Advertisement
E-Paper

কতটা সজাগ চৌকিদারি চোখ

শীতের দুপুর। ভিক্টোরিয়ার মূল ফটকে মানুষের ঢল। অথচ, দু’জন মাত্র নিরাপত্তারক্ষীর দু’জনেই পুরুষ। এক জন আবার কাগজ পড়ায় মগ্ন। নিরাপত্তারক্ষীরা এক জনের ব্যাগ খুলে দেখতে দেখতেই পাশ দিয়ে অবাধে ঢুকে যাচ্ছেন অন্তত দশ জন।

সৌভিক চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ১৬ জানুয়ারি ২০১৬ ০১:৩৯
ভিক্টোরিয়া

ভিক্টোরিয়া

চিত্র এক, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল: শীতের দুপুর। ভিক্টোরিয়ার মূল ফটকে মানুষের ঢল। অথচ, দু’জন মাত্র নিরাপত্তারক্ষীর দু’জনেই পুরুষ। এক জন আবার কাগজ পড়ায় মগ্ন। নিরাপত্তারক্ষীরা এক জনের ব্যাগ খুলে দেখতে দেখতেই পাশ দিয়ে অবাধে ঢুকে যাচ্ছেন অন্তত দশ জন। তাঁদের কাছে জানতে চাওয়া হল, এত লোক ঢুকছে, সকলকে তল্লাশি করছেন কী করে? তাঁদের জবাব, ‘‘সকলকে দেখা সম্ভব নয়। যতটা পারছি করছি।’’ আর লাগেজ স্ক্যানার বা মেটাল ডিটেক্টর? তাঁরা বলছেন, ‘‘না না, আমাদের কাছে ও সব কিছু নেই।’’

চিত্র দুই, কালীঘাট মন্দির: বাঁশের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বেঁধে রীতিমতো কষ্ট করে দাঁড় করানো আছে ডোরফ্রেম মেটাল ডিটেক্টরগুলি। তলা দিয়ে কেউ হেঁটে গেলে অস্পষ্ট আওয়াজে জানান দিচ্ছে তারা জীবিত। পাশেই চেয়ারে বসে মোবাইলে মগ্ন দুই পুলিশকর্মী। তাঁদের জিজ্ঞাসা করা হল, আপনারা তো কাউকেই তল্লাশি করছেন না। কেউ যদি বিস্ফোরক বা আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ঢুকে পড়ে, কী ভাবে বোঝা যাবে? তাঁদের জবাব, ‘‘মেটাল দরজার আওয়াজ শুনে।’’ কিন্তু বিস্ফোরক বা আগ্নেয়াস্ত্র থাকলে দরজা ঠিক কী রকম আওয়াজ করবে? ঘাড় নাড়লেন তাঁরা। বললেন, ‘‘তা তো ঠিক জানি না।’’

চিত্র তিন, মেট্রো স্টেশন: বেশির ভাগ স্টেশনেই স্ক্যানার দীর্ঘ দিন ধরেই খারাপ। ব্যাগ পরীক্ষা করার দায়িত্ব নিরাপত্তারক্ষী এবং কর্তব্যরত পুলিশকর্মীদের। কিন্তু কোথাও তাঁরা নিজেদের মধ্যে গল্পে মশগুল আবার কোথাও বা খবরের কাগজ পড়ায় মগ্ন। অধিকাংশ যাত্রীই ব্যাগ পরীক্ষা না করিয়ে চলে যাচ্ছেন। এক ব্যক্তি নিজে থেকেই বললেন, ‘আমার ব্যাগটা দেখুন তো।’ নিতান্ত অনিচ্ছায় তাতে মেটাল ডিটেক্টর আলতো ছুঁইয়ে দিলেন এক নিরাপত্তারক্ষী। যদিও সে যন্ত্র কোনও শব্দই করল না। যন্ত্রটি আদৌ কাজ করছে কি না, বোঝা গেল না।

পঠানকোটে জঙ্গি হামলার পরে দেশ জুড়ে জারি হয়েছিল সতর্কতা। তার পরেও সেনা-পুলিশের উপস্থিতিতে রেড রোডে প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজের মহড়ায় এক বায়ুসেনা জওয়ানকে পিষে দিয়েছিল বেপরোয়া গাড়ি। এর পরে প্রশ্ন উঠেছে, ওই গাড়িতে যদি বিস্ফোরক থাকত? আরোহীরা যদি জঙ্গি হত?

প্রজাতন্ত্র দিবসের আগে দেশ জুড়ে সতর্কতার বাতাবরণ। কিন্তু শুক্রবার শহরের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গার নিরাপত্তা ব্যবস্থা ফের দেখিয়ে দিল, কোনও কিছুতেই কলকাতা পুলিশের ঘুম ভাঙার নয়। কলকাতা রয়ে গিয়েছে সেই কলকাতাতেই।

পরিবর্তন যে হয়নি, তা বুঝিয়ে দিয়ে এ দিন ভিক্টোরিয়া ও জাদুঘরের সামনে কর্তব্যরত পুলিশকর্মীরা জানালেন, আলাদা করে নিরাপত্তা বিষয়ে কোনও নির্দেশ নেই তাঁদের কাছে। তাঁরা বলছেন, ‘‘প্রজাতন্ত্র দিবসের আগে বরাবর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আলাদা করে জোর দেওয়া হয়। এ বার এখনও তেমন কোনও নির্দেশ এখনও আসেনি।’’

কালীঘাট মন্দিরের বাইরে পুলিশ চৌকিতে বসেছিলেন জনা ছয়েক পুলিশ। তাঁদের দাবি, আইনশৃঙ্খলা দেখার দায়িত্ব তাঁদের। নিরাপত্তা নয়। তুলনায় অনেক বেশি সুরক্ষিত শহরের শপিং মলগুলি। সাউথ সিটি মলে ঢোকার মুখে রয়েছে কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনী। লাগেজ স্ক্যানার এবং ডোরফ্রেম মেটাল ডিটেক্টর ছাড়াও অন্তত বার তিনেক তল্লাশি চালানোর পরেই ঢোকার অনুমতি দিচ্ছেন নিরাপত্তারক্ষীরা। ‘‘প্রজাতন্ত্র দিবসের আগে আরও একটু কড়াকড়ি হবে’’ — জানাচ্ছেন মল কর্তৃপক্ষ।

নিজেদের লাগেজ স্ক্যানারগুলি যে দীর্ঘ দিন ধরেই বেহাল, তা মেনে নিয়ে মেট্রোর জনসংযোগ আধিকারিক ইন্দ্রাণী মুখোপাধ্যায় জানান, স্টেশনে ঢোকার মুখে কলকাতা পুলিশের সহায়তায় বিশেষ নজরদারির ব্যবস্থা হয়েছে। যদিও এ দিন কোনও মেট্রো স্টেশনের বাইরে এমন কিছু চোখে পড়েনি। বরং বারবারই দেখা গিয়েছে হয় পুলিশকর্মীর বসার জায়গা ফাঁকা অথবা তিনি কারও সঙ্গে গল্পে মশগুল। প্রজাতন্ত্র দিবসের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে ইন্দ্রাণীদেবী বলেন, ‘‘প্রত্যেক স্টেশনে বিশেষ প্রহরা ছাড়াও ২৬ জানুয়ারির দু’দিন আগে থেকে ওই দিন পর্যন্ত মেট্রোর উচ্চপদস্থ আধিকারিকেরা পরিস্থিতির উপরে নজর রাখবেন।’’

শহর জুড়ে নিরাপত্তা প্রসঙ্গে যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (সদর) সুপ্রতিম সরকার কোনও মন্তব্য করতে চাননি। তবে লালবাজারের এক শীর্ষ কর্তা বলছেন, গাড়ির ধাক্কায় জওয়ানের মৃত্যু যে হেতু কোনও সন্ত্রাসবাদী নয় তাই আলাদা করে হঠাৎ নিরাপত্তা বাড়ানোর প্রশ্ন নেই। তবে প্রজাতন্ত্র দিবসের আগে প্রতি বছরের মতোই কলকাতার সর্বত্র আঁটোসাঁটো নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হবে।

শুক্রবার অন্তত তার কিছুই চোখে পড়েনি। যেমন, ভিক্টোরিয়ায় হাতে চিপ্‌সের প্যাকেট নিয়ে ঢুকতে গিয়ে টিকিট পরীক্ষকের কাছে বাধা পেয়েছিলেন দুই তরুণী। দাঁত দিয়ে অল্প ছিঁড়ে হাওয়া বের করে তাঁরা প্যাকেটগুলি ঢুকিয়ে নিলেন হাতব্যাগে। তারপর পুলিশের নাকের ডগা দিয়েই ঢুকে গেলেন ভিতরে। অসহায় পুলিশকর্মীর বক্তব্য, গঙ্গাসাগরের জন্য এ দিন মহিলা পুলিশ দেওয়া হয়নি। তাই মহিলাদের ব্যাগ তল্লাশি করা যাচ্ছে না।

কিন্তু এ ভাবে তো কোনও মহিলা বোমা নিয়েও ঢুকে যেতে পারেন? পুলিশকর্মীর আক্ষেপ, ‘‘কোনও মেয়ে যদি চোখে চোখ রেখে মিথ্যে কথা বলে, আমি কী করতে পারি?’’

ছবি: সুদীপ্ত ভৌমিক

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy