন্তু অস্ত্রোপচার করতে গেলে মস্তিষ্কের অন্য অংশে আঘাত লাগার ঝুঁকি
থেকে যাচ্ছিল।
অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসকেরা সরাসরি টিউমারটিকে উপর থেকে আঘাত না করে টিউমারের নীচের অংশ থেকে অস্ত্রোপচার শুরু করেন। অন্য ক্ষেত্রে টিউমারের উপরের অংশ থেকেই অস্ত্রোপচার শুরু করা হলেও এ ক্ষেত্রে তা হয়নি। কারণ, টিউমারের আকার অনেক বড় হওয়ায় রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বেশি ছিল। যা রোগীর শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর হতো। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে মস্তিষ্কের কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ হতে পারত। তাই টিউমারের নীচের অংশ থেকে অস্ত্রোপচার শুরু হয়।
যে স্নায়ু শল্য-চিকিৎসক অস্ত্রোপচারটি করেছেন, সেই অনির্বাণদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, ‘‘টিউমারটির অবস্থান ছিল ‘ফ্লোর অফ ব্রেন’ অর্থাৎ মস্তিষ্কের কেন্দ্রে। টিউমারের বিশাল আয়তন অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি করেছিল। যত সময় পেরোতো, সমস্যাও বেড়ে যেত।’’
শহরের স্নায়ু চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, মস্তিষ্কের যে কোনও অস্ত্রোপচারেই ঝুঁকি থাকে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ঝুঁকি ছিল আরও বেশি। কারণ, এটি ছিল ‘জায়ান্ট টিউমার’। স্নায়ু শল্য-চিকিৎসক অমিতাভ চন্দ বলেন, ‘‘এই ধরনের অস্ত্রোপচার যথেষ্ট জটিল এবং সময়সাপেক্ষ। কলকাতার ডাক্তাররা যে এই ধরনের ঝুঁকির অস্ত্রোপচারে এখন সিদ্ধহস্ত, সে কথা আরও এক বার
প্রমাণ হল।’’