E-Paper

ঠাঁই নেই, জায়গা ‘ধার’ করে চলছে আর জি করের জরুরি বিভাগ

শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মেডিক্যাল কলেজ আর জি করে এ ভাবে জরুরি চিকিৎসা কী করে চলতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে খোদ চিকিৎসকদেরই। ২০২৪ সালের ১৪ অগস্ট রাতে ভাঙচুরের পর থেকে বন্ধ আর জি করের মূল জরুরি বিভাগ।

শান্তনু ঘোষ

শেষ আপডেট: ২৫ মার্চ ২০২৬ ০৮:২৩
আর জি করের ট্রমা কেয়ারের ভিতরে জরুরি বিভাগে রোগীদের ভিড়। স্ট্রেচারে বসিয়ে রাখা হয়েছে রোগীকে।

আর জি করের ট্রমা কেয়ারের ভিতরে জরুরি বিভাগে রোগীদের ভিড়। স্ট্রেচারে বসিয়ে রাখা হয়েছে রোগীকে। —নিজস্ব চিত্র।

কেমন আছে আর জি কর?

পর পর দু’টি মৃত্যুর ঘটনায় কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর পরে সোমবার রাতের চিত্র। রাত ১১টায় ট্রমা কেয়ার বিল্ডিংয়ে ঢুকে দেখা গেল, একের পর এক অব্যবস্থা। ১৯ মাস ধরে সেখানেই চলছে অস্থায়ী জরুরি বিভাগ। চিকিৎসকেরা বলছেন, ‘‘জায়গা ধার নিয়ে কত দিন চলবে, জানি না! প্রতিদিনই এক অবস্থা।’’ কেমন সেই অবস্থা?

চিত্র ১: ছোট ঘরের মধ্যে পাঁচটি শয্যার একটিতে অক্সিজেন চলছে এক রোগীর। অন্যগুলিতে এক-একটি শয্যায় বসে তিন-চার জন রোগী। বসে কেন? এক চিকিৎসকের কথায়, ‘‘এত শয্যা কোথায়? তাই যাঁদের বসে থাকার ক্ষমতা রয়েছে, তাঁদের বসিয়ে রাখা হয়েছে।’’

চিত্র ২: শ্বাসকষ্ট নিয়ে আসা বৃদ্ধকে নিয়ে ভিড়ে ঠাসা জরুরি বিভাগের ঘরে ঢুকতে পারছিলেন না পরিজনেরা। অগত্যা স্ট্রেচারেই তাঁকে রাখা হল ট্রমা কেয়ারের বারান্দায়। সেখানেই এসে পরীক্ষা করলেন এক জুনিয়র চিকিৎসক।

চিত্র ৩: ট্রমা কেয়ারের বারান্দার দু’পাশে রাখা শয্যার মধ্যে কয়েকটিতে শুয়ে রোগীরা। তাঁরা দুর্ঘটনাজনিত সমস্যা নিয়ে এসেছেন। পাশে ট্রলিতে থাকা রোগীরা এসেছেন সাধারণ জরুরি বিভাগে দেখাতে। রোগীদের ভিড়ের মধ্যেই বারান্দার এক কোণে রাখা টেবিলে চলছে হাত-পা ভাঙার প্লাস্টার। পাশে দেওয়ালে টাঙানো এক্স-রে ভিউ বক্স।

শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মেডিক্যাল কলেজ আর জি করে এ ভাবে জরুরি চিকিৎসা কী করে চলতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে খোদ চিকিৎসকদেরই। ২০২৪ সালের ১৪ অগস্ট রাতে ভাঙচুরের পর থেকে বন্ধ আর জি করের মূল জরুরি বিভাগ। বদলে ট্রমা কেয়ার বিল্ডিংয়ের একতলায় অস্থায়ী ভাবে চলছে ওই বিভাগের কাজ। এত দিন পরেও জরুরি বিভাগ খোলা গেল না কেন? সুপার সপ্তর্ষি চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘‘সিবিআই বলছে, ওরা বন্ধ করতে বলেনি। কলকাতা পুলিশ বলছে, বিষয়টি তদন্তের আওতায় রয়েছে। খোলার অনুমতি কে দেবে, সেটাই স্পষ্ট নয়।’’ হাসপাতাল সূত্রের খবর, সংস্কারের জন্য বরাদ্দের প্রস্তাব স্বাস্থ্য দফতরে জমা দিয়েছে পূর্ত দফতর। কিন্তু তারও কিছু হয়নি। তাই জায়গা ‘ধার’ করেই চলছে জরুরি পরিষেবা।

সম্প্রতি দু’টি মৃত্যুর পরে মঙ্গলবার আর জি করের অধ্যক্ষ ও সুপার বন্ধ থাকা জরুরি বিভাগ পরিদর্শন করে স্বাস্থ্য ভবনে যান। কিন্তু প্রশ্ন, চূড়ান্ত অব্যবস্থার মধ্যে এত দিন ধরে জরুরি পরিষেবা চললেও তা নিয়ে কেন হুঁশ নেই স্বাস্থ্য প্রশাসনের? কেন অব্যবস্থার কারণে দু’টি মৃত্যুর পরে নড়েচড়ে বসতে হচ্ছে? চিকিৎসক তাপস প্রামাণিক বলেন, ‘‘ট্রমা কেয়ার বিল্ডিংয়ের একতলার নকশাতেই ত্রুটি রয়েছে। এক্স-রে যন্ত্রের উচ্চতা সিলিংয়ে আটকে যাওয়ায় তা বসানোই হয়নি। ট্রমা ও জরুরি বিভাগের ভিড়ে হাঁটাচলা করার উপায় নেই। রোগীকে পরিষেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়।’’

ট্রমা কেয়ার বিল্ডিংয়ে ঢোকার মুখেই বাঁ হাতে তালাবন্ধ শৌচাগার। প্রায় দু’বছর ধরে ওই শৌচাগার বন্ধ ছিল রোগীদের জন্য। ট্রমা কেয়ারের বারান্দার দু’পাশে শয্যায় দুর্ঘটনাগ্রস্তদের পাশাপাশি রাখা হচ্ছে সাধারণ জরুরি বিভাগে আসা রোগীদের। কর্মীরা জানাচ্ছেন, জরুরি বিভাগের ঘরে জায়গা না হওয়ায় অক্সিজেন দিতে ট্রমা কেয়ারের শয্যা ব্যবহার করতে হয়।আবার মাঝেমধ্যে ভিড় সামলাতে সাধারণ রোগীকেও ট্রমার রেড জ়োনের ঘরে রাখতে হয়।

ট্রমা কেয়ারে ঢুকেই ডান দিকের ছোট ঘরে চলা জরুরি বিভাগে রয়েছে মাত্র পাঁচটি শয্যা। তার চারটিতে অক্সিজেনের ব্যবস্থা ও দু’টিতে কার্ডিয়াক মনিটর রয়েছে। ভিড় সামাল দিতে একাধিক রোগীকে একটি শয্যায় বসিয়ে রাখা হয়েছে। কর্মীদের অভিযোগ, কারও ইসিজি-র প্রয়োজন হলে তখন শয্যা থেকে নেমে দাঁড়িয়ে থাকেন অন্যেরা। নেই কোনও ইসিজি রুম। এক চিকিৎসকের কথায়, ‘‘যেন সিনেমার সাজানো সেট। বাস্তবে এ ভাবে চিকিৎসা করা সম্ভব নাকি?’’

উল্টো দিকে একটি ছোট করিডরের এক পাশে শল্য, স্নায়ু-শল্য চিকিৎসকদের বসার জায়গা। তার উল্টো দিকের একটি টেবিল ভাগাভাগি করে অস্থি-শল্য চিকিৎসক এবং ভর্তির টিকিট করার জন্য কম্পিউটার নিয়ে বসেন এক কর্মী। কয়েক পা এগিয়েই সিপিআর রুম তালাবন্ধ। পাশের ছোট ঘরে ইমার্জেন্সি মেডিক্যাল অফিসার, চতুর্থ শ্রেণির কর্মীদের বিশ্রাম নেওয়ার জায়গা। উল্টো দিকের ছোট ঘরটি ইএনটি-র জরুরি বিভাগ। যেখানে এক জন চিকিৎসক থাকলে আর কারও ঢোকার উপায় নেই। অগত্যা ঘরের বাইরের চেয়ারে বা স্ট্রেচারে চলছে চিকিৎসা। ওই ঘর সংলগ্ন একটি শৌচাগার ব্যবহার করেন চিকিৎসক, নার্স, কর্মী, নিরাপত্তারক্ষী— সকলেই।

ট্রমা কেয়ারের বারান্দার শেষ প্রান্তে ডান হাতে গলির মধ্যে চলছে মাইনর-ওটি। বাঁ দিকে ঢুকে রয়েছে সিটি স্ক্যান রুম। সংলগ্ন ইউএসজি-র ঘর অবশ্য ব্যবহৃত হয় ইন্টার্নদের বিশ্রামের জন্য। চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, ওই চত্বরেই রয়েছে দু’টি লিফ্ট। যার একটিতে থেঁতলে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল।

ট্রমা ও সাধারণ জরুরি বিভাগ মিলিয়ে দৈনিক ৪০০-৪৫০ জন রোগী আসেন। রোগীদের ভিড়ে কার্যত হাঁটাচলা করা দায়। তাই ট্রমার বাইরে স্ট্রেচারেই অপেক্ষা করেন রোগীরা। ডাক্তারদের একাংশের কথায়, ‘‘এ ভাবে আর যা-ই হোক, চিকিৎসা হয় না। দু’জনের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু এখানকার যা পরিস্থিতি, তাতে আরও বিপর্যয় ঘটলেও আশ্চর্যের কিছু নেই।’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

RG Kar Medical College And Hospital RG Kar Medical College and Hospital Incident

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy