Advertisement
E-Paper

এখনও রয়েছে সুসম্পর্ক, সুখে দুঃখে পাশে থাকা

আষাঢ়ের মেঘলা দুপুরে চিলতে রকে ক্লান্ত মুটে-মজুরের তাসখেলা, ছোট সাইকেল-ভ্যানে দিস্তে বাঁধা খাতা বইয়ের ওঠানো-নামানো, বাতাসে মিশে থাকা নতুন বইয়ের গন্ধ আর আপন ছন্দে ইতস্তত পাশ কাটিয়ে চলা টানা রিকশা ধরে রেখেছে আমাদের পাড়া পটুয়াটোলা লেনের অতি পরিচিত ছবিটা।

চণ্ডীচরণ পান

শেষ আপডেট: ১৮ জুন ২০১৬ ০৭:১৯

আষাঢ়ের মেঘলা দুপুরে চিলতে রকে ক্লান্ত মুটে-মজুরের তাসখেলা, ছোট সাইকেল-ভ্যানে দিস্তে বাঁধা খাতা বইয়ের ওঠানো-নামানো, বাতাসে মিশে থাকা নতুন বইয়ের গন্ধ আর আপন ছন্দে ইতস্তত পাশ কাটিয়ে চলা টানা রিকশা ধরে রেখেছে আমাদের পাড়া পটুয়াটোলা লেনের অতি পরিচিত ছবিটা।

প্রবীণদের কাছে শুনেছি, আগে এ পাড়ায় থাকতেন পটুয়ারা। এখন অবশ্য বংশধরেরা পেশা পরিবর্তন করেছেন। অতীতের সেই স্মৃতি থেকেই পটুয়াটোলা লেন নামটা রয়ে গিয়েছে। সূর্য সেন স্ট্রিট থেকে পটুয়াটোলা লেন গিয়ে মিশেছে রমানাথ মজুমদার স্ট্রিটে।

পাড়া বলতে বুঝি পরিবারের বাইরে আরও এক বৃহৎ পরিবার। আমাদের নির্ঝঞ্ঝাট শান্তিপূর্ণ পাড়াটায় এখনও রয়েছে মানুষে মানুষে যোগাযোগ, সুসম্পর্ক, সহনশীলতা আর পাশে থাকার অভ্যেসটা। বেশির ভাগ প্রতিবেশীই বহু দিনের। কারণ এ পাড়ায় এখনও প্রবেশ করেনি ফ্ল্যাট কালচার। আজও যে কোনও সমস্যায় তাঁদের পাশে পাওয়া যায়।

Advertisement

কাছেই সৎসঙ্ঘ আশ্রম থেকে ভেসে আসা ধর্মসঙ্গীতে ঘুম ভাঙে প্রতি দিন। সন্ধ্যায়ও শোনা যায় সেই সুর। পাড়ার নবীনে-প্রবীণে বেরিয়ে পড়েন প্রাতর্ভ্রমণে। ফেরার পথে চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে পরিচিতদের সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে চলে চায়ের ভাঁড়ে চুমুক।

এ পাড়ায় এবং পাশেই রমানাথ মজুমদার স্ট্রিটে রয়েছে বই বাঁধাইয়ের কারখানা, কিছু ছাপাখানাও। বহু মানুষ এই পেশায় যুক্ত। নতুন বইয়ের গন্ধ পাড়াটায় অন্য আমেজ এনে দেয়। কিছু কিছু জায়গায় পাড়াটা বেশ ঘিঞ্জি। কোথাও আবার পার্কিং থাকায় গাড়ির ঢুকতে-বেরোতে সমস্যা হয়।

এই পাড়ার দুর্গাপুজোর আকর্ষণ অন্য রকম। তিনটি বনেদি পরিবারের পুজো ধরে রেখেছে সাবেক ঐতিহ্য। ধর বাড়ি ও দুই বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়ির পুজো দেখতে অনেকে ভিড় করেন। কালীপুজোয় আগে জমজমাট জলসা হত। এখন তা হয় না।

সময়ের সঙ্গে কমেছে খেলাধুলোর অভ্যেসও। স্কুলের পরে কোচিংয়ের ফাঁদে আটকে গিয়েছে শৈশব-কৈশোর। তবে কাছেই বিজলি সঙ্ঘ ক্লাবের উদ্যোগে হয় ভলিবল প্রশিক্ষণ এবং প্রতিযোগিতা। শোনা যায়, ক্লাবের উদ্বোধনে এসেছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু। স্থানীয় কিছু ক্লাবের উদ্যোগে দুঃস্থদের মধ্যে বস্ত্র বিতরণ-সহ নানা সমাজসেবা মূলক কাজও হয়। একটি দাতব্য চিকিৎসালয় চলে পাড়ার মানুষের সহযোগিতায়।

অন্যান্য পাড়ার মতো এখানেও মিলছে উন্নত নাগরিক পরিষেবা। এলাকার কাউন্সিলর স্বপ্না দাস উন্নয়নে উদ্যোগী। নিয়ম করে হয় জঞ্জাল অপসারণ, রাস্তা পরিষ্কার। মশার তেল ও ব্লিচিংও ছড়ানো হয়। রাস্তার জোরালো আলোয় চারদিক
এখন উজ্জ্বল।

সময়ের সঙ্গে রকের সংখ্যা কমলেও আমাদের আড্ডাটা কিন্তু কমেনি। এখনও আড্ডা বসে পাড়ার মোড়ে, কিছু দোকানের সামনে আর ব্যানার্জি বাড়ির রকে। আড্ডার আরও এক ঠিকানা সূর্য সেন স্ট্রিটের ফেভারিট কেবিন। আপাতদৃষ্টিতে ঝাঁ-চকচকে আকর্ষণীয় নয়, তবু সাবেক আবহাওয়ায় মিশে আছে এক মাদকতা। এ পাড়াটা ভোজন রসিকদেরও হাতছানি দেয়। কাছাকাছির মধ্যে রয়েছে বণিক, কালিকার তেলেভাজা, পুঁটিরামের বিখ্যাত কচুরি।

এ পাড়ায় এখনও শোনা যায়, ফেরিওয়ালার ডাক, কাবাড়িওয়ালা আর শিল কাটাইয়ের ডাক। নিঝুম দুপুরে কিংবা গভীর রাতে যখন পাড়ার মাঝে এসে দাঁড়াই মনে হয় দ্রুত বদলে যাওয়া চারপাশের মাঝখানে এখানে যেন সময় এখনও থেমে রয়েছে।

লেখক চিকিৎসক
ছবি: দেবস্মিতা ভট্টাচার্য।

Potuatola Lane
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy