Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

১৬ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

শতবর্ষের গম্বুজ নিয়ে বিতর্কে রক্সি

দেবাশিস ঘড়াই
১৭ নভেম্বর ২০১৮ ০১:১১
এই সেই গম্বুজ।ছবি: দেশকল্যাণ চৌধুরী

এই সেই গম্বুজ।ছবি: দেশকল্যাণ চৌধুরী

সাদা মার্বেল পাথরের সিঁড়ি। ঝকঝক করছে। তাদের বয়স একশোর বেশি। জানা গেল, একটু ঘষলেই ঝকঝক করে। বরং নতুন টাইলস বসানো জায়গাটা তুলনায় কম পরিষ্কার।

গোলাকার সিঁড়ি এমন ভাবে তৈরি, যেন তিনতলার পুরো হলকে একসঙ্গে ধরে রেখেছে। সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠলে মাঝের জায়গাটার নাম ‘ড্রেস সার্কেল’, তার টিকিটের দাম সব থেকে বেশি। কারণ, ওখান থেকেই সব থেকে ভাল দেখা যায়। গোলাকৃতি হলের ভিতরে দাঁড়ালে মনে হয়, ভাল করে শোনার জন্য প্রযুক্তির দরকার নেই। ব্রিটিশ স্থপতি যখন এটি তৈরি করেন, তখন তাঁর মাথায় ছিল যাতে প্রত্যেক দর্শক ঠিক মতো শুনতে পান।

এই সিনেমা হল তখন ‘রক্সি’ নয়, ‘এম্পায়ার থিয়েটার’ নামে পরিচিত ছিল। নাট্য-উদ্যমী মরিস ব্যান্ডম্যান বিশ্বব্যাপী থিয়েটার-সাম্রাজ্যে যোগ করেছিলেন কলকাতাকেও। যোগ্য সঙ্গত ছিল আরাথুন স্টিফেনের, যিনি গ্র্যান্ড হোটেলের স্থপতি। দু’জনের উদ্যোগে কলকাতা পুরসভার বর্তমান সদর দফতরের বিপরীতে প্রায় একশো বছর আগে তৈরি হয়েছিল ওই থিয়েটার। শহরের প্রাণকেন্দ্রে নির্মিত ওই থিয়েটারকে আলাদা চরিত্র দিতে তার মাথায় তৈরি হয়েছিল এক গোলাকৃতি গম্বুজ। যে গম্বুজ আপাতত বিতর্কের কেন্দ্রে!

Advertisement

কারণ, ব্রিটিশ-কলোনিয়াল স্থাপত্যের নির্দশন ওই গম্বুজ মেরামতি নিয়ে চাপান-উতোর শুরু হয়েছে পুরসভা ও রক্সি সিনেমা হল কর্তৃপক্ষের মধ্যে। সূত্রের খবর, গম্বুজের কাঠামো ভঙ্গুর হয়ে যাওয়ায় তা মেরামতির জন্য পুরসভার কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন রক্সি কর্তৃপক্ষ। সে জন্য হলটি পরিদর্শনের আবেদন জানান তাঁরা। সিনেমা হল কর্তৃপক্ষের দাবি, পরিদর্শন না করেই গম্বুজটি সারানোর জন্য পুরসভা তাঁদের মৌখিক সম্মতি দেয়। অথচ হেরিটেজ স্থপতি পার্থরঞ্জন দাস বলেন, ‘‘হেরিটেজ আইনের নিয়ম অনুসারে, যে কোনও হেরিটেজ ভবনেরই রক্ষণাবেক্ষণ বা মেরামতি পুরসভার ‘এমপ্যানেলড কনজ়ারভেশন আর্কিটেক্ট’-এর পরামর্শে করার কথা।’’

রক্সি সিনেমা হলের ম্যানেজার স্বপন চক্রবর্তী বলেন, ‘‘কোথাও কিছু ভেঙে পড়লে তো আমাদেরই দোষ হত। তাই পুরসভা মৌখিক সম্মতি দেওয়ার পরে কাঠামোগত পরিবর্তন না করে আমরাই মেরামত করেছি।’’

পুরসভার হেরিটেজ সংক্রান্ত বিষয় দেখাশোনার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রোজেক্ট ম্যানেজমেন্ট ইউনিটের এক পদস্থ কর্তার পাল্টা দাবি, ‘‘ওটা সারানো হয়েছে বলে জানা নেই। আমরা কোনও অনুমতি দিইনি।’’ অথচ পুরসভার মেয়র পরিষদ বৈঠকের তথ্য বলছে, রক্সির গম্বুজ সারানোর বিষয়টি বৈঠকে উঠেছিল! ফলে ফের নিয়মভঙ্গ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

প্রসঙ্গত, এর আগেও বিতর্কের কেন্দ্রে এসেছিল রক্সি সিনেমা হল। কর বকেয়া রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে লিজ চুক্তি বাতিল করে ২০১১ সালে পুরসভা হলটির দখল নিয়েছিল। তা নিয়ে আইনি লড়াইয়ের পরে প্রায় আড়াই বছর আগে মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায় ঘোষণা করেন, পুরসভার সম্পত্তি এই হল ভেঙে অফিস করা হবে। তার পরেই সাংস্কৃতিক জগতে তুমুল শোরগোল শুরু হয়।

কারণ, শহরের অন্যতম পুরনো সিঙ্গল স্ক্রিন এই সিনেমা হল জুড়ে ইতিহাস ছড়িয়ে। থিয়েটার থাকাকালীন এখানে দাঁড়িয়েই ১৯১৯ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘দ্য সেন্টার অব ইন্ডিয়ান কালচার’ বক্তৃতাটি পাঠ করেছিলেন। ১৯২৩ সালে ৬২ বছর বয়সি রবীন্দ্রনাথ ‘বিসর্জন’ নাটকে তরুণ জয়সিংহের চরিত্রে অভিনয়ও করেছিলেন! ১৯২৯-’৩৩ সালের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের আরও কয়েকটি নাটক সেখানে মঞ্চস্থ হয়েছিল। এমনটাই জানাচ্ছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক ও থিয়েটার-গবেষক আনন্দ লাল। তিনি বলেন, ‘‘মরিস ব্যান্ডম্যান তখনকার দিনের বহু থিয়েটারের নক্ষত্রকে এম্পায়ারে এনেছিলেন। যাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ম্যাথেসন ল্যাঙ্গ, যাঁর বাস্তবসম্মত অভিনয়শৈলী পরবর্তীকালে শিশিরকুমার ভাদুড়ির মতো নাট্যব্যক্তিত্বকেও প্রভাবিত করেছিল।’’ অধ্যাপক সৌরীন ভট্টাচার্য বলেন, ‘‘১৯৩৬ সালের ১১, ১২ ও ১৩ মার্চ, পরপর তিন দিন এম্পায়ার থিয়েটারে ‘চিত্রাঙ্গদা’ নাটকটি অভিনীত হয়েছিল।’’

তথ্য বলছে, সিনেমা হলে রূপান্তরিত হওয়ার পরে ১৯৪১ সালে প্রথম সেখানে অশোক কুমার অভিনীত ‘নয়া সংসার’ সিনেমাটি প্রদর্শিত হয়। সেটি চলেছিল ১৭ সপ্তাহ। পরের সিনেমাটি ছিল ‘বসন্ত’, সেটি চলে ৫০ সপ্তাহ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে হলটি সেনাবাহিনী দখল করে ব্যারাক তৈরি করে।

স্বপনবাবু বলছেন, ‘‘আমরা শুনেছি সুভাষচন্দ্র বসুও এই সিনেমা হলে এক বার এসেছিলেন। অশোক কুমার অভিনীত ‘কিসমত’ সিনেমা এখানে টানা ১৮৪ সপ্তাহ চলে রেকর্ড করেছিল। তবে ভাল ছবি ছাড়া এখন দিনে গ়ড়ে দেড়শো দর্শক হয়।’’

তবে গম্বুজ মেরামতির মতো রক্সির ভবিষ্যৎ নিয়েও ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। ভাঙার যে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, তা কত দূর এগোল? মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায়ের উত্তর, ‘‘প্রক্রিয়া চলছে।’’

ফলে মরিস ব্যান্ডম্যান থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অশোক কুমার থেকে আমির খান, সময়ের মাইলফলক পেরিয়ে সকলকে এক বিন্দুতে মিলিয়ে দেওয়া চৌরঙ্গি প্লেসের হলটি থাকবে কি না, সে উত্তর একমাত্র জানে ভবিষ্যতের কলকাতা!

আরও পড়ুন

Advertisement