ঘটনার পর থেকে তিন দিন কেটে গেলেও আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে লিফ্টে আটকে থেঁতলে মৃত্যুর ঘটনায় একাধিক প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি। এখনও জানা গেল না, ঠিক কাদের গাফিলতিতে লিফট কার্যত এমন ‘মারণাস্ত্র’ হয়ে উঠেছিল। দুর্ঘটনার পরে তড়িঘড়ি সিআইএসএফ বা পুলিশকর্মীরা উপস্থিত হলেও, কেন তাঁরা তখনই উদ্ধারকাজে ঝাঁপিয়ে পড়লেন না, উত্তর নেই তারও। ফলে প্রশ্ন উঠছে, কেন শুধুমাত্র তিন জন লিফ্টকর্মী এবং দুই নিরাপত্তারক্ষীকে কাঠগড়ায় তুলে এই বীভৎস মৃত্যুর দায়ে হাত তুলে ফেলবে প্রশাসন?
রবিবারও মৃত অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিজন ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশকর্মী এবং সিআইএসএফের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষে সরব। লিফ্টের গর্তে ছেলেকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে উপস্থিত পুলিশ এবং সিআইএসএফ কর্মীদের কাছে উদ্ধারের কাতর আবেদন করেছিলেন, এ দিন সে কথাও জানিয়েছেন মৃতের বাবা অমল বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু লিফ্টের দরজার চাবি খুঁজে বিপন্নদের গর্ত থেকে তোলা তাঁদের কাজ নয় বলে নির্বিকার জবাব শুনতে হয়েছিল বলে অভিযোগ। মৃতের পরিবারের দাবি, জখম অরূপকে ঘণ্টাখানেক গর্তের মধ্যে ফেলে না রেখে দ্রুত উদ্ধার করা হলে হয়তো প্রাণে বাঁচানো যেত।
যদিও মৃতের পরিবারের অভিযোগ প্রসঙ্গে রবিবার রাত পর্যন্ত লালবাজারের তরফে কিছু জানানো হয়নি। এমনকি, উপস্থিত পুলিশ বা সিআইএসএফ কর্মীদের গ্রেফতার বা জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে কি না, মেলেনি সেই প্রশ্নের উত্তরও। জবাব না মিললেও লালবাজারের হোমিসাইড শাখার তদন্তকারী আধিকারিকেরা ইতিমধ্যেই ঘটনার তদন্তভার নিয়েছেন। শনিবার রাতে মৃত অরূপের বাড়িতে যায় তদন্তকারী দল। শনিবার রাতেই ইএম বাইপাসের ধারের একটি হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে বাড়ি ফিরেছেন অরূপের স্ত্রী সোনালি এবং তিন বছরের ছেলে আরুষ। তদন্তকারীরা সোনালির বয়ান ক্যামেরাবন্দি করেন। উদ্ধার পর্বে উপস্থিত অরূপের বন্ধুদের সঙ্গেও কথা বলা হয়। তাঁদের বয়ানও নথিভুক্ত করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। রবিবার অমল বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘আমরা তদন্তকারীদের কাছে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি করেছি। উপস্থিত পুলিশকর্মী এবং সিআইএসএফ কর্মীরাও কেন সক্রিয় হল না সেই প্রশ্নই রেখেছি। তদন্তকারীরা আপাতত আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন।’’
লালবাজার সূত্রে জানা গিয়েছে, লিফ্ট-কাণ্ডে তদন্তে আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ঘটনাস্থলের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেছেন তদন্তকারীরা। সেই ফুটেজে ভোর ৪টে ১৫ মিনিট নাগাদ অরূপদের ট্রমা কেয়ারে অস্ত্রোপচারের ঘরের সামনে দেখা গিয়েছে। এর পরে অরূপের দেহ উদ্ধার করে ওয়ার্ডে আনা হয় ৫টা ১২ মিনিটে। মাঝের প্রায় এক ঘণ্টা ঠিক কী হয়েছিল, পরিবার এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান মিলিয়ে দেখতে চাইছেন তদন্তকারীরা। লালবাজার জানতে পেরেছে, খাতায় কলমে চলতি মাসের শুরুতে দুর্ঘটনাগ্রস্ত লিফটটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয়েছিল। তার পরেও লিফটটি কী কারণে বিকল হল, এই প্রশ্নও তদন্তকারীদের ভাবাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে লিফটকর্মী বা অন্য কারও কোনও গাফিলতি ছিল কি না, খতিয়ে দেখা হচ্ছে সে-দিকও।
সূত্রের খবর, সোমবারই লিফট রক্ষণাবেক্ষণকারী সংস্থা এবং পূর্ত দফতরের আধিকারিকদের ডেকে পাঠিয়েছে পুলিশ। ওই আধিকারিকদের নিয়ে লিফটের ‘মেশিন রুম’ খতিয়ে দেখার পাশাপাশি, কী ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ শেষবার হয়েছিল, তা-ও দেখা হতে পারে। সূত্রের খবর, ইতিমধ্যেই লিফটের ‘মেশিন রুম’ সংক্রান্ত তথ্য খতিয়ে দেখেছে পুলিশ। ঘটনার আগে এবং পরে কারা সেখানে গিয়েছিলেন, সিসি ক্যামেরার ফুটেজ মিলিয়ে সেই তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রয়োজনে তাঁদের সঙ্গেও তদন্তকারীরা কথা বলতে পারেন।
এ দিকে, শনিবার বেলার দিকে আর জি কর হাসপাতালে মর্মান্তিক মৃত্যুর প্রতিবাদে বিক্ষোভ দেখান এবিভিপি-র কর্মী-সমর্থকেরা। হাসপাতালে আপৎকালীন বিভাগের গেটের সামনে তাঁরা বসে পড়েন। পরে পুলিশ এসে তাঁদের সরিয়ে দেয়।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)