বিকেল থেকেই পাড়ায় শব্দবাজি ফাটতে শুরু করায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল ৪৫ দিনের অন্তঃসত্ত্বা রেশমি। রাত যত বাড়ে, ততই বাড়তে থাকে বাজির দাপট। এক সময়ে ভয়ে ছুটে ঘরের আলমারির নীচে ঢুকতে যায় সে। পরিত্রাহি সেই দৌড়ই কাল হল তার। পেটে ধাক্কা লেগে পড়ে অজ্ঞান হয়ে যায় আমহার্স্ট স্ট্রিটের দে পরিবারের আদরের পোষ্য কুকুর। পরদিন বোঝা যায়, বাচ্চা নষ্ট হয়ে গিয়েছে তার। আওয়াজের ভয় এবং সন্তান হারানোর শোক এমন চেপে বসে যে, দ্রুত পেট পরিষ্কারও করানো যায়নি রেশমির। দিন দশেক খাওয়া, মল-মূত্র ত্যাগ সম্পূর্ণ বন্ধ। সব সময়ে চোখ দিয়ে জল গড়াতে থাকে তার। আর বাঁচানো যায়নি কুকুরটিকে।
কালীপুজো এলেই সন্তানসম পোষ্যকে হারানোর যন্ত্রণা তাড়া করে ওই পরিবারের সদস্যদের। তাঁরা বলছেন, ‘‘বাজি ফাটার আওয়াজ শুনলেই বুক কেঁপে ওঠে। প্রতিবাদ করেও লাভ হয় না। শহরে বাজির দাপট কিছুতেই কমে না।’’ কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। প্রতি বছর কালীপুজোর এই সময়ে এমনই আতঙ্কে ভুগতে হয় পোষ্যের অভিভাবকদের। তাঁদের আশঙ্কা, এ বছর বাজির দাপট আরও বাড়বে। এমনিতেই গত বছর থেকে বাজির শব্দের ঊর্ধ্বসীমা ৯০ থেকে বাড়িয়ে ১২৫ ডেসিবেল করে দেওয়া হয়েছে। সেই সুযোগে সবুজ বাজির নামে এ বার চকলেট বোমাও দেদার তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা। যদিও পুলিশ জানিয়ে দিয়েছে, কালীপুজোর রাতে ৮টা থেকে ১০টা— শুধু এই দু’ঘণ্টাই সবুজ বাজি ফাটানোয় ছাড় রয়েছে। কিন্তু সেই নির্দেশ বহু ক্ষেত্রেই মানার বালাই থাকে না বলে অভিযোগ। শহরের পশু চিকিৎসকেরাও জানাচ্ছেন, পুজোর সাত দিন আগে থেকেই বাজি ফাটায় পোষ্যদের সমস্যায় পড়ার খবর পাচ্ছেন তাঁরা। দিন দুয়েক আগে বাগবাজারেই একটি বাড়ির পোষ্য বাজির ভয়ে আলমারিতে উঠতে গিয়ে চোখে ধাক্কা খেয়ে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছে।
সল্টলেকের বাসিন্দা, পোষ্যের অভিভাবক সুচন্দ্রা ঘোষ বলছিলেন, ‘‘অন্তঃসত্ত্বা প্রাণী হলে বাজির আওয়াজের প্রভাব পড়ে সন্তানের উপরেও। যে বাচ্চা জন্মায়, তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা খুব কম হয়।’’ একই ভাবে কসবার এক পোষ্যের অভিভাবক সুমনা সরকার বললেন, ‘‘কুকুরেরা যে কোনও আওয়াজ মানুষের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি জোরে শোনে। বেড়াল আবার কুকুরের চেয়েও বেশি জোরে শোনে। ১২৫ ডেসিবেলের শব্দবাজির আওয়াজ তা হলে ওদের কানে কত জোরে প্রবেশ করে ভাবুন। সাউন্ড বক্সের সামনে বসলে অথবা হঠাৎ খুব কাছে জোরে বাজি ফাটলে মানুষের কী অবস্থা হয়, কল্পনা করা দরকার। তা হলেই বোঝা যেতে পারে, ওদের যন্ত্রণা কতটা।’’
বেহালায় পথকুকুরদের নিয়ে কাজ করা তন্দ্রা কুণ্ডু আবার বলছেন, ‘‘অনেক পথকুকুরই বাজির ভয়ে পাড়াছাড়া হয়। কুকুরের কাছে নিজের এলাকা বড় ব্যাপার। পরে কামড় খেয়ে বা গাড়ির ধাক্কায় অনেকেরই মৃত্যু হয়।’’ কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন মুম্বইয়ের মতো পথকুকুরদের গলায় নাম, ফোন নম্বর দিয়ে ট্যাগ ঝোলানোর পথে হাঁটছে। কুকুর এলাকাছাড়া হয়েছে বলে মনে হলে সংশ্লিষ্ট নম্বরে ফোন করতে বলছে তারা।
‘পশ্চিমবঙ্গ ভেটেরিনারি কাউন্সিল’ সূত্রের খবর, আগামী কয়েক দিন সমস্ত পশু হাসপাতালে বাড়তি প্রস্তুতি রাখতে বলা হয়েছে। পর্যাপ্ত সংখ্যায় চিকিৎসক এবং চিকিৎসাকর্মী যাতে উপস্থিত থাকেন, সে ব্যাপারেও জোর দিতে বলা হয়েছে। তবে, পশু চিকিৎসক অভিরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় বললেন, ‘‘বাড়ির কোনও মানুষ সমস্যায় পড়লে যে ভাবে বার বার ফোন করে সাহায্য চাই, সে ভাবেই পুলিশকে ফোনে বলতে হবে। প্রয়োজনে আগে থেকেই চিকিৎসকদের পরামর্শ মতো অ্যাংজ়াইটি কমানোর ওষুধ শুরু করতে হবে।’’ তাঁর পরামর্শ, ‘‘পোষ্য ভয় পেয়ে ঘরের যেখানেই গিয়ে বসুক, সেখান থেকে জোর করে বার করা চলবে না। খাবার খেতেও জোর করা যাবে না। জল দিয়ে যেতে হবে, একটু ধাতস্থ হলেই ওরা নিজেরাই খাবে।’’
পশু চিকিৎসক সোহম কর বললেন, ‘‘আরামের জন্য তৈরি মিউজ়িক ঘরে চালিয়ে রেখে উপকার মেলে কিছু ক্ষেত্রে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, এই ক’টা দিন পোষ্যকে ভাল রাখতে নিজেদের প্রস্তুতির উপরেই ভরসা রাখতে হয়, পুলিশ-প্রশাসন আরও সক্রিয় হবে কবে?’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)