E-Paper

খাতায় সই করে বাড়ি গিয়ে ঘুম, তড়িঘড়ি লিফ্ট তোলায় কি মৃত্যু

ঘটনাপ্রবাহ জানাচ্ছে, লিফ্ট আটকে যাওয়ার খবর পেয়ে অরূপের প্রতিবেশীরা কালিন্দী থেকে হাসপাতালে চলে এসেছিলেন। কিন্তু তদন্তকারীরা এটা জেনে বিস্মিত যে, ওই ঘটনা জানাজানি হওয়ার ৪০ মিনিট পরেও সেই লিফ্টের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছতে পারেননি।

নীলোৎপল বিশ্বাস

শেষ আপডেট: ২৫ মার্চ ২০২৬ ০৮:১৭

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

হাজিরা খাতায় সই থাকলেই হল! এর পরে বেরিয়ে যাওয়া যায় যেমন খুশি। রাতের ডিউটিতে বাড়ি গিয়ে ঘুমিয়ে নিলেও ধরার কেউ থাকেন না। ভোরের দিকে এসে ডিউটি ধরে নিয়ে সকাল ৬টায় আসা পরবর্তী পর্যায়ের কর্মীকে দায়িত্ব দিয়ে দিলেই হল। আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে লিফ্টকর্মীদের মধ্যে নাকি এটাই ‘অলিখিত নিয়ম’। সেখানকার ট্রমা কেয়ার বিল্ডিংয়ের লিফ্টে আটকে, থেঁতলে অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর ঘটনার তদন্তে এমনই তথ্য উঠে এসেছে বলে পুলিশ সূত্রের খবর।

ঘটনাপ্রবাহ জানাচ্ছে, লিফ্ট আটকে যাওয়ার খবর পেয়ে অরূপের প্রতিবেশীরা কালিন্দী থেকে হাসপাতালে চলে এসেছিলেন। কিন্তু তদন্তকারীরা এটা জেনে বিস্মিত যে, ওই ঘটনা জানাজানি হওয়ার ৪০ মিনিট পরেও সেই লিফ্টের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছতে পারেননি। ঘটনাস্থলের ওই রাতের সিসি ক্যামেরার একটি ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, রাত ১টা ৫৮ মিনিটে ঘটনাটি ঘটলেও অরূপের তিন বছরের সন্তানকে উদ্ধার করা হয়েছে রাত ২টো ৪৩ মিনিট নাগাদ। এর পরে ২টো ৪৫ মিনিটে উদ্ধার করা হয় ক্ষতবিক্ষত অরূপকে। তার পরেই বেরিয়ে আসেন তাঁর স্ত্রী। অর্থাৎ, ঘটনা ঘটার ৪০ মিনিট পরে শুরু হয়েছিল উদ্ধারকাজ। পুলিশ সূত্রের খবর, ওই সময়ে দমদম এলাকা থেকে এক লিফ্টকর্মী তড়িঘড়ি আর জি করে পৌঁছন। তিনি নাকি হাসপাতালের খাতায় সই করে বাড়ি গিয়ে ঘুমোচ্ছিলেন! ওই লিফ্টকর্মীই এর পরে আটকে থাকা লোকজন কী অবস্থায় রয়েছেন, তা না দেখেই লিফ্টের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ‘ম্যানুয়াল’ পদ্ধতিতে তা উপরে তোলা শুরু করেন। ছাদে গিয়ে ব্রেক হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে লিফ্ট-কারের পিছনে থাকা ‘কাউন্টার ওয়েট’, অর্থাৎ কয়েকশো কিলোগ্রাম লোহার ওজন নীচের দিকে নামিয়ে দেন। এতেই দাঁড়িপাল্লার মতো অরূপকে নিয়ে লিফ্ট দ্রুত গতিতে উপরের দিকে ওঠা শুরু করে। এই আচমকা গতির কারণেই দরজায় দাঁড়ানো অরূপ থেঁতলে যান।

পুলিশি তদন্তে প্রশ্ন উঠছে, কেন লিফ্টে থাকা লোকজনকে সতর্ক না করেই তড়িঘড়ি লিফ্ট-কার তোলার চেষ্টা হল? যিনি এই কাজ করলেন, তাঁর উদ্ধারকাজ করার পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ আদৌ আছে কি? লালবাজারের গোয়েন্দা বিভাগের এক কর্তার দাবি, ‘‘লিফ্টের লোকজন ভিতরে, না কি দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন, তা দেখাই হয়নি। সকলকে লিফ্টের ভিতরে থাকতে বলে কোনও ঘোষণাও করা হয়নি।’’ এই ঘটনায় সার্বিক নজরদারি ও কর্তব্যে গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে আর জি কর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং সমস্ত সরকারি হাসপাতালের লিফ্টরক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা পূর্ত দফতরের বিরুদ্ধে। কিন্তু ঘটনার পাঁচ দিন পরেও তাদের তরফে কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি।

লিফ্ট রক্ষণাবেক্ষণের কাজে যুক্ত, শহরের একটি সংস্থার কর্তা যজ্ঞেশ্বর ঘোষ জানাচ্ছেন, এই ধরনের লিফ্ট মাইক্রো-প্রসেসরে চলে। বলা যেতে পারে, এই ছোট চিপটিই হল লিফ্টের মস্তিষ্ক। তা লিফ্টের যাবতীয় গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করে। যে বহুতলে লিফ্টটি রয়েছে, তার ছাদে কন্ট্রোলার থাকে। সেটিই হল চালক, তার পাশেই থাকে ব্রেক হ্যান্ডেল। সেখানেই বসানো একটি চাকার সঙ্গে ১৩ থেকে ১৬ মিলিমিটার মোটা তিনটি রোপ বা তার দিয়ে লিফ্ট ঝোলানো থাকে। এ ছাড়াও থাকে ৬ থেকে ৮ মিলিমিটার মোটা সেফটি রোপ। এই ধরনের দড়ির ছেঁড়ার ব্যাপার থাকে না। তাঁর কথায়, ‘‘তবু যদি কোনও কারণে ছিঁড়েও যায়, সে ক্ষেত্রে সেফটি রোপ লিফ্টটি ধরে রাখে। ফলে, লিফ্ট সরাসরি নীচে পড়ার ভয় থাকে না। পড়লেও বেসমেন্টে সিমেন্টের বেদি করে স্প্রিং লাগানো থাকে। এতে নীচের গর্তে পড়ে যাওয়া কারও উপরে যেমন লিফ্ট এসে পড়ে না, তেমনই লিফ্ট-কারের ভিতরে থাকা মানুষেরও আঘাত লাগার ঝুঁকি তৈরি হয় না।’’

আর একটি লিফ্ট সংস্থার কর্তা রজনী সরকার জানালেন, লিফ্টের সঙ্গে ‘লিমিট সুইচ’ লাগানো থাকে। যে কোনও তলে ৬ থেকে ৮ ইঞ্চি এ দিক-ও দিক থামলেই লিফ্টের বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে দেয় ওই সুইচ। তাতে দু’টি তলের মাঝে লিফ্ট দাঁড়িয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয় না। রজনী বলেন, ‘‘লিফ্টের পিছনে কাউন্টার-ওয়েট ফিলার লাগানো থাকে। সেটি লিফ্টের ওজনের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করে। অনেকটা জিমে ওজন চাপানোর মতো ব্যাপার। লিফ্ট এবং তাতে যত জনের ওঠার ছাড়পত্র রয়েছে, সেই অনুপাতে কাউন্টার-ওয়েট ফিলারে ওজন চাপানো থাকে। ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ব্রেক হ্যান্ডেল আলগা করে দিলেই হু হু করে কাউন্টার-ওয়েট ফিলারে চাপানো ওজন নীচের দিকে নামতে থাকে। লিফ্ট উপরে উঠতে থাকে। এই পদ্ধতিতে লিফ্টের দরজা খোলা থাকলেও লিফ্ট উপরে উঠে যায়। দরজা খোলা অবস্থায় উপরে তুলতে গিয়েই এই ঘটনা।’’

যে সংস্থা আর জি করের ওই লিফ্ট রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে ছিল, সেটির প্রধান সুজিত জানা বলেন, ‘‘পুলিশ, স্বাস্থ্য ভবন তদন্ত করছে। তাদেরই কাজটা করতে দেওয়া ভাল। এ ব্যাপারে কিছুই বলব না।’’

লিফ্ট-বিভ্রাট হলে

লিফ্টের ভিতরে থাকা সব চেয়ে নিরাপদ

কোনও মতেই দরজায় হাত বা শরীর রাখা যাবে না

শান্ত থেকে লিফ্টকর্মী বা উদ্ধারকারীদের ঘোষণা শুনতে হবে

লিফ্টের ভিতরে বসে পড়া ভাল। তাতে আঘাত লাগার ঝুঁকি কমে

প্রয়োজনে অ্যালার্ম সুইচ এবং স্টপ সুইচ ব্যবহার করতে হবে

লিফ্টের বেসমেন্টে যে হেতু স্প্রিং থাকে, আঘাতের ঝুঁকি কম

বেসমেন্টে পড়ে গেলেও শুয়ে পড়া ভাল। তাতে লিফ্ট গায়ে আসার আগেই স্প্রিংয়ে আটকে যাবে

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

RG Kar Case RG Kar Medical College and Hospital Incident

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy